কেন তুমি এতই মনোহর

  শ হী দ ই ক বা ল

১১ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এই বৈশাখের জয়ন্তীতে রবীন্দ্রনাথকে একটু চিনি। ভেতরে নিই। যাবতীয় অপব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়াইÑ সাহসে ভর করিÑ নির্বিচার রবীন্দ্রসংলগ্ন হয়ে, কাছে পৌঁছার চেষ্টা করি। রবীন্দ্রনাথকে তো নিছক দেয়ালে টানিয়ে রাখা যায় নাÑ তিনি ফোটোগ্রাফও নন। আর পূজিত তো ননই। নিজের, আমাদেরÑ এবং সব মানুষের তিনি; প্রাত্যহিকতার তরে। কিন্তু কীভাবে? ভালো-মন্দে, তৃষ্ণায়-পিপাসায়, জলে-স্থলে, মর্ত্য-েঅমর্ত্য,ে কাজে-অকাজেÑ নানা প্রকারে তো অবশ্যই। তবে আবারও বলি, তিনি প্রাকারবেষ্টিত নন। মনোহর রবীন্দ্রনাথ কাজের প্রেরণায়Ñ সাম্যের; হতাশা-দ্বন্দ্বের বিহ্বলতা থেকে মুক্তির জন্য। এবং আরও মনোহর তিনি সংস্কারমুক্তির জন্য, কুসংস্কার-কূপম-ূকতা থেকে বাতিলের জন্য, আচার ও আনুষ্ঠানিকতার অতিক্রমণের কারণে। তবে ‘কারণ’ কথাটার মধ্যে এক ধরনের তুচ্ছ প্রাপ্তির কণ্ঠ লুকায়িত। কিন্তু সেটি ছাড়িয়ে যায়, যাবতীয় অকারণসমূহে, অপ্রাপ্তিতে। সেইটিই ‘অকারণে’র রবীন্দ্রনাথ। এই রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই মনোহর। বুঝে নিই, রাশিয়ার চিঠি, ছিন্নপত্র, নৌকাডুবি কিংবা প্রান্তিক ও শেষলেখার রচনাগুচ্ছে। এর ভেতরে রবীন্দ্রায়নটুকু খুঁজি। কী এই রবীন্দ্রায়ন? যা মনোহর তাই রবীন্দ্রায়ন। ‘দৃষ্টি’ বা ইনসাইটনেসÑ কবি ও দার্শনিকের। সবটুকু যাতে অনাবিল, মুখরময় ও আনন্দের। খুব সোজা করি, ‘প্রেম’ প্রসঙ্গটিতে। প্রেম আসক্তির নয়, শুধুই কাম-প্রবৃত্তি নয়, চরিতার্থতারও নয়; পণ্য করার জন্য নয়, তুচ্ছ বা সমসাময়িকতার নয়। প্রেম তা হলে কী? মঙ্গলময়তার। তাতে অন্তর্ভুত রয় প্রণয় ও প্রগতি। প্রণয় রূপসাগরে মজে না প্রগতি না থাকলে। আর প্রগতির মধ্যে আছে সাম্য, দুইয়ের সমভাব, দুই অঙ্গের লজ্জাহীন আকর্ষণ; এবং নিবিষ্টরূপে তা পাওয়ার বিন্যাসÑ সীমাকে অসীম, রূপকে অরূপ করারÑ এরূপে প্রশান্তকর পরিবেশ বিরচন। শান্তির ও আত্মার সুখ। প্রাণমন ও দেহের অপরূপ শান্ত-সংস্রব। সেটি সংযতও। উভয়ের সংহার ও মূর্তিমানতায় প্রোজ্জ্বল। এই মন ও মানসে তখন প্রতীকায়িত হয় প্রকৃতির রূপময় রঙ বা রেখাবয়ব। জল ও আগুনের তৃপ্তি-বিনাশ, আহ্বান ও আকর্ষণও নিহিত এ ভুবনডাঙ্গার। এতে রুদ্ররূপ আছে, তেমনি পুড়িয়ে ফেলার আহ্বানও আছে। ‘আমি আগুনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছি, যা পুড়বার তা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা বাকি আছে তার আর মরণ নেই, সেই আমি আপনাকে নিবেদন করে দিলাম তার পায়ে, যিনি আমার সকল অপরাধকে তার গভীর বেদনার মধ্যে গ্রহণ করেছেন...’Ñ এই রবীন্দ্রায়ন-বীক্ষা কোনো কালে-স্থানে-বিষয়ে সীমিত নয়। ওখানে পরম্পরা তৈরি হয়। ঐতিহ্য গৃহীত হয়। আস্থা তৈরি হয়। প্রসঙ্গত, পরম্পরা-ঐতিহ্য বা আস্থা কোনোটিই কিন্তু নির্দ্বন্দ্ব নয়। দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে অভিমুখের আগুন বেরিয়ে আসে। পরশমণির দীক্ষা তাতে রোপিত। সেটি বাইরের নয়, একান্ততার, গোপনের ও ভেতরের। যেখানে সবকিছু মুড়িয়ে স্বস্তি ও শান্তি কায়েম হয়। জীবনের এ প্রাপ্তিগুলো রবীন্দ্রনাথে কোনো শর্তে আটকায় না। নিঃশর্ততায় অবমুক্তির বাঁধনে পড়ে। কোনো ভ্রƒক্ষেপ না করেই। কাউকে পেছনে ঠেলে না দিয়েই। দূর ও সন্নিকট উভয়ের আবাহন আছে কিন্তু নিশ্চিন্ত ও স্থির দৃঢ়তাতেই তার পরিণতি। আর এ লক্ষ্যে সংস্কৃতির বিষয়টি কী? সংস্কৃতিই তো সবকিছুর মূল। ব্যক্তি বা নৈর্ব্যক্তিক সর্বক্ষেত্রে সংস্কৃতির মাত্রা ও চর্চা একটা পরিপ্রেক্ষিত তো বটেই। সংস্কৃতি দিয়ে মানুষ চলে, এগোয়। কাছে টানে। দ্বন্দ্ব থেকে নির্দ্বন্দ্বে পৌঁছয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতি দিয়েছেন। গড়েছেন। ভিত্তিটুকুও চিনিয়েছেন। এবং চিরকালিক সাংস্কৃতিক স্বরূপটিই ধরে নিয়েছেন। শুধু কবিতায় কেনÑ গানেওÑ কিংবা গানের ভেতর দিয়ে, সমগ্রতায় বা নিবিষ্টতায়। এ লক্ষ্যে তার গদ্য লিখনগুলো আমাদের কাছে অনেকটা প্রেসক্রিপশনের মতো। ঘরে-বাইরে, গোরা বা নৌকাডুবি কিংবা গল্পগুচ্ছ, প্রবন্ধওÑ সংস্কৃতির অন্যতর অভিমুখ। এ বৃত্তে যে চরিত্রÑ নায়ক কিংবা নায়িকা বা বিধৃত পরিবেশ তা আমাদের বলতে-চলতে-ভাবতেÑ বৃদ্ধি হতে শেখায়। শিখিয়েও দেয়। নির্ধারিত ছন্দ ধরিয়ে উৎসারিত করে সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতার দান। উক্তি ও উপলব্ধির রূপরেখাটিও তাই। এই কৃষ্টি বিরচনে রবীন্দ্রনাথ অতি মনোহর। কবির ‘অসম্ভব’ কবিতাটি এ রকম :

শ্রাবণের মেঘ কালো হয়ে নামে বনের শিরে,

খর বিদ্যুৎ রাতের বক্ষ দিতেছে চিরে,

দূর হতে শুনি বারুণীনদীর তরল রবÑ

মন শুধু বলে, অসম্ভব এ অসম্ভব॥

এতে কী পাওয়ার আছে? হয়তো বাংলা কবিতায় এমন কথাও নতুন নয়। ভাবের আদলটি এখানে পুরনো। কথাগুলো অচেনা নয় তবে বিচ্ছেদের নতুন রঙ এখানে যেমন ধরেছে তেমনি আকর্ষণের মহিমাও বিস্তর প্রকৃতির রঙে উদ্ভাসিত হয়েছে। আরও গভীরে পৌঁছালে এর আধুনিক রুচি বা চিন্তনের আভাটিও অনুজ্জ্বল থাকে না। একটু পরিণতির দিকে প্রাচুর্যময় রবীন্দ্রনাথ মনের ‘অসম্ভব’রূপে যা কিছু সম্ভব সে অভিব্যক্তিই জানিয়েছেন। এ প্রকাশছন্দে তিনি অনুভাব্য এক রুচিও যেন তৈরি করে দেন। রুচির ভেতরে বেদন-বিরহের আকাক্সক্ষা, দ্বিধা থরথর মনের পরিশীলন আর প্রকৃতির সত্যসুন্দর রূপ অনুগৃহীত হয়ে ওঠে। প্রকৃতিই মনকে একটা উচ্চতায় পৌঁছিয়ে দেয়। মনের অসম্ভব রূপকে উজ্জ্বল আভা দিয়ে সম্ভব করে তোলে। সংযম আর মঙ্গল সেখানে অভিপ্রেত। এ বিষয়গুলো রবীন্দ্র-সাহিত্যে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। সেগুলো সমাজজীবনের ভাবদ্বন্দ্বেরই চিরচেনা রূপ। চিরচেনা কথাটি বলছি, ভাবদ্বন্দ্বের স্বরূপ বিবেচনা করে। কারণ প্রবহমান সমাজের মধ্যেই এই দ্বন্দ্বটি বিরাজ করে। আর তাতে যে সুর ও ছন্দ গৃহীত হয় তা মনের প্রাবল্য স্বচ্ছন্দে ‘খরা বিদ্যুতের ন্যায়’, কিংবা ‘বনের শিরে কালো মেঘ’রূপে ধরা দেয়। কারণ, রবীন্দ্রনাথে ব্রহ্মচিন্তাটি তো ব্যবহারিক সমাজ-মন আশ্রয় করেই প্রক্ষিপ্ত। ফলে তার যে সম্মুখ আহ্বান সেটি চিরকালিক, চিরসুন্দর পরাকাষ্ঠায় নির্ণীত। এতে মনের দোলাটি আছে কিন্তু মন তো স্বয়ম্ভূ নয়, সে ভাঙে-গড়ে, সহজ-কঠিন দ্বন্দ্বের ভেতরে পরশমণির সন্ধান করে। পুড়িয়ে ফেলে অবাঞ্ছিত যা কিছু, অবশিষ্টটুকুও আস্থায় নেয়। এই যে অভিব্যক্ত রবীন্দ্রনাথ তা আমাদের বা সবার নিজস্ব হন। সব ঐতিহ্য ও ইতিহাসের দ্বন্দ্বকে অবলম্বন করেই তিনি আমাদের।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে