পাতা ওড়ার দিন

  হাফিজ আল ফারুকী

১৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিষণœ বিকেল। খোড়াখুড়ি করা রাস্তায় ধুলো উড়ছে। উত্তরের বাতাসে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে ঝড়ে পড়ছে গাছের পাতা। পার্কের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি ক্যাম্পাসে। এত চেনা এত আপন ক্যাম্পাস, একটু একটু করে নিজের থেকেই যেন দূরে সরে যাচ্ছে। টেনেটুনে আর এক দেড় মাস হয়তো থাকা যাবে। তারপরেই ছেড়ে দিতে হবে সিট। এই শহরে কোনো একটা মেসে একটা সিট নিয়ে থাকতে গেলে কত টাকা দরকার! বিষণœ বিকেলটা আরো গাঢ় হয়ে ঢুকে যেতে থাকে বুকের ভেতরে। পা শথ হয়ে আসে। একটা চাকুরি এখন ভীষণ দরকার।

পরীক্ষার পর এ পর্যন্ত কতগুলো ইন্টারভিউ দেয়া হলো। প্রথম প্রথম ভাইভা দিয়ে বের হলেই মনে হতো, নিশ্চয়ই হয়ে যাবে। দুদিনের ভেতরেই হয়তো জয়েনিং লেটার পেয়ে যাব। প্রথম বেতন পেয়ে মাকে একটা শাড়ি কিনে দেব, রিতুকে ফোন করে বলব, “তোর কী কী লাগবে বল। জামা কিনেছি, এক জোড়া জুতো কিনেছি। মনে হয় সমস্যা হবে না, পায়ে ঠিকই লেগে যাবে।”

আর বলব পারমিতাকে। একদিন ভর দুপুরে পিওনের হাত থেকে চাকরির খামটা হাতে নিয়ে সোজা চলে যাব ওর হলে। কত যে খুশি হবে পারমিতা। নিশ্চয়ই আমার রাজ্য জয় করার সুখ চুইয়ে পড়বে ওর চোখেমুখে। পারমিতার হাসি যে কী সুন্দর, কী যে মায়াবী। হাসলে প্রায়ই চোখ দুটো চিক চিক করে ওঠে ওর।

অল্প বয়সে ওরও মা বিধবা হয়েছেন। গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন এ পর্যন্ত। হয়তো দুজন দুজনের দুঃখের সমান ভাগী হওয়ার জন্যই আমাদের এভাবে কাছে টেনে নিয়ে এসেছে নিয়তি।

বিকেলে পারমিতার সাথে দেখা করার কথা। যেদিন টিউশনি থাকে না সেদিন বিকেলে আমাদের দেখা হয়। একসাথে কখনো পথনাটক, কখনো আবৃত্তি শোনা, কখনো খুনসুটি... সময়টা কেটে যায় অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়াতে ছড়াতে। পারমিতা জানে আজ আমার টিউশনি নেই। আজ যে একটা ইন্টারভিউ ছিল, তা অবশ্য জানে না।

আগে চাকরির জন্য কোথাও গেলে বলে যেতাম। কত খুূশি হতো পারমিতা। চিকচিক করে ওঠা ওর দুই চোখে স্বপ্নরা খেলা করত। আমি তাকিয়ে থাকতাম চুপচাপ। এখন আর কিছুই বলি না। ওর চোখে সেই স্বপ্নগুলোও আর খেলা করে ওঠে না। একটা চাকরি কেন যে হয় না এখনো, জানি না। শুধু জানি, স্বপ্ন দেখতে যত ভালো লাগে, তার মৃত্যু দেখতে খারাপ লাগে তারচেয়ে শতগুণ।

রাস্তার পাশ থেকে কেনা গলায় পেচানো টাইটাকে হঠাৎ ফাঁসের মতো মনে হয়। আটসাঁট পোশাকে ঢেকে থাকা নিজেকে মনে হয় সার্কাসের সঙ। টাইয়ের নটটাকে কিছুটা ঢিলে করি। বুকের ওপর থেকে দুটো বোতাম খুলে ফেলি শার্টের। তবুও স্বস্তি মেলে না। ইচ্ছে করে টাইটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেই। দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে থাকি।

পারমিতা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। করুক। পরাজিত, ক্লান্ত মুখটা আমার আর কাউকে দেখাতে ইচ্ছে করে না।

পাঁচ দিন পরে দেখা। অথচ মনে হয়, পাঁচটা বছর চলে গেছে। চুপচাপ বসে থাকি, কোনো কথা বলি না কেউ। পারমিতা কি শুকিয়ে গেছে? চোখের নিচে কালি পড়েছে? পরিচর্যাহীন চুলগুলো অবাধ্য হয়ে কিছু চলে এসেছে মুখের ওপর। একবার তাকিয়েই চোখটা নামিয়ে নেই। পারমিতার কি আমার থেকেও বেশি কষ্ট হচ্ছিল? তাই নিজেই ছুটে এসেছে? কিছু না বলে বসে আছে কেন তাহলে? অনেক অভিমান জমেছে এই পাঁচ দিনে? পাঁচ যুগের অভিমান?

ফ্লাস্ক হাতে একজন চাওয়ালা এসে সুযোগ করে দেয়। জিজ্ঞেস করি, “চা খাবে পারমিতা?”

পাথরের মতো অবশ বসে থাকা মূর্তিটা নড়ে ওঠে। ছলছল করে ওঠা দুচোখের ভাষায় যে গল্প, তা কি বোঝানো যায়? বুকের ভেতরটা খামচে ধরে। আমার দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দেয় পারমিতা। তারপর কিছু না বলেই চলে যায়।

ধবধবে সাদা একটা কাগজ; পারমিতাকে নিয়ে তার মা ও মামাদের স্বপ্ন, চিন্তা এবং ওর নতুন জীবনের আয়োজনের কত কথা লেখা তাতে। শব্দগুলো পেরুতে পেরুতে, আমি আমাদের ভেতরে রোপিত স্বপ্নের বীজ থেকে গজিয়ে ওঠা একটি চারাগাছের আর্তনাদ শুনতে থাকি। পারমিতার ফিরে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে বিন্দুর মতো ওর মিলিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে চোখের কোনায় কুয়াশা জমতে থাকে। ডিমের কুসুমের মতো লাল হযে ওঠা আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, “তোমাকে আমি হারিয়ে যেতে দেব না পারমিতা, কিছুতেই না।”

কেউ যেন শক্ত করে গলা চেপে ধরে। আমি শ্বাস নেওয়ার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলতে থাকি।

মা ফোন করেছে, “বাবা, কত দিন দেখি না। বাড়ি আসবি না?”

“আসব মা।”

রিতু বলল, “ভাইয়া আমি বৃত্তির টাকা পেয়েছি।”

“তাই নাকি!”

“হ্যাঁ। টাকাগুলো দিয়ে কী করব জানো? পড়াশোনা শেষ করে তুমি এখন চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছ। তুমিই তো সব সময় আমাকে সবকিছু কিনে দাও। এবার বৃত্তির টাকাটা আমি তোমাকে দেব। তুমি সুন্দর একটা শার্ট কিনবে। সেই শার্ট পরে ইন্টারভিউ দিতে যাবে।”

রিতুর কথা শুনে হাসি। বুকের ভেতরে মরে যেতে থাকা চারা গাছের পাশ দিয়ে আবার যেন অসংখ্য অঙ্কুর গজিয়ে ওঠে।

বিকেলে অনেক দিন পর অনেক ভালোলাগা নিয়ে বের হই। পারমিতার হলে আসি। ডাক পাঠাই ভেতরে। একটু সময় নিয়ে সেজেগুঁজে হাসতে হাসতে বের হয়ে আসে সে। কাছেই একটা কংক্রিটের বেঞ্চে বসে অর্থহীন কত গল্প করি আমরা।

সন্ধ্যা নেমে এলে বুকের কাছে মাথাটা এগিয়ে দেয় পারমিতা, “আজ আমাদের দেখা হতোই, জানো? তুমি না এলে আমি নিজেই তোমার হলে যেতাম।” তারপর যেন অনেক মেঘ জমেছে। সেই মেঘের ভার কণ্ঠে নিয়ে পারমিতা বলে, “এতদিন না দেখা করে কীভাবে থাকো তুমি!”

আমি কিছু বলি না। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় মনটা আরো ভরে যায়।

পারমিতা বলে, “জানতে চাইলে না, তুমি না এলে কেন আজ আমি নিজেই তোমার কাছে ছুটে যেতাম?”

“কেন?”

“কাল ভোরের ট্রেনে বাড়ি যাচ্ছি।”

“তাই?”

“হ্যাঁ। বিয়েটা ভেঙে দেয়ার পর মা জানতে চেয়েছেন, কেন এত ভালো একটা বিয়ে আমি করব না? তোমার কথা বললাম। বললাম, আমাদের অসংখ্য স্বপ্ন রচনার দৃশ্য। মাকে কী বলেছি জানো পারভেজ? বলেছি, আমরা শুধু আমাদের জন্যই স্বপ্ন দেখি না। আরো অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন বুনেছি। এই স্বপ্নগুলোকে যে আমি কিছুতেই মেরে ফেলতে পারি না।”

পারমিতার দিকে তাকিয়ে থাকি। ওর চোখে আবিস্কার করি নতুন আমাকে। অমিত সম্ভাবনার এই আমাকে আমি কেন খুঁজে পাই নি এতদিন?

পারমিতা আরো একটু এগিয়ে আসে, “সব শুনে মা তোমাকে দেখতে চেয়েছেন, যাবে না?”

পরদিন সকালে আন্তনগর গোধূলি এক্সপ্রেস আমাদের দুজনকে নিয়ে ভোরের আলো ছড়াতে ছড়াতে ছুটে চলতে থাকে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে