মাসুদ খানের ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশে’

  স রো জ মো স্ত ফা

১৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবহমান বাংলা কবিতার ¯িœগ্ধ সৌন্দর্যের একটা জাগ্রত পরিসরকেই খুঁজে পাওয়া যায় ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশে’। কীভাবে? নগর-জীবনের নির্মম, নিষ্ঠুর, স্বার্থাচ্ছন্ন বিরিয়ানি খাওয়া তৈলাক্ত মুখ গুলোরও নিশ্চয়ই একটা আত্মপরিচয় কিংবা ভৌগলিক অনুভব আছে। ভাষা ও স্বদেশ আছে। আছে প্রাচ্য বিদ্যার আশ্রম। লুক্কায়িত নৈরাশ্যবাদেও ভেতরেও মানুষগুলোর ভোরের আভা মাখানো আছে; আছে জীবনের জানালা খুলে জীবনকে ভালোবাসা। আছে চিরায়ত দুঃখ ও আনন্দযাপন। মদ ও নর্তকীর সত্য ও সত্তাহীন নাগরিকতার ভেতরেও কবি জীবনের আশপাশতলাকেই খুঁজেছেন। তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা, অতৃপ্তি মাখানো মুখগুলোও নিশ্চয়ই একটা শুভ্র আগামীর আশায় নির্জন গভীর সন্ধ্যায় বাড়িতেই ফেরেন। ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশে’ আক্ষেপ নিংড়ানো বাড়ি ফেরা মানুষের আশাবাদী মুখগুলোকেই এঁকেছেন কবি। প্রতিদিনের জ্যন্ত বাস্তবতার ভেতরেও স্বপ্ন ও মায়াবাদ থাকে। স্বাপ্নিক পৃথিবীর এই অক্ষরমালায় পরদেশী ভাব ও স্বভাব নেই; চৈতন্যের দীঘল দীঘিতে ‘প্রসল্ল দ্বীপদেশ’ মূলত আপন ভূমির উজ্জ্বল কোয়ারা। বাংলা কবিতার কাল ও কালান্তরের একটি সুজন সেতু।

দুই

৬৪ পৃষ্টার এই কাব্যগ্রন্থে কবিতার সংখ্যা ৪৮টি। পাঠক, কবিতার শিরোনাম সরিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতার ছায়া ভেবেও পুরো বইটাকে পড়া যেতে পারে। সময় ও জীবন দৃশ্যের এই কবিতাগুলো সরল, দৃঢ়, বাস্তবিক আকাক্ষার অভিমুখ। ফিরতি পথের নাবিক, ভিনদেশি কাপ্তানের চোখের মনিতে বসে কবি আমাদের একটি দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আশ্চর্য সেই দেশে ‘হঠাৎই, টাশ-টাশ করে কথা বলে ওঠে তরুণী’।/ ‘সেখানকার মাটি উষ্ণ,/ অপত্যবৎসল,/ যেখানে মানুষ সোজা মাটিতে শুয়ে পড়ে/ শুষে নেয় অষ্টাঙ্গে ভূতাপশক্তি সঞ্জীবন। ‘ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা ভেজা সুর’কে কবি লিখতে থাকেন। লিখতে থাকেন মাটির সৌন্দর্য, রূপ ও অনুভব। যাপিত জীবনের পরিচিত শব্দমালাতেই কবি কল্পনায় সৌন্দর্য স্থাপন হয়। ‘মাকাল ফলের মৃদু মনস্তাপ কিংবা করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ’-কাব্যিক ভাষার সহজ বয়ানে এভাবেই চিরায়ত জীবনের রঙ ও প্রকৃতিকে জাগিয়ে রাখেন কবি।

প্রতিটি কবিতার ভাষাতেই সৌন্দর্য ও শান্তি আছে। ছোট ছোট কবিতার ভেতরে জল-জোছনার মতো স্বচ্ছ জীবনকেই দেখাচ্ছেন কবি। ছোট একটা বর্ণনা কিন্তু এর ভেতরে চেনা জীবনটাই যেন আচড়ে পরছে।‘অজর্নের ঋতু বর্ষা।/ শরৎ, সর্জনের।/ এবং বিসর্জনের।/ বিসর্জনে বিসর্জনে মেঘ আজ বৈধব্যধবল’। প্রকৃতি বর্ণনার এই নিপুণতাতেও আছে গার্হস্থ্য জীবনের সন্তাপ। সংসারের লাল গোলাপটাকে আমরা দেখি কিন্তু কবি দেখিয়ে দিচ্ছেন লাল গোলাপের অবতল। ‘সীমন্তিনী, তোমার ও-সিঁথিপথ থেকে, উজ্জ্বল সিঁদুর থেকে, জেগে উঠছে ছোট ছোট শিখা’(সংসার)।

আশাবাদের বাস্তবিক চিত্রায়নই মাসুদ খানের কবিতার শক্তি। ‘মর্চে ধরছে কম্পাসে, দুরবিনে’; কবি তবু দূর জীবনকেই দেখতে চাইছেন। থাকুক, উগ্রবসনা আগুনের চঞ্চল রসনা কিংবা হুদহুদ পাখির অস্থিরতা। কবি জানেন, ‘খলনায়কের দাঁতের নিচে পড়বে কট্টরপন্থী কাঁকর’। বহু প্রত্যাশার আয়োজন তৈরি করে কবি বলতে থাকেন, ‘হয়তো আমি একদিন ঠিকই/ পড়ো-পড়ো ঘরকে যোগাতে পারব/ গাঁট-অলা তিন-বাঁকা শালকাঠের সমর্থন/ নিশ্চিহ্নকে দেখাতে পারব কিছু লুপ্তপ্রায় চিহ্নের ইশারা’/

তিন

বাংলার সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে ধারণ করে এভাবেই বাংলা কবিতা লিখেন মাসুদ খান। আমার এই কথাটাকে যে কেউ মুচকি হাসিতে উড়িয়ে দিতে পারেন। প্রশ্ন করতে পারেন, ‘তাহলে অন্যেরা কি পরভাষার কবিতা লিখছেন?’ এর উত্তরে আমি সহজেইবলতে চাই, একটা সময়ে কবিতা লিখতে আসা অনেকেই আপন ভাষা ও সাংস্কৃতিকেই বুঝতে পারেন না। তাদের লেখায় শুধু স্বাতন্ত্র থাকে; থাকে পরভাষার কেরামতি। শ্রাবণ মাসের আকাশের তলায় থেকেও উনারা শ্রাবণ ঋতুকে পাত্তা দিতে চান না। সময় ও প্রতিবেশের অনিবার্য আযোজনকে অস্বীকার করে নিরীক্ষার একটা সাধু পথে উনারা বিচরণ করেন। ফলে নদীর প্লাবনে উনাদের কবিতায় থাকেনা দেশীয় সুর ও সংস্কৃতি। ভাষা শুধু হরফ নয়। ভাষা হচ্ছে জীবন। ভাষা হচ্ছে-পার্বণ, বিশ্বাস ও প্রকৃতি।

শুধু ছন্দ ও ভাষা যে কবিতা নয় এটা মাসুদ খানের কবিতা পড়লে বুঝা যায়। শুধু নাগরিক প্রতিচ্ছবি কিংবা ভাষার ফ্যান্টাসি যে কবিতা নয়- এটা বাংলা কবিতার সাধু-পথে প্রবেশ করলেই টের পাওয়া যায়।” পাথিতীর্থদিনে”Ñর ভাষাতেই বাংলার চিরায়ত মন ও মননের একটা সমাজমনস্কতার সূত্রপাত। “সরাইখানা ও হারানো মানুষ” কাব্যগ্রন্থে এই ভাষার ভাব ও প্রকৃতি একটা যথার্থ ও প্রসন্ন অভিযাত্রা তৈরি করতে পেরেছে। সে ভায়ার অপরিহার্যভাবে উঠে এসেছে দেশ, সমাজ ও পৃথিবীর মায়াপথ।

জীবনের কাছে সমর্পিত না হয়ে কেউ কবিতা লিখতে পারে না। জীবনাভিজ্ঞতার কথা, স্বপ্ন, আবেগ ও লক্ষ্যের কথা, সময়ের সত্য ও নির্মম জার্নালের কথা একটা আশ্চর্য জীবনজাত ভাষায় লিখে যাচ্ছেন কবি। তাঁর কবিতায় বাংলা ভূগোলের রক্তনালিই প্রবাহিত হচ্ছে। কবিতা হয়তো আত্মজীবন কিংবা প্রতিবেশের পরিতাপ। যে পরিতাপ ‘একযোগে চিয়ার্স-ধ্বনি তুলে পাল্লা দিয়ে পান করে রোদের শ্যাম্পেন’। কাব্যকন্ঠের পবিত্রতায় কবি মূলত আপন দ্বীপদেশের বার্তা শুনতে চান কিংবা শুনাতে চান। তাঁর কবির সচল দু’তারার চারপাশে বসে আমরা নিজের দেশটাকেই চিনি কিংবা চিনতে চেষ্টা করি। ফিরতি পথের নাবিককে কিংবা মুড়ে ফেলা ভিনদেশি কাপ্তানকে কবি মনে হয় স্বদেশের কথাই জিজ্ঞাসা করেনÑ

‘সেই দ্বীপদেশের কথা বলো যেখানে নারীরা সামান্য একটি কাঠের কুটিরে ফুটিয়ে তোলে বাষট্টি রকমের বাৎসল্য ও প্রীতি।

প্রীতিপরবশ সেই কুটিরের কথা বলো, সেই একটানা মমতালোকের কথা বলে যাও হে কাপ্তান যেÑদেশে নিশুতি রাতে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা পথ চলে শিস দিয়ে, তুড়ি বাজাতে বাজাতে। আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে তালে তালে পাল্টা তুড়ি বাজিয়ে সাড়া দেয় নবীন উলটকমলের চটপটে পাতা ও পল্লব’।

চিন্তার ভেতরে তৈরি হয় ভাষার লাবণ্য। কবির কবিতায় সময়ের বঞ্চনা আর গতিটা স্পষ্ট। আছে মানবিক কারুণ্য এবং জীবনের প্রতি আকুতি। ‘পাখিতীর্থদিনে’ যে বোধের অভিনিবেশ-বিষয় ও ভাব নির্ভরতায় ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশে’ এ-টা বহুবিচিত্রতায় আরো উজ্জ্বল। জীবনানুভূতির নিমগ্নতায় একটা আশ্চর্য সুরে রাঙায়িত হয়েছে প্রতিটি কবিতার অন্তর। কবিতা কখনো মাস্টারি করেনা। কবিতা শান্তি ও শিহরণ তৈরি করে। ভাষার সৌন্দর্যের সাথে সাথে ‘প্রসন্ন দ্বীপের দেশ’ যেন এক শান্তির আশ্রম। বাংলা কবিতার পাঠক এই কাব্যগ্রন্থে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে পারেন।

শক্তি ও প্রকৃতিতে এÑভাবেই বাংলা কবিতা লিখেন মাসুদ খান। এই কবিতাতেও ছন্দ আছে; আছে ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য। কিন্তু এই কবিতার ছত্রে ছত্রে বেশি আছে মাটির কবিতার সজ্ঞীবন। কবিতা এখানে সহজ ও উষ্ণ। কবিতা এখানে কাদা মাটির সুবাস। আত্মসংস্কৃতির অধিকারী হয়ে কবিতা লিখছেন তিনি। ‘অপরের ভাব ভাষা চুরি করে পাইকারি চালান দিতে গিয়ে ধরা খেয়ে জব্দ বসে আছে বর্ণচোরা দুই চতুর চড়–ই’Ñএই সত্য জেনেই কবিতা লিখছেন তিনি। কবিতায় তিনি ‘শান্ত সমুদ্র’; ‘ভেসে চলেছে একা’। চারপাশে আভিজাত অক্ষর’Ñ কিন্তু কবিতার আসন্ন বিজয়ের লক্ষ্যে জীবনজাত সংস্কৃতি আর চেনা জীবনকেই লিখছেন তিনি। প্রসন্ন দ্বীপের দেশে চেনা জীবনের বাস্তবতা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে