গ ল্প

বুড়ো হবে বলে বড় হতেও ভয় পায়

  মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

২৫ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লিখতে বসলে প্রথমেই তারিখটা লিখে নিই। তার পর লেখা শুরু করি। তাতে লেখা শুরু করার আগেই খানিকক্ষণ থামতে হয়। আমার তারিখ মনে থাকে না। দেয়ালে তাকিয়ে লাভ হয় না। ক্যালেন্ডার তারিখ বলে দেয় না। আজ কত তারিখ তা জানতে হলে, কাল কত তারিখ ছিল, সেটা মনে রাখতে হয়। যন্ত্রের প্রতি নির্ভরশীলতা ভালো লাগে না। ফলে ঘড়ি দেখি না, মুঠোফোন দেখি না। ওরা কবে কোন তারিখ দেখাবে, তা তো ওদের বলে রেখেছি। এখন আবার ওদের কাছ থেকে জেনে নিলে, তাতে কতটুকু ভরসা? ভেতরে ভেতরে ওরা কী গোলমাল করে বসে আছেÑ টেরও পাব না। পত্রিকা বিশ্বাস করি। ছোটবেলায় পত্রিকার নামের নিচ থেকে বাংলা ও আরবি সনের তারিখ জেনে নিতাম। সারাদিন মনে রাখতাম, আজ আষাঢ়ের পহেলা।

পত্রিকা আসতে দেরি হচ্ছে আজ। আমি মুঠোফোনটা হাতে নিলাম। সেদিন সিয়াম ক্যালেন্ডার বের করে ওর বার্থডে দেখিয়ে বলেছিল, ‘জানো চাচ্চু, এ বছর আমার বার্থডেতে ব্লু মুন। তিন বছর পরপর ব্লু মুন দেখা যায়। এ বছর ৩১ জানুয়ারিতে ব্লু মুন। জানুয়ারির ২ তারিখে মাসের প্রথম ফুল মুন। যে মাসে দুটো ফুল মুন হয়, দ্বিতীয় ফুল মুনকে বলে ব্লু মুন। চাচ্চু জানো, এ বছর দুবার ব্লু মুন হবেÑ মার্চের ৩১ তারিখে আরেকবার হবে...’

আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘আজ কত তারিখ?’ শাহানা আশপাশে থাকলে জবাব দেবে। কোনো সাড়া নেইÑ নীরবতা। কাল থেকে ওর সঙ্গে আমার মুখ দেখাদেখি বন্ধ। টুকটাক কথা চলছেÑ ঠেস্ দিয়ে। কাল থার্টিফার্স্ট ছিল, মনে পড়ল। আমি গোঁয়ারের মতো সারারাত লিখেছি।

দিন আর মাস লিখার পর সন লিখতে গিয়ে হাত কাঁপলÑ এক বছর বুড়ো হলাম। আমি লিখতে শুরু করে দিলামÑ

Ñ ‘মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়’Ñপ্রতি পনেরো দিন পরপর আমি আমার তত্ত্ব থেকে সরে যাই।

Ñ ডাইনে সরেন? না বাঁয়ে?

Ñ উপরে উঠি। বড় হই...

দরজার বাইরে শাহানার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। ও জানে, আমার শুচিবায়ু আছে, তারিখ না লিখে আমি লেখা শুরু করতে পারি না। এতক্ষণে নিশ্চয় আমার ভাব উবে যাচ্ছেÑ মহাজগতের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বুঝি। ও দরজার বাইরে ধুপ্ ধুপ্ করে হাঁটছেÑ তারিখ মনে করিয়ে দেওয়া খুব দরকার, কিন্তু আরেকবার না জিজ্ঞাসা করলে, বলা ঠিক হবে না।

‘কাল কত তারিখ ছিল?’ দরজার ওপাশে শাহানা ঠেস্ দিয়ে উঠল।

আমি লিখছিÑ

...তবে সবাই বড় হয় না। কেউ কেউ বুড়ো হওয়ার ভয়ে বড় হতে চায় না। বয়স জানতে চাইলে বলে, ঊনত্রিশ। আমাকে বললে ক্ষতি নেই, কিন্তু ডাক্তারকে বলে কেন? কৈফিয়ত চাইলে বলে, উনিশ থেকে ঊনষাট সবার ওষুধ এক...

আমার কাছ থেকে কোনো আওয়াজ না পেয়ে, অদৃশ্য শাহানা বলল, ‘কাল থার্টিফার্স্ট ছিলÑ ৩১ ডিসেম্বর।’

আমি চুপ। মনে মনে বললাম, ‘আজকে তো আর থার্টিফার্স্ট নেই। আজ আমাকে আবার কী করতে হবে?’ দরজার বাইরে ওর চুড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। বোধহয় তর্জনী বাঁকা করে ঠোঁটের ওপর ধরেছে। চিন্তায় পড়ে গেলে ও এ কাজটি করে। আর যেটি করে সেটি হচ্ছে, কর গুনে হিসাব করে। বোধহয় নিশ্চিত হতে পারছে না, আমি শুনেছি কিনা। এতক্ষণে মহাজগতের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে নিশ্চয়।

বোকা মেয়েÑ অল্পতেই বিচলিত হয়। আগের থেকে একটু জোরে আওয়াজ করে বলল, ‘তা হলে ৩২ ডিসেম্বর আজ।’ মনে হলো, দরজার আরেকটু কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ও। আমি লিখলামÑ

...মনের পথ ধরে এক বেলা এগুলে, বুদ্ধির গন্তব্য থেকে এক বছর পিছিয়ে যাই। কাজে মাথা খোলে না। যখন খোলে, তখন তা থেকে কেবল ফাঁকি দেওয়ার ধারণা বের হয়। মন খুলতে চাই না, কিন্তু তা-ই খুলে যায় বারবার, নলেন গুড়ের মতো ভালোবাসা চুইয়ে বেরিয়ে আসে, সবকিছু নষ্ট করে দেয়...

আজ আর লিখবন না। কলম খাপে ভরে রাখলাম।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে