বই আলোচনা অরুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

তথ্য এবং তত্ত্ব দুটোই প্রাঞ্জল

  অনলাইন ডেস্ক

২৫ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৮-এর বইমেলায় বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত বহুমাত্রিক লেখক ও শক্তিমান ঔপন্যাসিক সাইদ হাসান দারার ‘আখ্যান : ১৯৭১’ নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে এক মূল্যবান সংযোজন। এর অভূতপূর্ব কাহিনি গড়ে উঠেছে রহমান নামের চাকরি প্রত্যাশিত এক যুবকের অন্তরে; ১৯৭১ সালের পাকিস্তানিদের ২৫ মার্চ রাতের পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যার আগের ও পরের নিদারুণ সংশয়-সন্দেহ, উদ্বেগ-অবিশ্বাস, আতঙ্ক আর ব্যক্তিগত স্বপ্ন-ভালোবাসায় মেশানো ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়ে। শেষ হয়েছে মহান মুক্তিসংগ্রামের গেরিলাযুদ্ধের অবিস্মরণীয়-অবিশ্বাস্য ঘটনাসমূহের অনুপুঙ্খ নিরাবেগ বিবরণে এবং চূড়ান্ত সাফল্য তথা পাক-হানাদার বাহিনীর চরম লজ্জাকর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।

এই রচনায় লেখক বহুলাংশে আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেসব রাজনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক উপাদানগুলো একত্রে ধারাবাহিকভাবে এমন সুনিপুণ শিল্পবোধে তুলে ধরেছেন যার মাধ্যমে পাঠক সহজে অনুধাবন করতে পারবেন, কীভাবে ওইসব উপাদানের সংঘাত ও সংমিশ্রণে মুক্তিযুদ্ধের সফল রণনীতির উদ্ভব হয়েছিল। আর কীভাবে তা চূড়ান্ত সফলতায় ফেটে পড়েছিল : সেই দ্বন্দ্ববহুল ইতিবৃত্ত এই রচনায় যথার্থই উঠে এসেছে এবং উঠে এসেছে পাক-সামরিকজান্তার অভ্যন্তরীণ অসংখ্য দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অজানা বিষয়, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের গোপন সকরুণ আশা-নিরাশার সাতকাহন তথা : ইস্কান্দার-আইয়ুব-ইয়াহিয়া এবং ভুট্টোসহ ভারত-চীন-আমেরিকা-রাশিয়ার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা। পাঠকালে পাঠক অবশ্যই অভিভূত হবেন, বিস্মৃতির স্তব্ধতায় যেন আছড়ে পড়বেন, তার মনে হতে পারে এ যেন উপন্যাস নয়, উপাখ্যান নয় এবং নয় কোনো ইতিহাস-আলেখ্য। এ যেন বাঙালির তথা মানবেতিহাসের উত্থানপর্বের এক দুর্মর মহাকাব্যিক সময়। আর লেখক এখানে সেই দুর্মর সময়কে একটি প্রবহমান নদীতে রূপান্তিত করেছেন এবং পাঠককে তারই তীরে বসিয়ে প্রবহমান সময়কে অতিক্রান্ত হতে দেখাচ্ছেন। পাঠক পাঠকালে স্মৃতির চলচ্চিত্রের মতো দেখতে পাবেন, নেমে পড়া হানাবাড়িতে কীরকম ছোটাছুটি মানুষের, দিগি¦দিক ছুটছে বাংলার জনপদ, মানুষের চরম উৎকণ্ঠায় ভরা জনপদ;, প্রকৃতির ছায়াহীন-মায়াহীন, বান্ধবহীন আতঙ্কিত শঙ্কুল এলাকা। কী যে করুণ সে করুণা; কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই...নতুন প্রজন্ম যদি জানতে চায়, মুক্তিযুদ্ধ কী, কেন; বা এর কী প্রয়োজন ছিল? এর সহজ-সরল উত্তর এই গ্রন্থে আছে। তথ্য এবং তত্ত্ব দুটোই প্রাঞ্জল। কাহিনি আছে, চরিত্র আছে, দৃষ্টিভঙ্গি আছে, প্রকৃত এবং বাস্তব ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কিছু ইম্পোজিং এনিকডোট এবং ইতিহাসকে ভিন্নভাবে, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এক আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিও যেন এখানে বিদ্যমান।আখ্যানের শুরুতে রহমান একটা টিনের চালায় মেসে ঘুমিয়েছিল। সে ২৫ মার্চের অনেক আগে থেকে একটা ভালো চাকরির আশায় ঢাকায় অবস্থান করছিল। ১ মার্চ থেকে ঢাকা আক্ষরিক অর্থেই প্রচ-তম গণবিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। কারণ সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও সামরিক সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে রাষ্টক্ষমতা ফিরিয়ে না দিয়ে বরং জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছিল। এ জন্য সেদিন থেকে বাঙালির ছয় দফা দাবি এক দফার স্বাধীনতা দাবিতে পরিণত হয়। এ অবস্থায় চাকরির সম্ভাবনা নেই জেনেও রহমান ঢাকাতেই অবস্থান করে, মনিকা নামে একজন ভার্সিটিপড়–য়া মেয়ের জন্য। সে হল ছেড়ে যেতে রাজি নয়। তার ধারণা লেডিস হোস্টেলে কিছুই হবে। দৈবাৎ এক ঘটনায় রহমান একতরফাভাবে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে দেশের বাড়িতে তার মা তার সইয়ের মেয়ে পারুলের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়ার জন্য বহুদিন আগে থেকে সব ঠিক করে রেখেছিল। পারুলকে বিয়ে করতে রহমানের খুব একটা আপত্তি ছিল না, যদি না হঠাৎ করে মনিকার সঙ্গে তার পরিচয় হতো। অতঃপর ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর থেকে তার সবকিছু যেন ভীষণ এলোমেলো হয়ে গেল। সে প্রেমিক থেকে দেশপ্রেমিক গেরিলাযোদ্ধায় পরিণত হলো : এ যেন কী হতে চেয়ে, কী হতে-হতে তার কী হয়ে যাওয়া! মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত শক্তিমান ঔপন্যাসিক সাইদ হাসান দারার এ অদ্ভুতপূর্ব মহাকাব্যিক উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে ‘অন্বেষা প্রকাশন’ থেকে; নান্দনিকতায় ভরপুর বিমূর্ত প্রচ্ছদ এঁকেছেন দেশের অন্যতম খ্যাতিমান প্রচ্ছদ শিল্পী ও সুলেখক ধ্রুব এষ। সংগ্রহে রাখার মতো এবং বারবার করে পড়ার মতো এই বইটির দাম, ৬০০ টাকা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
ashomoy-todays_most_viewed_news