রিসার্চ চলছে

  তুষারকান্তি ভট্টাচার্য

২৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাইকে বারবার ঘোষণা হচ্ছেÑ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সভার কাজ শুরু হবে, বক্তারা প্রায় সবাই এসে গেছেন। যে দু-তিনজন এখনো এসে পৌঁছতে পারেননি তারা ফোনে জানিয়েছেন সভা যেন শুরু করে দেওয়া হয়। যানজটে কিছুটা আটকে রয়েছেন।

সারা ব্রিগেড থিকথিক করছে মানুষে। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু কালো কালো মাথা! এত বিপুল জনসমাগম কলকাতাবাসী বোধহয় আগে কখনো দেখেনি। রেড রোডের গাছগুলোতেও শুধু মানুষ আর মানুষ। এ জনসমুদ্র কোনো রাজনৈতিক দলের নয় বলেই এত স্বতঃস্ফূর্ত! সত্যিই ভাবা যায়নি। অথচ মাত্র দুদিনের প্রস্তুতি। পাড়ায় পাড়ায় মাইকে প্রচার, এক টিভিতে বিজ্ঞপ্তিÑ ৭ এপ্রিল বুধবার ব্রিগেড ভরিয়ে তুলুন। এ সভা কোনো নির্বাচনী প্রচার নয়, ধর্মের প্রবচনও নয়। এ এক উদ্ভট আজগুবি সমাবেশ। সারা বিশ্বে এহেন সভার জুড়ি মেলা ভার। দলে দলে যোগদান করুন। ব্যস, গতানুগতিক জনসভায় তিতি-বিরক্ত মানুষ প্রবল উৎসাহে যেন ভেঙে পড়েছে।

এক সময় ঘোষিকার সুললিত কণ্ঠ শোনা গেলÑ মাননীয় শ্রোতাম-লী। এই উদ্ভট সমাবেশে শামিল হওয়ার জন্য সবাইকে অভিনন্দন জানাই। আমরা এবার সরাসরি অনুষ্ঠান শুরু করছি। এ সভার কোনো সভাপতি নেই। সবাই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখবেন। দয়া করে কোনো তর্ক বা বিত-ার মধ্যে জড়িয়ে পড়বেন না। যারা অংশগ্রহণ করবেন সবাই কিন্তু গবেষক। রিসার্চই ওদের ব্রত। প্রথমেই ডেকে নেব ড. বিষাদভানু পত্রনবিশকে। মঞ্চে উঠেই কোনো ভণিতা না করে ভাষণে চলে গেলেনÑ ‘বন্ধুগণ, আমাদের দেশ সজিনা ডাঁটা, ভালো করে চিবোতে হবে। ছিবড়ে হয়ে গেলে ফেলে দিন, বহু শ্রমিক রাত-দিন পরিশ্রম করছে পৃথিবীর আবর্তন উল্টো পাকে ঘোরাতে, একবার উল্টো আবর্তে ঘুরলেই বাজিমাত! আমরা কেউ আর বুড়ো হব না। পিছু হাঁটতে হাঁটতে ফিরে পাব যৌবন, যৌবনের সব রঙিন স্বপ্ন... কৈশোর, বাল্য... শৈশব। এবং তার পর ভ্রƒণাবস্থা, ফের চলে যাব মাতৃজঠরে।’

হঠাৎ এক শ্রোতা গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে যারা জেলের ঘানি টানছে... যাদের জেলের মেয়াদ প্রায় শেষের মুখে তাদের কী হবে? মেয়াদ যে আরও বেড়ে যাবে! যারা মৃত তারা কি আবার বেঁচে উঠবে? পৃথিবীতে অত জায়গা কোথায়?’

বিষাদভানু একটু ফাঁপরে পড়লেন, আমতা আমতা করে জানালেন, ‘চিন্তা করবেন না। এ বিষয়ে রিসার্চ চলছে। কিছু একটা সুরাহা হবেই।’ তার পর হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে শুরু করলেন, ‘কী বলছিলাম যেন...? হ্যাঁ গ-ার, আঠারো মাস গর্ভধারণ করে বাচ্চা প্রসব করে। হাতি উনিশ মাস। আর ইঁদুর? মাত্র একুশ দিন! এখন ভাবার সময় এসেছে আমরা কার পক্ষ নেব? হাতি বা গ-ারের, নাকি ইঁদুরের?... নোবেল শান্তি পুরস্কার এবার থেকে দেওয়া হবে অসুর বা দানবদের হাতে, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অনিষ্ট সাধন করেছে। ...আমার বক্তব্য শেষ।’পরবর্তী বক্তা ব্রীড়াবনত ঘোড়–ইকে মঞ্চে আহ্বান জানাতেই তিনি শুরু করলেন, ‘দেখুন, আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। হাতে সময় বড্ড কম। ধরপাকড় শুরু হয়ে যেতে পারে। যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। স্বপ্ন। কাল থেকে স্বপ্ন দেখা নিষেধ। স্বপ্ন আর সত্যের মাঝামাঝি একটা অবস্থান বেছে নিতে হবে। তাহলে আর কষ্ট থাকবে না। স্বপ্ন দেখবে মুষ্টিমেয় কিছু চালবাজ। টপ ফোরে উঠেই তারা দরজা বন্ধ করে দেবে। বলবে নো এন্ট্রি!’ এক বাচাল একরোখা শ্রোতা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করছে, ‘এটা কার উদ্দেশে বলা হলো শুনি? আমরা কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি?’

স্বপ্ন নিয়ে যার গবেষণা সেই ড. ব্রীড়াবনতবাবু কথার খেইটা লুফে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ ঘাস, ঘাসের কথাই যখন উঠল তখন বলি, এই ঘাস প্রকৃতির কী প্রাণদায়িনী সৃষ্টি। গরু, মোষ, হরিণ এরা সব ঘাস খায়, বাঘ, সিংহ, চিতা এরা ঘাস খায় না, খায় তৃণভোজীদের মাংস। তাহলে ভাবুন ঘাসের গুরুত্ব কী অপরিসীম। এই ঘাসেই আবার হেমন্তে শিশির পড়ে।... হ্যাঁ, আর একটা কথা, আমাদের মনে রাখা উচিত এয়ারপিলোর ভেতরে যে বাতাস তা কিন্তু আমাদেরই ফুসফুসের।’

এবার ঘোষণামতো মঞ্চে এলেন ড. ক্রোধান্বিত চাটুজ্যে, কোনো গৌরচন্দ্রিকার ধারে-পাশে না গিয়ে সরাসরি বললেন, ‘রবীন্দ্রসংগীত রচনা করতে হবে। স্টক ফুরিয়ে আসছে, আসবে না! দুই হাজার তিনশ বাইশটি গান দিয়ে আর কতদিন চলবে? আসুন, সবাই কোমর বেঁধে লেগে পড়ি রবীন্দ্রসংগীত রচনার কাজে। যেগুলো এখনো আমাদের মোহাচ্ছন্ন করে, আসুন, সেগুলোকে ভেঙেচুরে মোচড় মেরে গুঁতিয়ে সিধে করে দিই, চুপি চুপি বলে যাই, এ বিষয়ে জোর কদমে রিসার্চ চলছে।’ পরবর্তী বক্তা ড. বর্ণাঢ্য বারিক শুরু করলেন বর্ণমালা দিয়ে, ‘দেখুন বন্ধুগণ, আমাদের যত বঙ্গারম্ভি তা শুরু স্বরবর্ণের অ, আ থেকে এবং শেষ ব্যঞ্জনবর্ণের চন্দ্রবিন্দু দিয়ে। যত লেখা, সাহিত্য, কবিতা, নাটক, গান, প্রেমপত্র, খিস্তিখেউড়, গালাগালি সবই কিন্তু ঘুরপাক খাচ্ছে ওই পঞ্চাশটি বর্ণের মধ্যে। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে পঞ্চাশটি বর্ণে আর কুলোচ্ছে না। বর্ণভা-ারে টান পড়ছে। বিস্তর ভাবনাচিন্তা করে, বহু বইপত্তর ঘেঁটে আরও একুশটি বর্ণকোষ সৃষ্টি করেছি, ফলে বর্ণের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে তিনটি, যথাÑ স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ এবং ছ্যাঁচড়াবর্ণ।’ ‘দয়া করে ওগুলো বলবেন। লিখে নিতাম।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, লিখুন। ছ্যাঁচড়াবর্ণের অন্তর্গত বর্ণকোষগুলো হলোÑ বর্জ্যফলাং, রেফছেদার্তো, বিসর্গদ্বিত্ব, প-ফলাং, ঢেকুরনুস্বার, হ্যাঁচছোফলাং, ফুৎকারোস্বার, ভাষা সংহারবিন্দু, বর্ণ বিসর্জনোৎকার, গিজিঘিনিক্ষিয়, দ্রুতোনিষ্পত্যাং, অন্তর্জলিলুপ্তোকারং...। এ রকম সব আরও আছে। রিসার্চ চলছে এসব বর্ণকোষের সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কিনা দেখতে।’

সঙ্গে সঙ্গে একজন শ্রোতা খেই ধরিয়ে বলে, গজাঘণ্টইলেকং, তালব্যফুৎকারম, খ--ছ... এগুলোর কথা তো বললেন না।’

‘বা! বেশ মনে আছে দেখছি। খুব ভালো।’

সংগীত গবেষক ড. কর্ণভেদী চট্টরাজ মঞ্চে উঠতেই দর্শকরা উৎসাহে ফেটে পড়ল, মাইক হাতে বিচিত্রসুরে কিছু স্বরলিপি গার্গেল করেই প্রবেশ করলেন মূল বক্তব্যে। ‘এতদিনে আপনাদের মালুম হচ্ছে নিশ্চয়ই যে সপ্তসুরে আর কুলোচ্ছে না। কুলোবে কী করে? আরে বাবা সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নিÑ এই সাতসুরে এখনকার তানসেনদের বেঁধে রাখা যায় কখনো! আকাশচুম্বী সব প্রতিভা। বাঁধন মানবে কেন? অনেক খেটেখুটে রিসার্চ করে আরও ন-টা সুরের সন্ধান পেয়েছি।’ ‘আরও ন-টা। বলেন কী? সুরের ঠ্যালায় টিকতে পারব তো?’

‘আগে তো লিখুন। তার পর আমি গেয়ে সুর করে শুনিয়ে দেব। সুরের পর্যায়গুলো এ রকম। ভ্যাঁ ভোঁ ভ্যাঁক। গ্যাঁ-গ্যাঁগ। প্যাঁ প্যাঁগ। খ্যাঁ খ্যাঁক। খ্র্যাঁ খ্র্যাঁচ। ওঁয়া-ওঁয়্যাক। ক্যাঁক-প্যাঁক, ঝিনচ্যাক এবং খ্যাচাং খ্যাচ। এখন একটা মূল্যবান কথা। এই যে নয় সুর বা নবাসুর, এদের দৌলতে সংগীতের সপ্তকও কিন্তু বেড়ে গেছে। উদারা মুদারা এবং তারার পর যোগ হয়েছে আরও তিনটি সপ্তকÑ ভ্যানতারা, ক্যানাস্তরা এবং পাঁয়তারা, এসব সপ্তকের সুবিধে হচ্ছে কোমলগান্ধার থেকে জাম্প করে ঘোরান্ধকারে অনায়াসেই যাতায়াত করা যায়। তবে এ বিষয়ে আরও রিসার্চ চলছে।... এবার এই নতুন সুরের প্রয়োগ করে দেখাব।’ কিন্তু তার আগেই ঘোষিকা ওর কানে কানে কিছু বলতেই উনি ঘোষণা করলেনÑ ‘সময় বড্ডা কম এখন আর গাওয়া যাচ্ছে না, নমস্কার।’

এবার মঞ্চে এলেন ভাষাতত্ত্ববিদ ড. দজ্জাল প্রতাপ বটব্যাল। ইনি নাক ঝাড়েন সংস্কৃতে, হাঁচেন-কাশেন বাংলায়। ঢেঁকুর এবং হাই তোলেন ইংরেজি। আবার গভীর ঘুমে নাক ডাকেন ফরাসিতে। মাইকে বারকয়েক ফুঁ দিয়ে বেমক্কা শুরু করলেন, “দেখুন ইংরেজি অ্যালফাবেট ‘এ’ থেকে শুরু হলেও ‘জেড’-এ শেষ হচ্ছে না। গভীর গবেষণা করে জেনেছি ছাব্বিশটা নয়, ইংরেজি অ্যালফাবেট হচ্ছে ছত্রিশটা। লিখে নিন। ফ্যাট্রাক, হুডুংক, গ্রিজিং, এসটি-স্ট্রা, নেপটো এসএম, রাস্ক এল, ফের্কু-লারম ক্যানা-ডর্ম, ফক্কিক্রেসি এবং ডেসট্র-এন।”

শ্রোতাদের মধ্যে বিপুল উদ্দীপনা, শব্দগুলোর মধ্যে কেউ কেউ অনন্তশক্তির সন্ধান পেলেন, আবার কেউ বলছেনÑ বোগাস, অন্তঃসারশূন্য। দূরাগত শব্দটা কিছুক্ষণ আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কিসের বোঝা যাচ্ছিল না। এক সময় আকাশে ফুটে উঠল একটা বিন্দু। তার পর দেখা গেল একটা লাল-হলুদ রঙের হেলিকপ্টার উড়ে আসছে গগনবিদীর্ণ করে। বার দুই চক্কর কাটল সভাস্থলের ঠিক ওপরেই। বাপ রে! কী কানফাটা শব্দ! এক সময় ওটা ভেসে থাকল মঞ্চের বেশ কিছুটা ওপরে। মাথার ওপর বিশাল পাখা বনবন ঘুরছে। হঠাৎ ওর তলপেটের ঢাকনা খুলে গেল। চকিতে ঝুলে পড়ল দড়ির শক্ত মই। আর তার পর সরসর করে নেমে এলো আটজন কমান্ডো সৈন্য। কাঁধে ঝুলছে ইনসাস রাইফেল। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় ঘিরে ফেলল মঞ্চের চারপাশ। একজন মঞ্চে উঠে দখল নিল মাইকের। ‘... আপনারা অযথা বিচলিত হবেন না, আসলে কয়েকদিন আগে বেশকিছু বদ্ধ উন্মাদ পাগলা গারদ থেকে চম্পট দিয়েছে তাদেরই খোঁজ চলছিল হন্যে হয়ে, যাক তাদের সন্ধান পাওয়া গেছে এইমাত্র।... ওরা এতক্ষণ যে পাগলের প্রলাপ আপনাদের শুনিয়েছে তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মন থেকে মুছে ফেলুন। তাতে আপনাদেরই মঙ্গল।’ গবেষক বক্তাদের ভ্যানটা যখন সতর্ক প্রহরায় জনতার ভিড় বাঁচিয়ে গন্তব্যস্থলের দিকে এগোচ্ছে, কে একজন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছেÑ ‘দেশটা একটা সজিনা ডাঁটা। চিবিয়ে চিবিয়ে ছিবড়ে করে দিতে হবে।’ ভ্যানের ভেতরে ঝিমোতে থাকা সেই প্রথম বক্তা ড. বিষাদভানু পত্রনবিশ শিরদাঁড়া সোজা করে বসলেন বিপুল জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে