স্বাধীন কবি আমিনুল ইসলাম

  জাকির তালুকদার

২৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কবি হিসেবে আমিনুল ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ততা। এমন দাবি করার কোনোই কারণ নেই, স্বতঃস্ফূর্ততাই কবিতার অনিবার্য শর্ত। তবে তা যখন থাকে কোনো কবিতায় এবং সেই কবিমন যখন হয় পরিশীলিত এবং সেই সঙ্গে কবিতায় যখন থাকে সযতন নির্মিতির স্বাক্ষর, তখন কবিতা হয়ে ওঠে সত্যিকারের প্রসাদগুণসম্পন্ন। ‘প্রসাদগুণ’ শব্দটি অধুনা কবিদের কাছে হয় অপরিচিত অথবা পরিত্যক্ত একটি গুণ। কিন্তু তার অভাবে যেসব কবিতা এবং সব শিল্প বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি অহরহ। স্বতঃস্ফূর্ততা এমন একটি বিষয়, যা কবির অন্তঃকরণ চিনে নিতে সাহায্য করে। সেই স্বতঃস্ফূর্ততার কল্যাণে আমিনুল ইসলামের কোন পরিচয়টি তার কবিতার মাধ্যমে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়? তা হচ্ছে তিনি সার্বক্ষণিক কবিতা-আক্রান্ত এক বরেন্দ্রীসন্তান। বরেন্দ্রী, যা ছিল সন্ধ্যাকর নন্দী থেকে শুরু করে চর্যাপদের অনেক পদ রচয়িতার চারণক্ষেত্র। সেখানে লালমাটিতে যেসব কবিতা জন্ম নেয়, সেগুলোয় থাকে এক ধরনের ‘কর্কশ লাবণ্য’। পুতুপুতু আবেদনের পরিবর্তে সেসব কবিতায় প্রাধান্য থাকে পৌরুষের। আমিনুল ইসলাম সেই ধারা বহন করে চলেছেন একজন গর্বিত উত্তরাধিকারী হিসেবে। দীর্ঘদিন থেকে আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও গ্রন্থে, সভা ও সমাবেশে কারণে-অকারণে অহরহ উচ্চারিত হতে শুনছি বিপ্লব শব্দটি। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এক ধরনের কবি ও কবিতার ক্ষেত্রে শব্দটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভাবলে অবাক হতে হয়, তথাকথিত রাজনৈতিক কর্মীরা যেমন অপপ্রয়োগ ঘটাচ্ছেন ‘বিপ্লব’ শব্দটির, বর্তমানের অনেক কবিতাকর্মী ও কাব্য-সমালোচকও সেই একইভাবে অর্বাচীন প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছেন শব্দটির। যাকে বিপ্লবী কবিতা হিসেবে অহরহ ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, বিশেষায়িত করা হচ্ছে, তা বড়জোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রতিবাদী চেতনা ও স্লোগানধর্মী কবিতা হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য। এই ধরনের কবিতা অধিকাংশই শিল্পমানবর্জিত। কোনো কোনোটি শিল্পমান অর্জন করলেও তাকে ভালো কবিতা বলা যেতে পারে। কিন্তু এই জাতীয় কবিতা কখনই শিল্পের ইতিহাসে বিপ্লবী কবিতা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে না। তা হলে বিপ্লবী কবিতা আমরা কাকে বলব? কাকে বলব কবিতায় বিপ্লব?

মানবসভ্যতার একটি অঙ্গ বা উপাদান হিসেবে গ্রহণ করলেও নিঃসন্দেহে বলা চলে, মানবসভ্যতার সঙ্গে কবিতার একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এরা একে অপরের পরিপোষক এবং পরিগ্রাহক। এ দুইয়ের গতিপথ কখনো অভিন্ন, কখনো সমান্তরাল, কখনো সামনে-পেছনে প্রবহমান। অর্থাৎ তার নিজস্ব গতিপথ রয়েছে। আর গতিপথ রয়েছে বলেই গতিবৈচিত্র্য ও গতিপরিবর্তনও রয়েছে। সেই কারণে জীবনের মতোই, জীবন্ত সবকিছুর মতোই কবিতারও রয়েছে বিবর্তন এবং কোনো কোনো ঐতিহাসিক প্রয়োজনে মুহূর্তে কবিতায় ঘটে যায় বিপ্লবও। বিবর্তন যেখানে নিয়মবদ্ধ অথচ দৃঢ়পায়ে অমোঘ নিয়তির মতো বর্তমান টেনে নিয়ে চলে ভবিষ্যতের দিকে, বিপ্লব সেখানে প্রচ- উন্মাদনা এবং ‘সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলা’র মাধ্যমে ভবিষ্যৎ টেনে এনে বসিয়ে দেয় বর্তমানের জায়গায়। উল্লেখ্য, বিপ্লবের প্রয়োজন হয় তখনই, যখন বিদ্যমান পরিস্থিতি আর মানুষের আকাক্সক্ষা ও প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয় না। অর্থাৎ যখন বিদ্যমান পরিস্থিতি থাকে মানুষের প্রয়োজন এবং আকাক্সক্ষার তুলনায় অনেক বেশি পশ্চাৎপদ অবস্থায়। অন্য কথায়, স্থবিরতার পলি যখন বিবর্তনের নাব্যতা দিয়ে অপসারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখনই ত্রাণকর্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হতে হয় বিপ্লব। অবশ্যই বিপ্লবের সফল সংঘটনের জন্য দুটি অপরিহার্য শর্ত পূর্ণ হতে হবে। একটি হচ্ছেÑ বিপ্লব আবশ্যক বা বিপ্লব অপরিহার্য, এরূপ একটি প্রত্যাশাপূর্ণ পারিপার্শ্বিক চাহিদার উপস্থিতি। যাকে এক কথায় বলা যেতে পারে বিপ্লবী পরিস্থিতি বা অবজেকটিভ কনডিশন। অন্যটি হচ্ছে বিপ্লবের সফর সংঘটন, তাকে রক্ষা ও সংহত করার মতো মেধা-মনন-কর্মক্ষমতার সমন্বিত শক্তি বা সাবজেকটিভ ফোর্স। এ দুই শর্তের সম্মিলন না ঘটলে বিপ্লব সংঘটন অসম্ভব। প্রথম শর্তের অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় শর্ত অর্থাৎ বিপ্লবী শক্তির প্রয়োগ হঠকারিতায় পর্যবসিত হয়। অন্যপক্ষে দ্বিতীয় শর্তের অনুপস্থিতিতে প্রথম শর্ত হচ্ছে ফসলহীন বন্ধ্যাজমি। কাজেই বিপ্লব হচ্ছে চাহিদা এবং যথোপযুক্ত শক্তির প্রস্তুতির শুভ সম্মিলনের ফসল। এই মৌলসূত্রকে বিবেচনায় রেখে আমরা আমাদের কবিতায় সংঘটিত বিপ্লবগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে পারি। একই সঙ্গে চিহ্নিত করতে পারি বিপ্লবী কবিতাকেও।

কবিতা রচনা বা কবিতার জন্মদানের মুহূর্তে কবি একক ও নিঃসঙ্গ। কিন্তু এ কথাটি শুধু বাহ্যিকভাবে সত্য। বিপরীতে বরং বলা চলে, নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোতেই একজন সৃষ্টিশীল মানুষ সর্বাধিক সঙ্গী পরিবেষ্টিত থাকেন। তখন তার সঙ্গে থাকে তার অধীত, ইন্দ্রিয়-অতীন্দ্রিয়লব্ধ যাবতীয় সুরের গুঞ্জন ও কাব্যের অনুরণন, যেগুলো তার পূর্বজ ও সমকালীন কবিদের সৃষ্টি, তার সঙ্গে থাকে তার ভাষার কাব্যের ঐতিহ্যের সারাৎসার, থাকে দেশ-কাল-সমাজ-আন্দোলন-রাষ্ট্রকাঠামো-সমাজকাঠামো-দৃষ্টিভঙ্গি-মূল্যবোধ। আরও থাকে তার অন্তর্দৃষ্টিতে উপলব্ধ ভবিষ্যতের হাতছানি। সেই কাজে সফল হলেই মাত্র একজন কবি ঘটাতে পারেন কবিতায় বিপ্লব। এ দুরূহ শৃঙ্গ-আরোহণের সফলতা এত ঝুড়ি ঝুড়ি সৃষ্টি হয় না যে, আমরা যত্রতত্র বিপ্লবী কবিতার অভিধা প্রয়োগ করতে পারি। কাজটি দুরূহ বলেই ভালো বা মানসম্মত কবিতার সংখ্যা নেহাত কম না হলেও বিপ্লবী কবিতার সংখ্যা হাতে গোনা যায়। পৃথিবীর সব দেশে সব যুগে সব ভাষার ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। মালার্মে বহুদিন পর্যন্ত ছিলেন তার পূর্বসূরিদের কাব্যধারার অনুকারী চর্চাকার। কিন্তু যখন তিনি স্থির উপলব্ধিতে উপনীত হলেন যে, ‘কবিতা লিখতে হয় আইডিয়া দিয়ে নয়, শব্দ দিয়ে’, তার পরই তিনি আঙ্গিকগতভাবে কবিতার বিপ্লব সংঘটনের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। আইডিয়া বা বিষয়নির্ভরতার অচলায়তন থেকে মালার্মের হাতে মুক্তি অর্জন করল কবিতা। রবীন্দ্রনাথ তার কবিজীবনের শুরুতে ছিলেন বিহারীলালের গীতিকবিতার দক্ষ ও সনিষ্ঠ অনুকারক। কিন্তু যেদিন তিনি ময়ূরপুচ্ছের আবরণ সরিয়ে আবিষ্কার করলেন ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, তখন থেকেই তিনি পরিণত হলেন বিপ্লবী এক কাব্যধারার জনক হিসেবে। পরবর্তীকালে এই রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রতিভার দ্বারাই বাংলা কবিতার সর্বনাশ ঘটতে যাচ্ছিল। তার সার্বভৌম প্রতিভা এবং তুলনারহিত শ্রমের ফসল হিসেবে জন্ম হলো বাংলা কবিতার এক সুবিশাল মানসহ্রদ। কিন্তু হ্রদ যত বিশালই হোক না কেন, শেষবিচারে তা বদ্ধ এবং গতিহীন। ধারণা করা হয়েছিল, এই রবীন্দ্র-হ্রদই বাংলা কবিতার শেষকথা। রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতায় আর কোনো পথ-পরিবর্তন, এমনকি পথচলারও অবকাশ নেই। এ বদ্ধদশা থেকে বাংলা কবিতা মুক্ত করলেন নজরুল-সুধীন দত্ত-বুদ্ধদেব বসু-বিষ্ণু দে-অমিয় চক্রবর্তী এবং অবশ্যই উচ্চার্য আরেকটি নাম জীবনানন্দ দাশ। তারা খুলে দিলেন বাংলা কবিতার নতুন নতুন মুখ। শুধু খুলেই দিলেন না; অকান্ত জলসিঞ্চনে নাব্য দিলেন সেই গতিপথ।

উপরোক্ত লক্ষণ এবং চিহ্নগুলো সামনে রেখে আমিনুল ইসলামকে কি আমরা বিপ্লবী কবি বলতে পারি? যদি তা না বলতে পারি, তা হলে এটুকু অসঙ্কোচে বলতেই পারি যে, আমিনুল ইসলাম ‘স্বাধীন কবি’। আমিনুল ইসলাম সেই ধরনের স্বাধীন কবি, যাকে শঙ্খ ঘোষ সংজ্ঞায়িত করেছেন অনবদ্য কাব্যিকতায়Ñ ‘আমার যদি ইচ্ছে হয় প্রেমেরই কথা বলি, আমার যদি ইচ্ছে হয় প্রকৃতিতে যাই; আমার যদি ইচ্ছে হয় দুরূহতায় যাই; আমার যদি ইচ্ছে হয় অলঙ্কারে বলি, আমার যদি ইচ্ছে হয় নিরাভরণ হই; আমার যদি ইচ্ছে হয় ছন্দ দিয়ে বলি, আমার যদি ইচ্ছে হয় ছন্দ ছেড়ে যাই।’

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে