খো লা চি ঠি

কবি আহসান হাবীব সমীপে শ্রদ্ধাভাজনেষু

  নাসির আহমেদ

০৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আপনার জীবদ্দশায় পেয়েছিলেন তরুণদের গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। অনেক তরুণ লেখকই আপনার কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেনÑ লিখেছেন প্রবন্ধ, নিবন্ধ। অথচ আপনার সহকারী হিসেবে এত ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকেও আমি লিখতে পারিনি একটি লাইনও আপনার সম্পর্কে। আপনি নিজেই চাইতেন না আমি লিখি। অথচ প্রায়ই বলতেন, তুমি আমাকে যেভাবে কাছ থেকে দেখছ, আমার সাহিত্যকর্ম অনুধাবন করছ, তুমি লিখলে আমাকে একেবারে তন্ন তন্ন করে বিশ্লেষণ করতে পারতে। প্রকৃত বিশ্লেষণ তোমার পক্ষেই সম্ভব হতো। কেননা আমার কবিতার অনেক প্রতীক চিত্রকল্পের আড়ালটুকু আমার সঙ্গে নিবিড় সংস্পর্শের কারণেই হোক, কিংবা আমাকে অনুধাবনের চেষ্টার জন্যই হোক, তোমার কাছে আর আড়ালে থাকেনি, থাকে না।

কিন্তু যখনই বলতাম হাবীব ভাই, আমি আপনার কবিতার ওপরে একটা আলোচনার খসড়া চিন্তা করেছি। অমুক পত্রিকায় লিখে দিই? আপনি মৃদু হেসে বলতেনÑ সেই খসড়াটা আমার কবিতার কোন দিক প্রসঙ্গে আগে শুনে নিই। আমি অনর্গল বলে যেতাম আপনার কবিতার বিভিন্ন দিক সম্পর্কিত আমার চিন্তাভাবনার কথা। আপনি বলতেনÑ থাক তোমার চিন্তায় জমাতে থাকো। লিখবে, যখন আর আমার সহকারী হিসেবে থাকবে না, আমার সঙ্গে এখন জড়িত আছ। এখন এই লেখা ছাপা হলে তোমার কাব্যবোধের মূল্যায়ন হবে না, সমালোচনা হবে অন্যভাবে। আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রের হালচাল তো জানোই।

যদি আপনার সহকারী হওয়ার গৌরব থেকে আমাকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে সেই কাব্য আলোচকের গৌরব অর্জন করতে চাইনি আমি। আপনি হাসতেন। বলতেন, ‘বোকা ছেলে, সারা জীবনই কি আমার সহকারী থাকবে নাকি তুমি? ঠিক আছে সহকারী থেকেই লেখো। যেদিন আমি থাকব না। হাবীব ভাই আপনি কেন আমাকে লিখতে দেননি, তা আপনি যেমন জানতেন আমিও। সমকালীন সাহিত্যের আসরে আপনি কারো কারো নির্মম ঈর্ষারও শিকার হয়েছিলেন।

আপনার ৬০ বছর পূর্তি উৎসবের উদ্যোগ নিয়েও আপনার অনুরাগীরা কেন তা করতে পারেননি, আপনার অজানা ছিল না। আপনার প্রতি আমার আনুগত্য আর আপনার কবিতার মুগ্ধতা আমাকেও শত্রুতে পর্যবসিত করেছিল তা আপনি নিজেই দেখে গেছেন। আপনার মৃত্যুর পর সেই শত্রুতা আমার রুটিরুজির পথটাই রুদ্ধ করে দিতে বসেছিল। আপনার মতো উচ্চ রুচির একজন কবি, একজন নিষ্ঠাবান সাধকতুল্য সাহিত্য সম্পাদক কেন দৈনিক বাংলার মতো বড় প্রতিষ্ঠানে একটি ছোট্ট ঘরে বসে কাজ করে গেছেন, তা আপনি যেমন জানতেন, আমিও জেনেছিলাম।

আপনার অপরাধ আপনি ষাটোর্ধ্ব বয়সেও কবি হিসেবে প্রাচীন প্রবীণ হয়ে যাননি। আপনি রাত্রিশেষ কাব্যগ্রন্থে অবিভক্ত বাংলার যে সমাজচিত্র এঁকেছেন, বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ আর আপনার সমকালীন রাজনীতির যে চিত্র এঁকেছেন, তা আপনাকে অনেক উচ্চতায় আসীন করেছিল। আপনার অপরাধ আপনি পুনরাবৃত্তিতে আক্রান্ত হননি। একটি কাব্যগ্রন্থ থেকে আর একটি কাব্যগ্রন্থে নিজেকে নবায়ন করে নিতেন আপনি। আপনার অপরাধ আপনি কাউকে তোষণ করেন না, আপনার কারো কাছে কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকে না। আপনি সমকালীন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যোগ দেন না। আপনি নির্বিকার আপনার অবস্থানে থেকেই সাহিত্য চর্চা করেন। সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে আপনি সত্যিকার গুণবিচারি, সাহিত্য সম্পাদনায় আপনি জীবন্ত কিংবদন্তি। আপনার হাত দিয়ে কবিতা ছাপা হলে তিনি কবি সমাজে কবি বলে বিবেচিত হন। আপনার বড় চেয়ার নেই, আপনার গাড়ি নেই, সম্পদ নেই বলে প্রাচুর্যের জৌলুসও নেই। অথচ তার পরও আপনি আলোচিত, আলোকিত আপনাকে ঘিরে মুগ্ধ তরুণ লেখকরা। এসব অপরাধের কারণেই কি আপনার বর্ণাঢ্য সাহিত্য পাতাগুলো কমতে কমতে দেড় পৃষ্ঠায় এসে ঠেকেছিল। সে কারণেই কি বাড়তি বিজ্ঞাপন টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি আপনার সম্পাদিত সাহিত্য পাতার কবিতার প্যারালালে প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল প্রেস ম্যানেজারকে? এসব উত্তর আপনার অজানা ছিল না। কিন্তু নিজের ভেতরে দগ্ধ হয়েও শালীনতার প্রাচীর থেকে একটি ইটও খসে পড়তে দেননি। আপন দহনে নিভৃতে দগ্ধ হয়েছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যে অভিভাবক হিসেবে আপনাকে আমরা পেয়েছিলাম পরম সুহৃদ স্বজন এবং শিক্ষকেরও ভূমিকায়। সে কারণেই আপনার মৃত্যুর পর নির্মলেন্দু গুণের মতো জনপ্রিয় কবি প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে লেখেন : ‘আমার যেটুকু কবি হওয়া তার অনেকটাই যে তার সস্নেহ শাসনে ও প্রশ্রয়ে সম্ভব হয়েছে সে ঋণ শুধু স্বীকারের মধ্যেই শেষ হওয়ার নয়’। ( দৈনিক বাংলা, ১২ই জুলাই ১৯৮৫)

হাবীব ভাই, শুধু নির্মলেন্দু গুণ বা তার সমসময়ের কবি সাহিত্যিকরাই নন, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের আমাদের অনেকেরই আপনার প্রতি একই ঋণের কৃতজ্ঞতা। বহন করি। এমনকি আমাদের পরের প্রজন্ম যারা আপনার জীবন সায়াহ্নে পেয়েছিল সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতা আর পরিচর্যাÑ তারাও অনেকে আজ লিখছেন আপনার সেই অপরিশোধ্য ঋণের কথা।

হাবীব ভাই, আমাদের সাহিত্যকে আপনি নানাভাবে ঋণী করে গেছেন। সেই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। আপনি আমাদের সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেননি। পাকিস্তানি তমুদ্দিনী সাহিত্য আপনাকে স্পর্শ করেনি। আধুনিক বাংলা কবিতার মূল ধারায় থেকেও চেতনায় আপনি তিরিশোত্তর প্রকৃত আধুনিক। বাংলার নিসর্গ-প্রকৃতি আপনার স্বজন। আপনি জমিলার মায়েদের শূন্য খাঁ খাঁ হাঁড়ি চিনতেন। তাই প্রতীকী চিত্রকল্পময় কবিতায় যেমন, তেমনই সাধারণের হৃদয়স্পর্শী কবিতায় আপনাকে পাই লোকায়ত জীবনের রূপকার হিসেবে।’

আপনার একটি কবিতার উদ্ধৃতির মধ্য দিয়েই সবাইকে জানাতে চাই আপনি কে ছিলেন? কী ছিলেন এ দেশের মানুষের?

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নগরবাসী হয়েও আপনি তথাকথিত নাগরিক হয়ে যাননি, আপনার চেতনায় ঘুঘুর ডাক, কাঁঠাল পাতার ছায়া, নিশিন্দার হরিৎ লাবণ্য, ভোরের কুয়াশা আর খালেক নিকিরিদের স্বপ্ন অবিরল ঝরত আপনার স্বপ্নে, স্মৃতিতে। মেঘনা পারের ছেলে হয়ে তালের নৌকা বাইতে বাইতে আজীবন আপনি ভেসে গেলেন বাংলার সবুজ প্রকৃতিলগ্ন স্বপ্নের ভেতরে এই বাংলার শত নদীর বিচিত্র ঢেউয়ে। বাংলাদেশের দুঃখী জমিলার মায়েরা সে কারণেই আপনাকে মনে রেখেছে এতকাল, কেননা আপনিই চিনেছিলেন তাদের শূন্য খাঁ খাঁ হাঁড়ি, রান্নাঘর, দূর নগরবাসী হয়েও তাই কোনো আগন্তুক হননি তাদের চোখে। আপনি তাদের স্বজন একজন। আর সে কথারই জ্বলন্ত স্বাক্ষর আপনার সর্বশেষ কবিতাগ্রন্থ ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’-এর শেষ কবিতা ‘স্বজনদের কথা’।

এই শুভ্র মাঠ এই মাটির সোদাল গন্ধ

এই স্নিগ্ধ পথরেখা কার,

কে দেয় পাহারা আর

কে বৈশাখে মাঠের পানিতে নিত্য

ভোর থেকে মধ্যদিন চালায় লাঙল?

এ কোন সামান্য যুবা

যেন যুবরাজের মহিমা তার

মুখের রেখায়? তাকে

আমি চিনি, সে আমার স্বজন একজন

সে আমার ভাই।

চকচকে মসৃণ জাল এক হাতে

অন্য হাতে বৈঠা কার

ভাসমান অথৈ নদীতে?

এক ঝাঁক রূপালী শস্যের খোঁজে কার

দিন যায় রাত যায়?

কে এমন আত্মমগ্ন সন্তের মতোন যায়

যায় ভেসে যায়, যায়

আমার আপন জন,

একান্ত স্বজন যায়

সে আমার ভাই।

এই স্নিগ্ধ অকৃত্রিম বসতি এবং এই শ্যামলতা

যেন এক আদিম বাগান।

এরা কারা

কারা এর পরিচর্যাভার নিয়েছে আপন হাতে, কারা

বিরোধে ও প্রতিরোধে এবং অপার ক্ষমতায়

কাল থেকে কালান্তর এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে রয়ে গেছে

কারা এরা? এদের হাতের মাটিমাখা মুঠোয় রাখলে হাত

রক্তস্রোত তীব্র হয় কেন? কেননা আমার

আমাদের একান্ত স্বজন এরা আমাদের ভাই

আমাদের উৎস থেকে আলোকিত করে

এরা আছে

এরাই ধারণ করে আমাদের জীবনযাপন।

হাবীব ভাই, আপনার শিশুসাহিত্য, গল্প-উপন্যাস সর্বোপরি উচ্চরুচির সম্পাদনা-ঋণে আমাদের সাহিত্য ঋণী হয়ে আছে। এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে