আনোয়ার কামালের গ ল্প

সন্দেহ

  অনলাইন ডেস্ক

৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মৌলি তার অফিস ও মেয়ে মৌনতাকে নিয়ে দারুণ ফাঁপরে পড়ল। মেয়ে ছোট, সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওকে স্কুলে দিয়ে নিজের অফিস সামলানো খুব কঠিন। মৌনতার বাবা কায়সার আবার আপন ভোলা মানুষ। চাকরি আর লেখালেখি নিয়েই সে ব্যস্ত। তাকে দোষ দেওয়া যায় না। লেখক হিসেবে তার বেশ নাম-ডাক। এখানে ওখানে প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। প্রাইভেট চাকরির পর যেটুকু সময় পায়, বই আর পত্রিকা নিয়েই পড়ে থাকে সে। আর স্বামী হিসেবে সে যেমন হ্যান্ডসাম, তেমনি চৌকষ। মৌলির ভালোই লাগে, পত্রিকায় স্বামীর লেখা ছাপা হলে। সহকর্মীরা যখন আগ্রহ নিয়ে লেখা পড়ে, তখন তার বুক গর্বে ভরে ওঠে। স্বামী-কন্যা নিয়ে তাদের সুখের সংসার। পারিবারিক কোনো ঝামেলা তাদের পোহাতে হয় না।

রিকশায় যাতায়াতে তার অসুবিধা না হলেও মেয়ের স্কুল ও অফিস কোনোভাবেই মেলাতে পারছিল না। বাসা অফিস থেকে খানিকটা দূরে হওয়ায় তাদের জন্য একটা গাড়ির খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ল। বাসায় মেয়েকে সঙ্গ ও দেখাশোনার জন্য ছমাস আগে রহিমাকে গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে। এখন তো বাসায় কাজের জন্য গ্রামের বাড়ি থেকে বাবা-মায়েরা মেয়েকে ঢাকায় পাঠাতে চায় না। কত ধরনের বিপত্তি। মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে, গৃহকর্ত্রীর খুনতির ছ্যাঁকা, চোরাগুপ্তা মার খেয়ে জীবন পর্যন্ত হারাতে হচ্ছে। এসব খবর তো আর বসে থাকে না। গাঁও গেরামের গরিব মানুষরাও এসব খবর লোক মুখে শুনে আর টিভি দেখে জেনে গেছে। দুমুঠো খাবারের জন্য বাবা-মাকে ফেলে গৃহকর্মী হয়ে ঢাকার এসে কম লাঞ্ছনার শিকার তো হচ্ছে না। ফলে এখন আর কেউ তাদের সন্তানকে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে দিতে চায় না।

এবার গ্রামের বাড়ি গিয়ে মৌলিদের বাড়িতে কাজ করে দূর সম্পর্কের চাচা জাফর প্রামাণিককে অনেক বুঝিয়ে তার মেয়ে রহিমাকে ঢাকা নিয়ে এসেছে। রহিমার বাবা জাফর প্রামাণিক দীর্ঘদিন ধরে তাদের বাড়িতে থেকে কাজ করছে। জাফর প্রামাণিক ছোটবেলা থেকেই মৌলিকে দেখে আসছে। মৌলির প্রতি তার মেয়ের মতো একটা স্নেহ জন্মে গেছে। আর মৌলিও তাকে চাচা বলে ডাকে। এবার বাড়ি গিয়ে মৌলি যখন রহিমাকে তার সঙ্গে ঢাকায় পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে জাফর চাচাকে, প্রথমে রাজি হতে চায়নি তিনি। পরে মৌলির অনুনয় ও বিনয়ী আবদারে রাজি হয়ে যায়। গ্রামের মানুষের মধ্যে এখনো সেই সারল্য, ভালোবাসা, মায়ার বন্ধন অটুট রয়েছে। গ্রামে গেলে মৌলি তা অনুভব করে।

দুই

মৌলি রহিমাকে যতেœই রাখে। তাকে তেমন ভারি কাজ করতে দেয় না। ভারি কাজ করার জন্য ছুটা বুয়া আছে। সেই সব কাজ সেরে দিয়ে যায়। ফলে রহিমা আর মৌনতা ঘরে বেশ আনন্দেই থাকে। মৌলিকে এবার বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখতে পেয়ে মৌনতার বাবা মুচকি মুচকি হাসে আর বলেÑ

Ñকি গো, তোমার মনে তো বেশ ফুর্তির আমেজ দেখতে পাচ্ছি।

Ñকেন নয়? তুমি কি চাও না আমি আনন্দ আহ্লাদে দিন কাটাই? মৌলি প্রতিউত্তরে বলে ওঠে।

Ñআমি তো তা বলিনি। তুমি অফিস-সংসার সামলে নিয়ে এত এনার্জি পাও কোথায়?

Ñএনার্জি কি আর সাধে আসে? করতে হয়। এ ছাড়া আর উপায় কী, বলো? দুজনে চাকরি না করলে সংসার চলবে? এই ঢাকা শহরে সংসার চালাতে গেলে তো আর একজনের রোজগারে চলবে না।

Ñকায়সার সাহেব একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেÑ হ্যাঁ, কী আর করব, বলো। আমারও মন চায় না, তুমি সারাদিন অফিসে পড়ে থাকো। আমি যদি আরও কিছুটা গুছিয়ে নিতে পারি, তাহলে তোমাকে আর চাকরি করতে দেব না। তখন শুধু মামণিকে দেখবে। ওর লেখাপড়ায় যতœ নিতে পারবে।

Ñমৌলি বলে, না। অসুবিধা নেই। আমি এর মধ্যে সব গুছিয়ে নেব। তুমি এসব নিয়ে ভাববে না। আর আমার চাকরি করতে তো ভালোই লাগে। সংসারে আর্থিক দিকটাও তো দেখতে হবে। কায়সার সাহেব বলেÑ তা তোমার যদি কোনো সমস্যা না হয়, তবে চালিয়ে যাও।

তিন

কায়সার মাহমুদ মৌলিকে একটা সারপ্রাইজ দিতে চায়, যা দেখে মৌলি আনন্দ আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে। তাই কিছুই বলে না। কাজটা গোপনে সেরে ফেলে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে বাসার নিচে এসে মৌলিকে ফোন দেয়।

Ñমৌনতাকে নিয়ে নিচে নেমে আসো। এ ধরনের ফোনে মৌলি খানিকটা অবাক হলেও মেয়েকে নিয়ে নিচে নেমে আসে। এসে তো অবাক। কায়সার বাসার সামনে একটা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

Ñএই সন্ধ্যায় কোথায় যাবে? গাড়ি নিয়ে এসেছ যে? আগে বলবে না, কোথাও বেড়াতে গেলে তো একটু সাজগোজ করতে হবে নাকি?

Ñতুমি বুঝতে পারোনি? কায়সার সাহেব বলে।

Ñকী বুঝতে পারিনি?

Ñগাড়িটা আজই ডেলিভারি নিলাম।

Ñগাড়ি কিনেছ? আশ্চর্য! বলবে না?

Ñসারপ্রাইজ দিলাম। মেয়েকে কোলে তুলে নেয় কায়সার সাহেব। তারপর সবাই গাড়িতে উঠে বসে। ভাবলাম, মেয়েকে স্কুলে রেখে তোমার অফিস যাতায়াত করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই ব্যাংক ঋণে কিনে নিলাম, কিস্তিতে প্রতিমাসে শোধ করতে হবে। কি তুমি খুশি তো?

Ñখুশি মানে, মহাখুশি। চিন্তাই করিনি।

Ñএই ড্রাইভারের নাম আযাদ। ও আমাদের অফিসের এক কলিগের গ্রামের ছেলে। ওই গাড়ি চালাবে। তারা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বাসায় ফিরে এসে গাড়ি গ্যারেজ করে। আযাদ চাবি দিয়ে চলে যায়। মাস তিনেক চালানোর পর ওকে পারমানেন্ট ড্রাইভার হিসেবে রেখে দিল ওরা।

পাঁচ

রাত থেকে রহিমার শরীর খারাপ। রাতে খায়নি। কয়েকদিন ধরে বলছে, বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু ও চলে গেলে মৌনতাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা, সঙ্গ দেবে কে? মৌলি খুব চিন্তিত। মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ড্রেসআপ করে দিচ্ছে। রহিমাকে তাগাদা দিচ্ছে মৌনতার সঙ্গে স্কুলে যেতে। ড্রাইভারকে ফোন করছে কিন্তু ধরছে না। মাঝে মধ্যে ‘সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না’ ভেসে আসছে।

রহিমা ওয়াশরুমে ঢুকে ওয়াক ওয়াক করে বমি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বমি হচ্ছে না। মৌলি ছুটে যায়Ñ

Ñকি রে? কী হয়েছে? বমি হবে নাকি? রহিমা কিছু বলে না। মৌলি চিন্তায় পড়ে যায়। মেয়ের স্কুল, তার অফিস, ড্রাইভার মোবাইল ধরছে না। মৌলি দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই শুনছ বলতেই কায়সার সাহেব হুমমুড় করে বিছানা থেকে ওঠে পড়ে।

Ñকী হয়েছে? কী হয়েছে? রহিমার অনর্গল বমি করা দেখে দুজনেই ঘাবড়ে যায়।

Ñফুড পয়জনিং হয়েছে নাকি? কায়সার সাহেব জানতে চায়। মৌলি রহিমাকে ওয়াশরুমে একটা প্লাস্টিকের মোড়ায় ধরে বসায়। বমি হচ্ছে না। তবে ওয়াক ওয়াক করছে। মৌলি রহিমার কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলেÑ

Ñকি রে, কোনো সমস্যা? রহিমা নির্বিকার। কোনো উত্তর দেয় না।

Ñএ মাসে তোর শরীর খারাপ হয়েছিল? মৌলির এ কথায়ও কোনো উত্তর দেয় না রহিমা। ততক্ষণে যা বোঝার, তা বোঝা হয়ে যায় মৌলির। স্বামীর মুখের দিকে সন্দেহের তীর ছুড়ে দেয়।

Ñকায়সার সাহেব জানতে চায় কী হয়েছে? মৌলি কোনো উত্তর দেয় না। বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আযাদকে ফোন দাও। মৌনতাকে না হয় আমিই স্কুলে রেখে আসছি। মৌলির মেজাজ বিগড়ে যায়। রহিমার বিষয়টি নিয়ে তাকে ভাবিয়ে তোলে। কায়সার এমন কাজটি করতে পারল! ছিঃ! কায়সারকে তো মৌলি অনেক ভালোবাসে। তাকে তো ভালো বলেই জানে। তবে কি এই মানুষটার ভেতর এত নোংরা, কদর্যে ভরাÑ ভাবতেই মৌলির গা রি রি করে ওঠে। সে আর কায়সারের দিকে ফিরেও তাকায় না। ড্রইং রুমে সোফায় ধপাশ করে বসে পড়ে। মৌলির দুই কান দিয়ে গরম বাতাস বেরুতে থাকে। চোখ দিয়ে নিজের অজান্তেই পানি গড়িয়ে পড়ে। এ সবের কিছুই কায়সার সাহেব টের পায় না। আঁচ করতে পারে না। মৌলি নিরুত্তর দেখে কায়সার নিজেই আযাদকে মোবাইলে কল দেয়। ‘সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না’ শুনতে পেয়ে ক্ষেপে গিয়ে বলেÑ ‘হারামজাদা মোবাইল বন্ধ রেখেছে।’

রহিমা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষীণ কণ্ঠে বলেÑ আযাদ ভাই আর আসবে না। আমি বাড়ি যাব। মায়ের কাছে যাব। রহিমার কথা শুনে মৌলি হুড়মুড় করে সোফা থেকে উঠে পড়ে। ফ্যালফ্যাল করে কায়সার সাহেবের নিষ্পাপ মুখের দিকে চেয়ে থাকে সে। খুব অপরাধী মনে হয়। তবে এসবের কিছুই কায়সার সাহেব টের পায় না। মৌলির তখন রহিমার একটা কথাই কানে বাজতে থাকেÑ আমি বাড়ি যাব, মায়ের কাছে যাব।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে