sara

এক স্বপ্নবান সুলতান

  জাহিদ মুস্তাফা

১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলার আধুনিক চারুশিল্পের শক্তিমান পুরোধা এসএম সুলতান। পূর্ণনাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। বাঙালির গর্ব করার মতো বিরল সুসন্তানদের একজন। গত ১০ অক্টোবর প্রায় নীরবেই চলে গেল তার ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে আমাদের এক পরম আত্মীয় বিয়োগের শোক অনুভব করেছি। প্রজন্মের জন্য কী বার্তা বহন করেÑ গুণীজনদের জন্ম-মৃত্যুদিবসের এমন নীরব প্রস্থান?

এর প্রায় দশ বছর আগে আমি শিল্পী সুলতানের নড়াইলে যাই আমার দুই সহপাঠী ভাস্কর মাহবুব জামাল শামিম ও হিরন্ময় চন্দকে নিয়ে। তারা যশোর চারুপীঠের সংগঠক ও সুলতানের ছাত্র। জ্যৈষ্ঠ মাসের সেই নিদাঘ অপরাহেœ নিজের হাতে আম কেটে পরম যতেœ তিনি আমাদের খাইয়েছিলেন সেদিন। এই স্মৃতি আমাদের অমূল্য সম্পদ। এখনো শ্রদ্ধায় অবনত হই সেই মহানুভবের স্মরণে। বড় মানুষ হয়েও তার ব্যতিক্রমী ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন আজও আমাদের প্রাণিত করে। সুলতানে আমার মুগ্ধতা ১৯৭৬ সালে তার পুনরাবির্ভাবের সময় থেকে। সেবারই দীর্ঘ ২৩ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা সুলতানের একক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায় সুলতানের বিস্তর প্রশস্তি পাঠ করেছি আর তার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে। ১৯৮১ সালে এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর আন্তর্জাতিক সেমিনারে অনর্গল ইংরেজিতে শিল্প নিয়ে অসাধারণ এক বক্তৃতা করেছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কেন তাকে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এ নিয়ে শিল্পীদের বিক্ষোভও হয়েছে।

সুলতানের জন্ম ১৯২২ সালের ১০ আগস্ট চিত্রা নদীবিধৌত নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি লাল মিয়া নামে পরিচিত। সেই ছেলেবেলায় কাঠমিস্ত্রি বাবার কাঠের নকশা দেখে আঁকাজোকায় তার আগ্রহ জন্মে। কয়লা দিয়ে আঁকতে আঁকতে এক সময় নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হলেন। তখন কাগজের ওপর পেন্সিলে আঁকাআঁকি করেছেন। নড়াইলের জমিদারদের ¯েœহের দৃষ্টি পড়ল লাল মিয়ার ওপর। স্কুল শেষে জমিদার বাড়িতেই তার ওঠবস। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৩৮ সালে তার কলকাতা যাত্রা। শিল্পসমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে ১৯৪১ সালে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেন সুলতান। যেন নিজের জায়গাটা ঠিকঠাক পেয়ে গেলেন তিনি। ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক করণকৌশল শেখার সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের সহজাত প্রতিভাকে বিকশিত করায় মনোযোগী হলেন এসএম সুলতান। প্রথম দুবছর ভালো ফলাফলও করলেন। ওল্ডমাস্টারদের কাজ কপি করতেন। পরবর্তীকালে তার চিত্রকর্মে এর প্রভাব আমরা লক্ষ করেছি। তৃতীয় বর্ষে পাঠকালে তার মনে হলোÑ এখান থেকে যা শেখার তা তার শেখা হয়ে গেছে। ১৯৪৪ সালে বেরিয়ে পড়লেন ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সেই সময়ে সৈনিকদের ছবি এঁকে নিজের ভ্রমণ ও আহার খরচ জুটিয়েছেন। নানা প্রান্ত ঘুরে ১৯৪৬ সালে সিমলায় নিজের আঁকা ছবির একটি প্রদর্শনী করেন। এর পর ১৯৪৮ সালে লাহোরে ও ১৯৪৯ সালে করাচিতে তার চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন হয়। ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী উদীয়মান বিদেশি মেধাবী শিল্পীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেলোশিপ প্রোগ্রাম ছিল। ১৯৫০ সালে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক শিক্ষা ইনস্টিটিউট ও পাকিস্তান শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সুলতানকে সেই ফেলোশিপের জন্য মনোনীত করে। সে বছরেই তিনি নিউইয়র্কে যান। এ ফেলোশিপের অধীনে ছিল শিল্পকলায় পাঠ, গুণী শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময়, সৃজনশীল কাজ করাসহ নানা মিউজিয়াম পরিদর্শনের সুযোগ। নিউইয়র্ক ছাড়াও তিনি ওয়াশিংটন ডিসি, বোস্টন যান এবং শিকাগো ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। এর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং লন্ডনের হ্যাম্পস্টিডে ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্ট বাগানের উন্মুক্ত স্থানে আয়োজিত বার্ষিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। পাবলো পিকাসোসহ সে সময়ের পৃথিবীশ্রেষ্ঠ শিল্পীরা এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলেন।

এর পর করাচিতে এসে শিল্পী আবদুর রহমান চুঘতাই ও শাকির আলীর সাহচর্য পান এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে শিল্পসমালোচক এস আমজাদ আলী পাকিস্তান কোয়াটার্লিতে লিখেনÑ সুলতান একজন ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টার। তাতে মানুষ আসেন অনুষঙ্গ হয়ে। অনেক পরে আমরা দেখিÑ সুলতানের চিত্রপটে মানুষ প্রধান আর প্রকৃতি এসেছে পরিবেশ সৃজনের লক্ষ্যে।

১৯৫৩ সালে সুলতান ঢাকা হয়ে নড়াইলে ফিরে আসেন। এর পর দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি বাউলশিল্পী ও যাত্রাদলের সঙ্গে বোহেমিয় জীবন কাটিয়েছেন। কুকুর-বিড়াল, পাখ-পাখালি, এমনকি সাপ-বেজি নিয়ে একভিটায় বসবাস করেছেন। ১৯৬৯ সালে খুলনা ক্লাবে তার আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে একটি একক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন হয়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নেন।

১৯৭৬ সালে এসএম সুলতানের শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পে এবং জাতীয় জীবনে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন নিভৃতচারী এ শিল্পী। সুলতানকে নতুন করে আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে লেখক দার্শনিক আহমদ ছফার ভূমিকা আমি আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

এ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুধু শিল্পী নয়, এক দার্শনিক সুলতানের সন্ধান পাই আমরা। হাজার বছরের খেটে খাওয়া বাংলার কৃষকের ভেঙে পড়া রুগ্ন চেহারার বদলে তার চিত্রপটে পেশিবহুল এ কোন শক্তিমান কৃষক! সুলতান বললেনÑ যারা শ্রম দেয়, ফসল ফলায় তারা ক্ষয়িষ্ণু ও ভগ্নস্বাস্থ্যের হতে পারে না। তারা তুমুল শক্তিমান। তাদের শ্রমে-ঘামেই আমাদের মুখে অন্ন জোটে। নিজের আঁকায় তাদের অন্তর্শক্তির প্রকাশ ঘটেছে পেশির বাহুল্যে।

সুলতানের শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির শিরোনামÑ প্রথম বৃক্ষরোপণ (১৯৭৫), চরদখল (১৯৭৬), চাষাবাদ (১৯৮৬) ও মাছধরা (১৯৯১) ইত্যাদি। প্রথম বৃক্ষরোপণের শক্তিমান কৃষক যেন আদম। বৃক্ষরোপণের মাহেন্দ্রক্ষণে তার কাছে শুভকামনা নিয়ে ছুটে এসেছে দেবীরা। ওল্ডমাস্টারদের কাজের সঙ্গে তুলনীয় অসাধারণ এক চিত্রকর্ম। চরদখল মানুষে মানুষে যুদ্ধ-হানাহানির চিত্রকল্পময় এক অনন্য সৃজন। শিল্পী এটিকে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরেছেন। চাষাবাদ ও মাছধরায় বাংলার কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়ের শ্রমজীবনের ছবি প্রতিফলিত হয়েছে। সুলতানের চিত্রপটের নারীরাও দীঘল ও পেশিবহুল। কিন্তু কী আশ্চর্যÑ তাতে নারীদের কমনীয়তা যথাযথভাবে বিদ্যমান! নিজের দেশ, মাটি, মানুষ, প্রকৃতিকে অনেক বড় করে দেখতেন। দেশি উপকরণ ও পিগমেন্ট ব্যবহার করে তিনি রঙ তৈরি করতেন এবং এ বিষয়ে তার ছাত্রছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করতেন।

ব্যক্তিগত জীবনে এসএম সুলতান ছিলেন নিতান্ত শান্তিপ্রিয়, শিশুবৎসল অকৃতদার একজন মহান মানুষ। শিশুদের মননশীলতা গড়ে তোলার জন্য চিত্রকলা বিদ্যাচর্চার সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন তিনি। শিশুদের নিয়ে নদী ও সমুদ্রভ্রমণের আগ্রহে শিশুস্বর্গ নামে বড় একটি নৌকা তৈরি করেছিলেন তিনি। একবার ভ্রমণের উদ্দেশে যাত্রারম্ভ করেও ফিরে আসতে হয়েছে নৌকার নির্মাণত্রুটির জন্য। বাংলার মেহনতি মানুষের এই গুণী চিত্রকরের মৃত্যু হয়েছে ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর। কিন্তু যে স্বপ্নবীজ তিনি রোপণ করে গিয়েছেন এ দেশের চারুশিল্পাঙ্গনে তা আজ অনেকটাই পল্লবিত।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে