মনোগ্রাহী জীবনদর্শনের কবিতাস্বাদ

  কে জি মোস্তফা

১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সময়ে আমাদের সাহিত্য ভুবনে যে ক’জন কবি স্বমহিমায় উজ্জ্বল, হাসান হাফিজ তাদেরই একজন। অবশ্য সংকলন ও নিবন্ধজাতীয় অনেকগুলো গদ্যগ্রন্থও তার রয়েছে। সব মিলিয়ে তার গ্রন্থসংখ্যা দুইশ’র কাছাকাছি। তবে তার নিবিড় আত্মীয়তা মূলত কবিতার সঙ্গে।

দীর্ঘকাল আমি সাহিত্য সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছি। সেই কবেকার কথা, ডিএফপি থেকে প্রকাশিত নবারুণ, পূর্বাচল, বাংলাদেশ সংবাদ, সচিত্র বাংলাদেশ। পরবর্তীকালে ‘সাহিত্য বাংলাদেশ’ ও জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে প্রকাশিত ‘কবিতাপত্র’। সব ক’টিতেই হাসান হাফিজ নিয়মিত লিখতেন। প্রথম প্রথম টুকটাক কিছু সম্পাদনা করতে হলেও পরবর্তীকালে তার লেখায় হাত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন হতো না। সাহিত্য তথা কবিতা নিয়ে এমন নিরলস চর্চা দুর্লভ।

হাসান হাফিজের কবিতায় ভাষার দুর্বোধ্যতা নেই, আছে গভীর আবেগ ও উপলব্ধি। শব্দপ্রয়োগ ও ছন্দ সম্পর্কে সদা সচেতন কবি। এমনকি যতিচিহ্ন ব্যবহারেও। সাহিত্য তথা কবিতাচর্চায় হাসান হাফিজ এখন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তার কবিমন ও কাব্যশিল্পে পাঠক পাবেন বিচিত্র অনুভূতি ও উপলব্ধির ফল্গুস্রোত।

বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ যে কবিতা, তারই পরিচয় মেলে আজকের কবিদের লেখায়। তারা জীবনকে ধরেছেন নানা আঙ্গিকে। জীবনের নানা নিবিড় সূক্ষ্ম অনুভূতির ব্যঞ্জনা ফিরে ফিরে আসে তাদের লেখায়। ঋদ্ধ ও সুলিখিত কবিতায় মেলে কবিত্বশক্তির পরিচয়। কারো কারো কবিতা হয়ে ওঠে দর্পণ। চিন্তা-চেতনায়, তত্ত্ব ও জীবনদর্শনে মনোগ্রাহী।

বর্তমান সময়ের একজন বিশিষ্ট কবি হাসান হাফিজ। তার সাম্প্রতিক একটি কাব্যগ্রন্থের নাম ‘বল ভরসা দাও রে দয়াল’। এ যাবৎ ৪৮টি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি ভাষায়, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি ভঙ্গিতে কবিতা লেখেন হাসান। চিৎকার ও অতিকথনের প্রহারে ক্লিষ্ট, শুষ্ক বাংলা কবিতার শরীরে তিনি সঞ্চার করেন মিতকথনের স্নিগ্ধ শুশ্রƒষা। বুলিয়ে দেন মায়াবী প্রলেপ। একান্ত নিভৃতিতে স্বগত কথনের মতো তার হার্দ্য উচ্চারণ। সংযতবাক এই কবির রচনার একটি নমুনা এ রকম :

ছোট ছোট দুঃখঢেউ

ছোট ছোট আনন্দ-মুকুল

বড়ো এক জীবনের

কথা কয়ে ওঠে।

মানুষের শ্রবণে তা

কেন যে পশে না

মানুষেরা হতভাগ্য

মানুষেরা

পাত্র করুণার...

(করুণারই যোগ্য পৃ. ২২)

‘বল ভরসা দাও রে দয়াল’ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে যেমন প্রেম ও প্রেমহীনতার প্রচ্ছন্ন আভাস আছে, তেমনি আছে অন্তরের ভাবনা। আছে সূক্ষ্ম রোমান্টিকতার ছোঁয়া। পরতে পরতে মিশে আছে জীবন আর অনিশ্চয়তার দোলাচল। কল্পনা, চিত্রকল্প, আবেগ, মননশীলতা, স্বপ্ন ও দ্বন্দ্বের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। দৈনন্দিন জীবন, সমাজ-পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক ঘাতপ্রতিঘাতের দোলাচলে কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে বাক্সময়। তীক্ষè সমাজমনস্কতা, মানুষের প্রতি-প্রকৃতির প্রতি গভীর নিবিড় দায়বোধ তার কবিতাকে অন্যরকম উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করে সহজেই। নদী হত্যা নানান প্রকার কবিতায় তিনি বলছেন,

মানুষ দেখে না, তার চোখ নেই বলে

নদী হচ্ছে মাতৃসমা, প্রকৃতির সলজ্জ দুহিতা

নদী হচ্ছে ভাঙনসৃজনপ্রিয় বন্ধ্যত্ব বাসে না ভালো

বালিয়াড়ি চড়া তার মোটেও পছন্দ নয়

কিন্তু মূর্খ মানুষেরা নদী হত্যা করতে খুবই পারঙ্গম

ধ্বংসের প্রকল্প নেয় বড় ছোট নানান প্রকার

নদীশাসনের নামে গলা টিপে কীর্তির বড়াই করা

তাদের অহেতু গর্ব, যা সমস্ত

একমাত্র মূর্খদেরই রক্তে মাংসে স্বভাবে রয়েছে

(নদী হত্যা নানান প্রকার পৃ. ৬৭)

হাসান হাফিজ জীবনের গভীরতাকে ধরেছেন নিজের মতো করে। শাশ্বত সত্যকে তিনি যেমন উপলব্ধি করেছেন, তেমনি শামিল হয়েছেন জীবনকে উপভোগ করার আনন্দে। খুব সরল ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে তার জীবনবোধ। অভিজ্ঞতার আলো থেকে কবির যাত্রা যেন ক্রমশ এক শুদ্ধচারিতার দিকেÑ সমসাময়িকদের মধ্যে যার তুলনা ব্যতিক্রমী।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার কবিতায় স্বপ্নিল ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। আমাদের জাতীয় জীবনে সে ছিল এক আশ্চর্য উদ্ধার, মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় যা স্বচ্ছন্দ সাবলীলতায় মূর্ত, লালসবুজের মহতী মিশ্রণে উদ্ভাসিত। হাসান হাফিজ তার একটি কবিতার বুনন এভাবে উৎকীর্ণ করেন গাঢ় গভীর অনুভবের দ্যুতিতে, হৃদয়ের নিভৃত প্রদেশের উৎসারণেÑ

একাত্তর তুমি জ্বলো দুরন্ত স্পর্ধায়

তুমি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান

অমৃতসমান তুমি প্রিয় স্বাধীনতা

তুমি নদী, রক্তের পবিত্র ধারা

তুমি শান্তি একই সঙ্গে

বিক্ষোভেরও অনন্ত বারুদ

(রক্তনদী একাত্তর পৃ. ২১)

‘বল ভরসা দাও রে দয়াল’ কাব্যগ্রন্থে ব্যঞ্জনার গূঢ়তার পাশাপাশি হাসান হাফিজ সমান মনোযোগী ছন্দের চারুতাতে। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্তের চেনা চেহারায় অনায়াসে তিনি সঞ্চার করেন অচেনা বিন্যাস। সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী হয়েও ভোলেন না অক্ষরের কেয়ারিতে গোলাপের পেলবতার কথা।

কবিতা যে শেষ পর্যন্ত ছন্দ আর শব্দ নয়, তাকে উত্তীর্ণ হতে হয় এক অধরা রসের জগতে, অভিজ্ঞতায় প্রাজ্ঞ কবি হাসান হাফিজ প্রথমাবধি সে বিষয়ে সচেতন। ‘বল ভরসা দাও রে দয়াল’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই সুচারু নির্মাণ। প্রতিটি কবিতায় তিনি জীবনের মর্ম ও অভিঘাতকে ছুঁয়ে গেছেন, ব্যক্ত করেছেন আশ্চর্য দক্ষতায়, শৈল্পিক নৈপুণ্যে। লোকজ সংস্কৃতিকে তিনি ধারণ করেন মেদুর মমতা ও ভালোবাসায়। আধুনিকতার মিশেলে তাকে নতুন মাত্রায় নির্মিতি দেনÑ

ভালোবাইসা দিয়াছিলে বিষ।

কবি তা অমৃত ভাইবা

পান কইরা ফ্যালে।

ইশকে মজলে এ রকমই হয় গো

এ রকমই হয়।

মনের তাকত জোশ প্রচ- কবির।

সে কারণে মরে নাই। কিচ্ছু হয় নাই।

বিষ উল্টা মধু হইয়া

উহার উদরে প্রবেশ কইরা

সার্থক হইয়াছে।

চিরকাল বিষই দিয়ো ‘লুম্পেন’ কবিরে

ভালোবাসা ভুলেও দিয়ো না।

দিলেই অনর্থ হইবে, ছারেখার সবকিছু...

এতটা আনন্দ ফুর্তি পাইলে আচানক

ধারণ করার মতো শক্তি ও ক্ষমতা

হাভাতে কবির কিন্তু কিছুতেই নাই

(বিষ হইল মধু পৃ. ৪৭)

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে