মনে পড়ে

মূল : গাব্রিয়েলা জারমান্দি

  অনুবাদ : ফজল হাসান

১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইথিওপিয়ান বংশোদ্ভূত ইতালিয়ান নারী লেখক গাব্রিয়েলা জারমান্দির জন্ম আদ্দিস আবাবায়, ১৯৬৫ সালে। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং নাট্যশিল্পী। তার বাবা ছিলেন ইতালিয়ান এবং মা ছিলেন ইথিওপিয়ান। বাবার মৃত্যুর এক বছর পর মায়ের সঙ্গে তিনি ইতালির বোল্যোনিয়া শহরে গমন করেন। ১৯৯৯ সালে ইতালির অভিবাসী লেখকদের মধ্যে মৌলিক ছোটগল্প লেখা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি একই ছোটগল্প লেখা প্রতিযোগিতায় দুবার (২০০১ এবং ২০০৩) তৃতীয় স্থান দখল করেন। তার গল্প ইতালির বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সংকলন এবং ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। ইতালি ভাষায় তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে, যার ইংরেজি অনুবাদ (‘কুইন অব ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড পার্লস্’) প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। এই উপন্যাসে তিনি ১৯৩৬ সালে ইথিওপিয়ার ইতালির আগ্রাসন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে মেনজিসতুর কমিউনিউস্ট একনায়কতন্ত্র পর্যন্ত সময়ের রূঢ় চিত্র তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিপীড়িত মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্রের করুণ কাহিনিও উঠে এসেছে পাঠকপ্রিয় এই উপন্যাসে। তিনি ইতালিয়ান ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন ম্যাগাজিন ‘এল জিবলি’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বর্তমানে তিনি বোল্যোনিয়াতে বসবাস করেন।

গল্পসূত্র : ‘মনে পড়ে’ গল্পটি গাব্রিয়েলা জারমান্দির ‘আই রিমেম্বার’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি ইতালিয়ান ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ভিক্তোরিয়া অফরেদি পলেতো। ইংরেজিতে গল্পটি ‘ওয়ার্ডস্ উইথআউট বর্ডাস্র্’ ম্যাগাজিনের ২০১২ সালের অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে

বর্ষা ঋতুতে গ্রীষ্মকালের ঘূর্ণিঝড়ের কথা আমার মনে পড়ে। সেসব ঘূর্ণিঝড়ের সময় তা-ব বাতাসের তোড়ে জানালার পাল্লা খুলে যেত এবং মেঝেতে এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা জিনিসপত্র ঘরের ভেতর বৃত্তাকারে ঘুরত। এ ছাড়া ময়লা আকাশের গায়ে বিদ্যুৎ চমকাত এবং প্রচ- শব্দে বজ্রপাত হতো। মনে হতো যেন রাগে-গোস্বায় তামাম দুনিয়াটাই আর্তনাদ করছেÑ সেখানে, ঠিক সেই জায়গায়।

বিদ্যুৎ চমকানো এবং বজ্রপাতের মধ্যবর্তী সময়ের কথা আমার মনে পড়ে। তখন বৃদ্ধা হেইমানট্ বসার ঘরের টেবিলের নিচে ভয়ে জড়সড় হয়ে লুকিয়ে থাকত এবং খানিকক্ষণ থেমে চিৎকার করত, ‘হায় ঈশ্বর, আমাদের ওপর দুর্যোগ নেমে আসছে।’ এ ছাড়া আসমারায় সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে সে যেসব প্রার্থনা শিখেছিল, বজ্রপাতের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তাই আওড়াত, ‘ঊর্ধ্বে! মেরীর নামের মতো ঊর্ধ্বে থাকো।’

আমার মনে পড়ে, প্রধান ফটক দিয়ে গাড়ি ঢুকত। তখন দেখতাম আমাদের অবাক করে দিয়ে তুমুল বৃষ্টির পানিতে উঠান ভরে যেত। মনে হতো আকাশ থেকে যেন হ্রদের সব পানি নিচে নেমে এসেছে। প্রচ- বাতাসের ঝাপটায় উইলো এবং ইউক্যালিপটাস গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ত। একবার বুড়ো দেবদারু গাছটি ভয়ানকভাবে নুইয়ে পড়েছিল রান্নাঘরের চালের ওপর। প্রতিবারই আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করেছি, গাছটি আদৌ ভেঙে পড়বে কিনা। সেই সময় তুমিসহ আমরা সবাই ছিলাম। মাউরো এবং আমি গ্যারেজের ভেতর অস্থায়ী ঘরের মধ্যে রাত্রি যাপন করতাম। তখন পুরো গ্যারেজ গরম রাখার জন্য গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকত। ইতালিতে কাটানো তোমার শৈশবের গল্প তুমি আমাদের শোনাতে এবং বৃষ্টি হলেই তুমি ক্রেভালকোর কথা বলতে। শরতের নীলাকাশ, রনচির প্রাসাদ এবং তোমার সেই পোষা কৃষ্ণ পক্ষীর গল্প বলতে। তুমি বলেছিলে, পাখিটি ইতালির জাতীয় সংগীত গাইতে পারত। তার পর এক সময় বৃষ্টি থেমে যেত, ঝড় সরে যেত দূরে এবং যাওয়ার সময় আমাদের মাঝে তার উপস্থিতির চিহ্ন রেখে যেত। হালকা মেজাজে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ত। তুমি বলতে, ‘ইতালিতে তিন দিন ধরে এমন একটানা বৃষ্টি হতো।’ তখন আমি অবিশ্বাসী মন নিয়ে তোমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। আমি ভাবতে পারতাম না যে, এমন জায়গাও আছে যেখানে তিন দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হয়।

তার পর এক সময় আমি তোমাকে তোমার মাতৃভূমিতে দেখেছি। তখন তোমার উপস্থিতি এবং কোথাও আমার শেকড় প্রোথিত আছে কিনা, তা আমি অনুসন্ধান করেছি। হ্যাঁ, আমি দেখেছি। কিন্তু শেকড়ে ফিরে যাওয়ার আকুলতা আমার আত্মাকে দুঃখ এবং নস্টালজিয়ায় পরিপূর্ণ করেছিল।

আমার মনে পড়ে, একবার যখন ঝড়-তুফান থেমে গিয়েছিল, তখন সম্ভাব্য দুর্গতি থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য আবেবা ও লেমলেম তোয়ালে এবং ছাতা নিয়ে ছুটে এসেছিল, যা মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। তুমি বলতে, ‘বই-পুস্তক রাখো।’ আমরা কর্দমাক্ত পা ধোয়ার জন্য ঘরের ভেতর দৌড়ে যেতাম। তার পর এনটোটো পাহাড় থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি দিয়ে পা ধুতাম। ভেজা বইপত্র ঝেড়ে বৃষ্টির পানি ঝড়াতাম এবং চারদিকে পানির ফোঁটা জমত। এক সময় বৃদ্ধা হেইমানট্ টেবিলের নিচ থেকে বেরিয়ে আসত এবং আমরা প্রজ্বলিত আগুনের সামনে বসে থাকতাম। তখন আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে রাখতাম এবং হাসতাম।

প্রিয় বাবা, আজ এক বিশেষ দিন, অন্যরকম দিন, স্মরণ করার দিন। আমি এই দিনটি তোমাকে, যে তুমি আমার জন্মভূমিতে চিরশায়িত, উৎসর্গ করতে চাই। বুকের ভেতর একরাশ দুঃখ নিয়ে তোমার চারপাশে ভবঘুরের মতো আমি একা ঘুরছি।

সেদিন তোমার পুরনো চিঠির ঝাঁপি খুলে বসেছিলাম। সেখানে আঙ্কেল ফিওরের কাছে লেখা তোমার চিঠি ছিল। তোমার মৃত্যুর পর আঙ্কেল ফিওর তোমার লেখা সব চিঠি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তোমার স্বাক্ষর করা একটা চিঠি আমি খুঁজছিলাম। তোমার সেই স্বাক্ষর, যা শৈশবে আমি খুবই পছন্দ করতাম। সেই স্বাক্ষর ছিল ইংরেজিতে ‘জি’, সেই ‘এইচ’, দেখে মনে হতো কোনো নর্তকী যেন শূন্যে দুহাত মেলে ধরেছে, এবং সেই ‘এম’, যা নিচের দিকে গড়িয়ে পড়া পানির ধারার মতো ছিল। বিশেষ ধরনের সেই স্বাক্ষর ছিল শুধু তোমারই। চিঠিগুলোর লেখা অস্পষ্ট হয়ে গেছে এবং সেগুলোতে লেখার চেয়ে আঁকাই ছিল বেশি।

আমার মনে পড়ে, শিশু বয়সে আমি যখন বন্ধুদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করতাম, তখন কেন জানি টেলিফোনের পাশে রাখা সাদা কাগজের ওপর তোমার স্বাক্ষর অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। তুমি জানতে, একদিন আমি তোমার স্বাক্ষর নকল করতে পারব এবং তোমার মতোই হবো। তোমার বাহু পুরো ইথিওপিয়ার জমিনজুড়ে বিস্তৃত, যেন আমার প্রিয় শহর আদ্দিস আবাবার রাস্তার নর্দমায় গড়গড় করে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ার মৃদু শব্দের মতো মোহনীয়।

প্রিয় বাবা, তোমার স্বাক্ষরের পাশে আমি স্বাক্ষর করেছি। তার পর আমি সযতেœ চিঠি ভাঁজ করি এবং পুনরায় ড্রয়ারের ভেতর ঢুকিয়ে রাখি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে