হু মা য়ূ ন আ হ মে দ

বাংলা কথাসাহিত্যের কারিগর

  রাকিবুল রকি

০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালি বইবিমুখ। এ নিয়ে অনেক বাঙালি লেখকেরই খেদ আছে। সৈয়দ মুজতবা আলী তো ‘বইকেনা’ প্রবন্ধে খোঁচা দিয়েই বলেছেন, বাঙালি একটা বই-ই বাড়িতে রাখা যথেষ্ট মনে করেন। আরব্যোপন্যাসের গল্পে আছে, এক হেকিমের বিষ মাখানো বই পড়তে গিয়ে রাজার মৃত্যু হয়েছিল। প্রবন্ধের শেষে সৈয়দ সাহেব এই গল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘বাঙালির বই কেনার প্রতি বৈরাগ্য দেখে মনে হয়, সে যেন গল্পটা জানে, আর মরার ভয়ে বইকেনা, বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে।’

বাঙালি বই পড়ে না, বই কেনে না এই অভিযোগ এখনো আছে। অথচ প্রতি বছর অমর একুশে বইমেলার বিক্রিবাট্টা কিন্তু তার বিপরীত চিত্রই আমাদের তুলে ধরে। প্রতি বছরই পূর্ববর্তী বছরের বিক্রি রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। এই যে পাঠকের বই কেনার প্রতি এত আগ্রহ। এই পাঠক তৈরিতে যার অবদান সর্বাগ্রে, তিনি হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। বিগত কয়েক দশক বাঙালি পাঠক মজে ছিল তার লেখার জাদুতে। হুমায়ূন আহমেদের যে কোনো বই একবার পড়া শুরু করলে, তা না শেষ করে ওঠা কঠিন। এবং এ কথা হুমায়ূন আহমেদের কোনো নিন্দুকও অস্বীকার করবে না। যদিও বিপুল পরিমাণ পাঠক তৈরি করা, বইয়ের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা সত্ত্বেও অনেকে হুমায়ূন আহমেদকে অস্বীকার করতে চান। তাদের প্রধান যুক্তি, হুমায়ূন আহমেদের লেখা কালের স্রোতে হারিয়ে যাবে, এর মধ্যে সারবস্তু বলতে কিছু নেই বলে। অপ্রধান যুক্তি, তিনি শুধু নিজের পাঠক তৈরি করেছেন। তার লেখা শুধু মধ্যবিত্তের কড়চা। তার লেখায় সময় অনুপস্থিত। লেখাগুলো অগভীর। আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদের লেখাকে চানাচুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। চানাচুর খেতে মজা কিন্তু পেট ভরে না। যদিও হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখির শুরুর সময়ে আহমেদ ছফা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, কেননা আহমদ ছফা তখন মনে করতেন, তিনি চেখভের মতো বড় লেখক হবেন।

অনেকে হুমায়ূন আহমেদের প্রতিভাকে স্বীকার করে নিয়ে দীর্ঘশ^াস ছাড়তে ছাড়তে বলেন, তিনি (হুমায়ূন) যথাযথভাবে তার প্রতিভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। কেউ কেউ তার উপন্যাস সম্পর্কে বলেন, এগুলো উপন্যাস নয়, বড় গল্প। কেউ বলেন, তার লেখাগুলো ফর্মা মেপে লেখা। এ ছাড়া আরও অনেকে অনেক যুক্তি দেখান হুমায়ূন আহমেদকে খারিজ করার জন্য।

তাকে অস্বীকার করার পেছনে যে যে যুক্তির কথা বলা হলো তার একটা সমুচিত জবাব হলো পাঠক। অর্থাৎ যে যা-ই বলুক পাঠক তার লেখাকে গ্রহণ করেছেন। তার মৃত্যুর পর ইতোমধ্যে ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তার বইয়ের বিক্রির খুব একটা হেরফের হয়নি। বরং হুজুগ মিলিয়ে যাওয়ার ফলে তার প্রকৃত লেখাগুলো আরও আলোকিত হয়ে উঠছে। পাঠকের হৃদয়ে তার গল্প, চিন্তা, দর্শন আরও বেশি ঠাঁই করে নিচ্ছে। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে থাকা তার বিভিন্ন লেখা থেকে উদ্ধৃতিগুলোই এর উজ্জ্বল উদাহরণ। যুক্তির পিঠে যেহেতু পাল্টা যুক্তি থাকে, তাই আরও কয়েকটি কথা বলব। হুমায়ূন আহমেদ শুধু নিজের পাঠক তৈরি করেছেন, এ অভিযোগ তুলে যারা বাংলা সাহিত্যের পাঠক শূন্যতার জন্য (তাদের মতে) নাকি কান্না কাঁদেন, তারা মূলত অপরিপক্ব মানসিকতার লোক, যাদের পাঠক বয়কট করা দূরে থাকুক, কখনো স্বীকার করেননি। কারণ হুমায়ূন আহমেদ একজন লেখক। সেই হিসেবে তিনি নিজের পাঠক তৈরি করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া এটা মনে হয় না এমন কোনো লেখক আছেন যিনি চান তার লেখা পড়ে মানুষ অন্য কারও পাঠক হোক। দ্বিতীয় কথা এ অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য নয়। হুমায়ূন আহমেদের পাঠক জানেন, কেউ যদি প্রথমেও হুমায়ূন আহমেদ দিয়ে পাঠ শুরু করে, সেও কিছুদিন পর হুমায়ূন আহমেদের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, বিভূতি, তারাশঙ্কর, মানিক, জীবনানন্দসহ দেশ-বিদেশের অনেক লেখকের লেখার প্রতিই আগ্রহী হয়ে উঠবে। কারণ হুমায়ূন তার প্রিয় লেখকদের প্রতি দুর্বলতার কথা কখনো গোপন করেননি লেখায়। আর হুমায়ূন আহমেদ খুব সহজেই তার নিজের ভালো লাগাকে অন্যের মাঝে সঞ্চারিত করতে পারেন। তাই মানুষজন তার লেখা পড়ে তার সৃষ্ট চরিত্রের মতো হতে চায়।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস বা গল্পের পাত্র-পাত্রী বা চরিত্র কারা? কোন পেশার? কোন শ্রেণির? শুধুই কি মধ্যবিত্তকে নিয়ে গড়ে উঠেছে তার কথাসাহিত্য? একজন লেখক তার দেখা আশপাশের চরিত্রগুলোকে লেখার উপজীব্য করে তোলেন। কেননা জীবনের সঙ্গে জীবন যোগ না হলে ব্যর্থ হয় সে সৃষ্টি। হুমায়ূন আহমেদ একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ হিসেবে মধ্যবিত্তকে যতটা কাছ থেকে দেখেছেন, যতটা ভালোভাবে বুঝেছেন, সে হিসেবে মধ্যবিত্তর কথা উঠে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার বিপুল সাহিত্য ভা-ারকে শুধু মধ্যবিত্তের কড়চা বললে সত্যের অপলাপ করা হবে। মনা ডাকাত, মাজেদা খালা, শুভ্র এরা কি মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির? না, মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি? হুমায়ূন সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এদের কি বাদ দেওয়া চলে? অবশ্য যারা ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ে হাঁড়ির দুটো ভাত টিপে সব ভাতের অবস্থা বুঝে ফেলার মতো হুমায়ূন আহমেদের সমগ্র সাহিত্য সম্পর্কে মতামত দিয়ে দেন, তাদের কথা আলাদা।

হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন প্রচুর। নিজের তাগিদে, পাঠকের তাগিদে, প্রকাশকের তাগিদে। সেখানে সবগুলোই মানোত্তীর্ণ, কালোত্তীর্ণÑ এ কথা কেউ-ই বলে না। আর বললেও তা বিশ^াসযোগ্য হবে না। বেশি লেখার জন্য অনেক লেখাই অগভীর, হালকা হতে বাধ্য হয়েছে। তাই বলে ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘কবি’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’, ‘বাদশা নামদার’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসগুলোকে হালকা, চটুল, অগভীর বলার কোনো অবকাশ নেই, অবকাশ নেই উপন্যাসগুলোর আবেদন অস্বীকার করার। তা ছাড়া কম লিখলে সেসব লেখা মাস্টারপিস হবে তার গ্যারান্টি কোথায়? হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্যের এক জাদুকর। গল্পের জাদু দিয়ে আচ্ছন্ন করে রাখেন পাঠককে। তাই পাঠক হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রের মাঝে নিজেকে খুঁজে পান। হিমু, মিসির আলী, রূপার জায়গায় ভাবেন নিজেকে। পাঠক যেমন তার গদ্য ঘোর কাটাতে পারেন না, তেমনি অনেক নতুন লেখক প্রভাবিত হন হুমায়ূনী গদ্য দ্বারা। তারা হুমায়ূন আহমেদের মতো গদ্য লেখতে চান। হুমায়ূন আহমেদের মতো গল্প বলতে চান। সাহিত্যের জন্য বিষয়টি সুখের না হলেও তা হুমায়ূন আহমেদের শক্তিমত্তার পরিচায়ক। তিনি নিঃসন্দেহে শক্তিশালী কথাশিল্পী, এজন্য তার আগেও অনেক মহৎ ঔপন্যাসিক জ্যোৎস্নার অসামান্য রূপ বর্ণনা করলেও আজকের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী হুমায়ূন আহমেদের চোখে জ্যোৎস্না দেখেন, বৃষ্টি বিলাস করেন।

তারপরেও যারা বলে হুমায়ূন আহমেদের লেখা কালের স্রোতে হারিয়ে যাবে, তাদের উদ্দেশে দুটো কথা বলে লেখা শেষ করব। আমরা সবাই জানি, জগতের কোনো কিছুই স্থির নয়, যশ, সম্মান, টাকা-পয়সা, কিছুই নয়। তেমনি শেষ কথা বলেও কিছু নেই। তাই কে কালের সাগর পাড়ি দেবে, কার সলিল সমাধি হবে, কাল-ই তার ভার নিক। আমরা শুধু বলতে চাই, একদিন রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসকে অনেক সমালোচক বিদ্যাবুদ্ধির কষ্টিপাথরে ঘষে বলেছিলাম, এ লেখা টিকবে না। কিন্তু এখনো বাঙালির ঘরে ঘরে ‘নৌকাডুবি’ সমাদৃত। তারপরও কার ধান সোনার তরীতে যাবে, কার ধান যাবে না, সে ভার সময়ের হাতে ন্যস্ত করে আরেকটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করি। একজন লেখক কী চান? প্রথম চাওয়া নিশ্চয় মানুষ তার লেখা পড়–ক। প্রশংসার বদলে নিন্দা জুটুক, তবুও লেখাগুলো পঠিত হোক। মানুষ তার লেখা পড়ছে, লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় কোনো তৃপ্তি থাকতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদ সে ভাগ্যবানদের একজন, যিনি তার সব লেখা সমকালের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন, পড়াতে পেরেছেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে