দেশে-প্রবাসে শুভ তেরো

  দিলরুবা আহমেদ

০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম যখন টেক্সাসে এলাম সেই ২০০১ সালের দিকে, ১৬-১৭ বছর আগেকার কথা, তখন অচেনা এই আমেরিকার পথ-ঘাট চিনে ঘুরে বেড়ানো বা কোনো অবসরে কোথাও কোনো আনন্দসাগরে ডুব দেওয়ার মতোই ছিল হঠাৎ পাওয়া ভিনদেশে বাংলা ভাষায় লেখা একটি বাংলা বই যেন। সেটাই পেলাম এক অ্যাপার্টমেন্টে। পাশের এক অ্যাপার্টমেন্টে স্বদেশীর বাসায় দেখলাম অল্প স্বল্প কয়টি গল্পের বই। তার মধ্যে একটি সর্বজন শ্রদ্ধেয় হুমায়ূন আহমেদের। সেটিই পড়ার জন্য সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। বইটির নাম আজ আর মনে নেই। তবে এখন নিজেকেই ভাবাই এই ভেবে, কেন ওনার লেখা বইটিই পছন্দ করলাম?

প্রিয় লেখক তাই! প্রিয় লেখক তো আরও অনেকেই আছেন। তার মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের বইটি পছন্দ কেন করলাম? সম্ভবত ওনার লেখার আমেজ, আবেগ, গতি-প্রকৃতি খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে এবং নীরবে, মনন আর মস্তিষ্কের অলিতে-গলিতে ঢুকে যায়। ঘুরে-ফিরে আসে নিরবধি এবং এই করাটা এতটুকুও বেশি অধিকার আর মনোযোগ দাবি না করেই করে। যেখানে প্রবাসীর জীবন মানেই সীমাহীন ব্যতিব্যস্ততার বাস্তবতা। আর তাতে ক্রমেই পরাস্ত হচ্ছে সুকুমার বিনোদনের শুভ ইচ্ছেগুলো; সেখানে হুমায়ূন আহমেদের লেখায় পাচ্ছি বই পড়ার আনন্দটুকু। অথচ সেই সঙ্গে আমার নিজের জগৎ-সংসারও থাকছে অখ- মনোযোগে। ডুবে যাচ্ছি ওনার বইয়ের পাতায়, অক্ষরে, বাঁধা পড়ছি হুমায়ূন আহমেদের অসাধারণ চরিত্রগুলোর সঙ্গে। অথচ কী সমান্তরালভাবেই না থাকছি, থাকতে পারছি এই কঠিন ভুবনে। চোখ তুললেই যেন দেখতে পাব জরি-পরী-রূপাদের। আমাদের চারদিকেই যেন তারা আছে, থাকছে। সেই সঙ্গে আমার জগৎও পাশে দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। খুব কষ্টের কোনো দৃশ্য লেখেন বা আঁকেন এমনভাবে, যা খুব সহজেই গড়গড়িয়ে পড়ে আমরা চলে যাই। অথচ চোখটা ভরে ওঠে জলে। দুটো বাক্যেই যেমন কাঁদিয়ে দিতে পারেন, ঠিক তেমনি তিনটি শব্দেই আবার হাসিয়েও দিতে পারেন। এ এক অসাধারণ সম্মোহনী প্রতিভা। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে আসার সময় প্রতিটি মানুষই একটি করে আলাদিনের প্রদীপ নিয়ে আসে কিন্তু খুব কম মানুষই সেই প্রদীপ থেকে ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগাতে পারে।’ পেরেছিলেন তিনি নিজেই তা করতে। আর তাই কী গল্পে, কী উপন্যাসে, কী গানে বা ছবি আঁকায়, নাটকে কিংবা চলচ্চিত্র তৈরিতে, সবখানেই তিনি অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে বেড়িয়েছেন। কবি হিসেবে পরিচিতি উনি হয়তোবা চাননি। তবে ‘কে কথা কয়’ বা ‘কবি’ উপন্যাসে বেশ কিছু কবিতা উনি উপহার দিয়েছেন। দেখা গেছে, হুমায়ূন আহমেদের প্রাদপ্রদীপের চেরাগের আলোয় যে বা যারাই এসেছেন, তারাও আলোকিত ও পরিচিত হয়ে উঠেছেন। হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের সব সদস্যের নাম সবাই কমবেশি জানেন। আগ্রহ নিয়েই মানুষ খবর নেন বা নিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে থাকা সবার। তিনি নিজেই যেন একটি প্রতিষ্ঠান। হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে যেন এক সাম্রাজ্য।

হয়তোবা দেশের বা বিদেশের কোনো একটি অতিতুচ্ছ ঘটনা। তাই তিনি তুলে ধরেছেন সহজ-সরলভাবে কিন্তু তার জাদুকরি ছোঁয়ায় আমরা পাঠকরা গল্পটা পড়তে পড়তে কেবলি অনুভব করেছি কী অসাধারণ ভালো লাগার এক অনুভূতি। অনেকেরই হোটেল গ্রাভারিন বা মে ফ্লাওয়ার পড়ে মনে হয়েছেÑ কত কী ঘটছে প্রবাসে; চারদিকে। এখন এই প্রবাসে আমি নিজেই এসে দেখি, সাদা চোখে কিছু নেই। পরক্ষণেই মনে হয়, আরে একটু এদিক-ওদিক করে প্রতিক্ষণ পরখ পর্যবেক্ষণ করে দেখলেই তো হুমায়ূন আহমেদের এ গল্প বা সে-ই গল্পটা যেন ছোঁয়া যাচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদের এ দর্শনের গভীরতা তাকে আন্তর্জাতিক করে তুলেছে। লুকিয়ে থাকা গুহাজীবী থাকতে চাইলেও তাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন পাঠক ও দর্শকের ভুবনে খাপ খোলা তরবারির মতো।

হুমায়ূন আহমেদের কারণে নর্থ ডেকোটার মতো বরফে ঢাকা একটি অঞ্চলকে আমরা সবাই বড় হয়ে ওঠার সময় কমবেশি ভালোবেসেছি। মনে হয়েছে, ওয়ান্ডার ল্যান্ড ওটাই। আজও হয়তোবা স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা তাই ভাবে, হুমায়ূন আহমেদের ওই প্রসঙ্গে লেখা কোনো বই হাতে নিয়ে। আর এই আমি যে এত বছর ডালাসে, টেক্সাসে, আমার কারণে কজনইবা পেরেছে জানতে বা বাসতে ভালো ডালাসকে! এখানেই হুমায়ূন আহমেদের চুম্বকত্ব। এত বছর কেটে গেল, সেই কবে ১৯৭২ সালে এলেন ‘নন্দিত নরক’ নিয়ে, আমরা বড় হয়ে বুড়ো হয়ে গেলাম, অথচ আর কেউ এলেন না হ্যামিলনের সেই বাঁশি বাজিয়ে বইমেলায় ছুটিয়ে নিয়ে যেতে দলে দলে সবাইকে। পেয়েছি বহু ভালো লেখক বহু মাত্রায় কিন্তু বংশীবাদক কি আর এসেছেন? মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্বকে করতলে নিয়ে খেলতে জানতেন, খেলাতে পারতেন। কী অসাধারণ তার মানব দর্শনÑ ‘তুমি একটা খারাপ কাজ করেছো তার মানে তুমি একজন মানুষ, তুমি সেই খারাপ কাজটার জন্য অনুতপ্ত তার মানে তুমি একজন ভালো মানুষ।’ নারীবিষয়ক মন্তব্যও বহুতলবিশিষ্টÑ ‘মেয়ে মানুষ চিনেছেন বলে অহঙ্কার করবেন না, কেননা আপনি জানেন না অন্য আর একটি মেয়ে আপনাকে কী শিক্ষা দেবে।’ তিনি বলেছিলেন, ‘পিথাগোরাস বলে গেছেন, তিন খুব শক্তিশালী সংখ্যা। তিনে আছে আমি, তুমি এবং সর্বশক্তিমান তিনি। সেজন্যই ত্রিভুবন, ত্রিকাল এবং ত্রিসত্য। কবুল বলতে হয় তিনবার। তালাক বলতে হয় তিনবার। পৃথিবীতে রঙও মাত্র তিনটা। লাল, নীল এবং হলুদ। বাকি সব রঙ এই তিনের মিশ্রণ...।’ হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনেও রয়েছে তিন সংখ্যাটি। ১৩ নম্বর যে অশুভ নয়, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, সে বার্তাই তিনি যেন দিতে এসেছিলেন এই পৃথিবীতে নিজেকে অশেষ প্রমাণ করে দিয়ে যেতে যেতে!

আমার কাছেও মাইলফলকের মতো একটি তারিখ ১৩ নভেম্বর। যেদিন থেকে হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ছি, তখন থেকেই আমার এই মনে হয়েছেÑ উনি জন্মেছেন বলেই আমারও জন্মদিনটি বিখ্যাত হয়ে গেছে। মানি এবং জানি ১৩ কখনই অশুভ নয়।শুভ জন্মদিন প্রিয় লেখক, একরাশ শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে