sara

ঢাকা লিট ফেস্ট

পৃষ্ঠপোষকতা এবং কিছু প্রশ্ন

  গোলাম কিবরিয়া পিনু

১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘ঢাকা লিট ফেস্ট’- শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কিছু প্রশ্ন ও বিবেচনা পিছু ছাড়ছে না অনেকের মতো আমারও। তা নিয়ে কিছু মতামত তুলে ধরছি। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা ও বাংলা একাডেমির সহযোগিতায় ৮ থেকে ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হলো ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮’। এই উৎসবের নামটি ইংরেজিতে প্রধান হয়ে আছে। তাতেই বোঝা যায়, বাংলা ভাষার সঙ্গে এর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে আছে শুরুতেই। বাংলা দূরে ঠেলে রেখে ইংরেজি প্রধান ভাষায় পরিণত করার বাস্তবতা এই উৎসবের সব কার্যক্রমে লক্ষ করা যায়; কখনো তা সূক্ষ্মভাবে, কখনো তা খোলামেলাভাবে।

তিন দিনের ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। আশ্চর্য হতে হয়, উদ্বোধনী ভাষণটি তিনি ইংরেজিতে প্রদান করেন। অথচ আরও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলায় ভাষণ প্রদান করে থাকেন, সেখানে সংস্কৃতিমন্ত্রী এই উৎসবে ইংরেজিতে বক্তব্য দিয়ে এক ধরনের অবস্থান নেন, যা বাংলা ভাষার জন্য গৌরবের হয়ে ওঠেনি। তা বরং আয়োজকদের ইংরেজি ভাষা তোষণের উদ্দেশ্য পূরণে সহায়তা হয়েছে।

২০১১-২০১৪ সাল পর্যন্ত এই ‘লিট ফেস্ট’ সবার কাছে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ নামে পরিচিত ছিল। সেই সময় এই অনুষ্ঠান আয়োজন করতে কোনো সরকারি সহায়তা নেওয়া হতো না। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে আয়োজকরা বেসরকারি স্পন্সরের পাশাপাশি এই আয়োজনে সরকারি সহায়তা নিতে শুরু করেন এবং এর নামও পরিবর্তন করেন। আয়োজকরা এবারের আয়োজনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে দুই কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়েছিলেন, কত টাকা পেয়েছেন শেষ পর্যন্তÑ তা আমরা জানি না। গত বছর এই অর্থের পরিমাণ ছিল এক কোটি টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে চাওয়া আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকা। আয়োজকরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জনগণের টাকা নিয়ে এই উৎসবের আয়োজন করেন। আবার তারা ব্যাংক, বিদেশি এয়ারওয়েজ ও স্পন্সরও নিয়ে থাকেন। তা হলে কোটি কোটি টাকা দিয়ে তারা কী করেন? এই টাকা বাংলা সাহিত্যের কোনোরকম বিশেষ উপকারে এসেছে কি? বাংলা সাহিত্য ইংরেজিতে অনুবাদ করে কি তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন উল্লেখযোগ্যভাবে? তেমন কোনো নিদর্শন এই উৎসবে উপস্থাপন করা হয়নি। আমরা লক্ষ করেছিÑ এই উৎসবের অতিথিদের সবচেয়ে দামি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাদের আসা-যাওয়ার খরচও নিশ্চয় বহন করা হয়েছে। বাংলা একাডেমি চত্বর সাজিয়ে বারোয়ারি মেলার মতো ঘুরেফিরে আড্ডা ও সময় কাটানোর নিছক পরিবেশও তৈরি করা হয়েছিল। একদিকে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান চলছে, তার পাশেই জোর আওয়াজে ব্যান্ডের গান চলছে। দু-একটি বিষয়ে ভালো আলোচনা হলেও বেশিরভাগই ছিল গতানুগতিক। এ ধরনের আলোচনা অনেকটা একুশের বইমেলার সময় বাংলা একাডেমি করে থাকে, টিভির টক শোতেও প্রতিনিয়ত তা দেখা যায়! তা আবার করার কী তাৎপর্য থাকে সরকারি টাকা খরচ করে?

এমন উৎসব যে কেউ করার অধিকার রাখেন, তাতে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেইÑ কিন্তু জনগণের করের টাকা সরকার কীভাবে কাকে প্রদান করছে, তা নিয়ে আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষরা প্রশ্ন তুললেই পারি। এই উৎসব কারা আয়োজন করছেন? তারা কি বাংলাদেশের কোনো শিল্প-সাহিত্যের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন? নাকি ইমেন্ট ম্যানেজমেন্টধর্মী লাভজনক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান? এসব প্রশ্ন বিবেচনা করে জনগণের টাকা খরচ করা উচিত। এখানে উদাহরণ দিইÑ ‘উদীচী’র মতো ঐতিহ্যবাহী ও কর্মমুখর প্রায় চারশ শাখা নিয়ে পরিচালিত সাংস্কৃতিক সংগঠন তো তেমন অনুদান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে পায় না! শুধু উদীচী কেনÑ এ ধরনের অন্যান্য সংগঠনের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। আর একটি উদাহরণ দিইÑ জাতীয় কবিতা উৎসব প্রায় ৩০ বছরের অধিককাল ধরে বড় উৎসব করে দুদিনব্যাপী। সেখানেও বিভিন্ন বিদেশি অতিথি আসেন। তাদের খরচ সর্বমোট মনে হয় এ সময়ে ১০ লাখের বেশি হয় না! অথচ ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর খরচ কোটি কোটি টাকা! সেই অনুযায়ী এর ফলাফল কী? কারা এর উপকারভোগীÑ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে? এই উৎসব বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কী বা কতটুকু উপকারে আসছে? অন্যদিকে এই উৎসবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই ক’বছরে যত কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, সেই টাকা দিয়ে বাংলা একাডেমির অনুবাদ বিভাগ পরিকল্পিতভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে সাহিত্যের অনুবাদ করে তা প্রচার ও বিপণনে ভূমিকা পালন করলে আরও সুফল পাওয়া যেত বলে আমরা মনে করি।

আমরা কোনো ভাষার সাহিত্যকে অবজ্ঞা করি নাÑ কিন্তু পাশাপাশি নিজের ভাষার মর্যাদা অক্ষুণœ রাখব, সে বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। বর্তমানে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি কিছু উচ্চবিত্তÑ বিশেষ শ্রেণি ও দেশি-বিদেশি সংস্থা দ্বারা অবহেলিত-অপমানিত ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত, অন্যদিকে বাংলা ভাষা বিভিন্ন চাপ ও প্রতিযোগিতার মধ্যেও রয়েছে, সেখানে বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও সরকারকে সব সময় সচেতন থাকতেই হবে। যদি শুধু বাংলা একাডেমির কথা বলিÑ তাদের অন্যতম দায়িত্ব হলো, যা তাদেরই এক দলিলে উল্লেখ করা হয়েছিল : ‘ক. জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও প্রসার ঘটানো; খ. জীবনের সব ক্ষেত্রে ও সব স্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ।’ তা হলে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ বা পরবর্তীকালে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ বাংলা একাডেমির উল্লিখিত দায়িত্বের সঙ্গে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ? এই উৎসবের স্পনসর যারা, তাদের নিশ্চয় প্রতিষ্ঠানগত উদ্দেশ্য রয়েছে। তা থাকা স্বাভাবিক! এই উৎসবের সহযোগী ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রধানতম উদ্দেশ্যÑ ইংরেজি ও ইংরেজদের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো। আর অন্য যেসব সংস্থা বা ব্যক্তি এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত, তারা বা সেগুলো ব্রিটিশ কাউন্সিলের অনুসারী বা ভাবাদর্শের অনেক কাছাকাছি। সে ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির তাদের নির্ধারিত বা উল্লিখিত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে একবারে ‘হোস্ট’ হয়ে নিয়মিত প্রতিবছর দায়িত্ব পালন করা সমীচীন হয়নি বলে আমরা মনে করি।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা না থাকলে, এই ভাষার সংকট আরও বাড়বে। ফ্রান্স, জাপানসহ উন্নত দেশসহ অনেক দেশে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারে রাষ্ট্র ও সরকারের নীতি-আইন রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর ভূমিকাও রয়েছে। এ জন্য তদারকি সেল আছে, এমনকি এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভাষাবিরোধী কোনো কিছু হলেই তারা সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে! আর এই সময়ে এসে ভাষার জন্য রক্তদানকারী দেশের হয়ে আমরা ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ বা ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর জন্য উৎসাহী ও নিবেদিত হয়ে পড়ছি!

যে দেশে একটি জাতীয় ভাষানীতি হলো না, বাংলা ভাষা শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দিন দিন অবহেলার শিকার হচ্ছে, বাংলা ভাষার সাহিত্য অনুবাদও হচ্ছে না অথচ বাংলা একাডেমি ও ভাষা ইনস্টিটিউটও কাক্সিক্ষতভাবে কাজ করছে নাÑ অসহায় হয়ে পড়ে আছে যেন; সেই পরিস্থিতিতে ‘ইংরেজি মিডিয়াম’কে আরও প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সরকার উদাসীনভাবে জনগণের করের কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ ও অন্যান্য পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ‘লিট ফেস্ট’ আয়োজনে এবারও এগিয়ে এসেছে! এটা কি ভাষা আন্দোলন, বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি? এটা কি সরকারের বিবেচনাবোধসম্পন্ন দায়িত্ব পালন? ‘লিট ফেস্ট’-এর মূল চরিত্র কী? এর প্রভাব কী? তা কি গভীরভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে? নাকি আবারও ইংরেজি ভাষার আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর মতো কার্যক্রম পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ইংরেজিকে বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে ‘লিডিং’ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করব? সেটা এক বড় প্রশ্ন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে