sara

সুফিয়া কামালের কাব্যকাঠামো

  শহীদ ইকবাল

১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের কবিতায় চল্লিশের দশক, বলা চলে এক ধরনের স্ববিরোধিতা বা দোলাচলতায় আচ্ছন্ন। কবিদের মধ্যে অনুভূতির ব্যাপারটি তখন নানা কারণেই ঝুঁকির সম্মুখীন। প্রসঙ্গত বলতে হয়, ‘সাধারণত দেখা যায় যে কলকাতা থেকে প্রকাশিত পূর্ব পাকিস্তানের এবং পাকিস্তান-পরবর্তী কাব্য সংগ্রহে মুসলমান কবিদের কোনো রচনা স্থান পায়নি। স্থান না পাওয়ার কারণ হলো, প্রথমত, পরিচয়ের অভাব, দ্বিতীয়ত, বিষয়গত ব্যবধান ও অপ্রীতি, তৃতীয়ত, পাকিস্তান সৃষ্টির কারণে যে রাষ্ট্রনৈতিক বিদেশবোধ তা সাহিত্যক্ষেত্রেও সংক্রমিত হয়েছে।’ তা ছাড়া বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট কিংবা তার ভাষা সংকটও তখন কম ছিল না। একদিকে প্রবহমান অনিবার্য আধুনিক আলোকবর্তিকা অন্যদিকে রক্ষণশীল শাস্ত্ররীতির বাছবিচার এ সময়ে এক ধরনের দ্বিধা তৈরি করে ভেতরে এবং বাইরে। এর সঙ্গে পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের দুর্বল আর্থনীতিক অবস্থানটিও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তবে ধর্মের ভেতর দিয়ে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন কিংবা স্বপ্নপূরণের পাকিস্তান রাষ্ট্র উল্লিখিত কবি-সম্প্রদায় একটি বলয়ে আবদ্ধ করে ফেললেও এক সময় পূর্ববাংলার মুসলমানরা নিজস্ব ভূমিদস্তুর বুঝে কাব্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। বস্তুত তা ত্রিশোত্তর কাব্যধারারই একটি সম্প্রসারিত রূপ। ‘এবহঁরহব ঢ়ড়বঃৎু পধহ পড়সসঁহরপধঃব নবভড়ৎব রঃ রং ঁহফবৎংঃড়ড়ফ’Ñএর পর্যাবৃত্ত রচনা করে। উদাহরণে আনা যায়, মহীউদ্দিনের (১৯০৬-১৯৭৫) ঐকান্তিক পথের গান (১৩৩৬), স্বপ্ন সংঘাত যুদ্ধ বিপ্লব (১৩৪৯), গরীবের পাঁচালী (১৯৬২); মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার (১৯১০-১৯৭৯) পশারিণী (১৩৩৮), মন ও মৃত্তিকা (১৩৬৭), অরণ্যের সুর (১৯৬৩); সুফিয়া কামালের (১৯১১-১৯৯৯) সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), মায়া কাজল (১৯৫১), মন ও জীবন (১৯৫৭); বন্দে আলী মিয়ার (১৯০৬-১৯৭৯) ময়নামতীর চর (১৯৩২); আবদুল কাদিরের (১৯০৬-১৯৮৪) দিলরুবা (১৯৩৩), উত্তরবসন্ত (১৯৬৭); আ. ন. ম. বজলুর রশীদের (১৯১১-১৯৮৬) পান্থবীণা (১৯৪৭), মরুসূর্য (১৯৫৬), শীতে বসন্তে (১৯৬৩), চৌধুরী ওসমানের (১৯২০-১৯৮৬) মরুপথ (১৯৪৬) প্রভৃতি। প্রসঙ্গত এসব কবির ধারায় মানুষ-মানবতা, জীবনবাদী বিষয়-আশয় নিয়ে সুফিয়া কামালের কবিভাষা নির্মল প্রকৃতিশোভায় অভিব্যঞ্জিত হয়। উদাহরণÑ ‘তোমার আকাশে দাও মোর মুক্ত বিচরণ-ভূমি/শিখাও তোমার গান। গাহিব, শুনিবে তুমি।/মুক্তপক্ষ এ-বিহগী তোমার বক্ষেতে বাঁধি নীড়/যপিবে সকল ক্ষণ স্থির হয়ে, চঞ্চল অধীর।/আঁধার গুণ্ঠন টানি কানে কানে কব সেই কথা/যে-কথা গুমরে বক্ষে প্রকাশের কত ব্যাকুলতা’।

এ পঙ্্ক্তিমালায় বিভাগ-পরবর্তী পূর্ববাংলায় কবিতার সম্ভাবিত প্রাণভোমরা জল-মাটি-হাওয়ার পরিম-লে অবিশ্বাস্যরূপে ¯িœগ্ধপ্রবণ ও চরম বিদ্যুতায়িত। নতুন কবিতা, একুশে ফেব্রুয়ারি বা পূর্ববাংলার কবিতা সংকলনে যে কবিগণ লিখেছিলেনÑ তাদের মত-পথ, আদর্শ-উদ্দেশ্য হয়তো এক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে নানা সময়ে তাদের যেমন নবায়ন হতে দেখা যায়, তেমনি চর্চার ভেতর দিয়ে (ঢ়ঁৎব বীঢ়বৎরবহপব) তারা ভাবনাপ্রতিভার উত্তরণ ও আস্থা অর্জন করতে সামর্থ্য হন। মহীউদ্দিন, বন্দে আলী মিয়া, আবদুল কাদির, সুফিয়া কামালের অনুবর্তী চেতনায় নতুন কবিতা বা একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের কবিকুল মানবতাবাদী, সাম্যানুবর্তী, জাতীয়তাবাদী বা প্রকৃতির লাবণ্য-মমতায় আস্থা-উত্তীর্ণ কবি-ইঙ্গিত রচনা করতে সক্ষম হন। সেখানেই ধরা পড়ে বিভাগ-পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলার আবেগের আন্তরিকতা এবং স্থির ও দূরপ্রসারী কাব্য-ইঙ্গিতের প্রবল উচ্চাকাক্সক্ষী রূপ। মূলানুগ ও স্বাতন্ত্র্য-বীক্ষায় আধুনিকতার রথে এগিয়ে চলেন আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪), আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫), সানাউল হক (১৯২২-১৯৯৩), শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) প্রমুখ কবি। প্রসঙ্গত কবিভূমিতে যে সাংস্কৃতিক পর্বটি চিহ্নিত হয়, তা ভাষা আন্দোলন এবং বৈষম্যহীন সমাজ ও আর্থ-রাজনীতিক আন্দোলনের ভেতর দিয়েÑ যেখানে নবরাষ্ট্র পাকিস্তান নিয়ে মধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বাঙালির ঘটেছে স্বপ্ন ও আশাভঙ্গ উৎসারিত। বস্তুত এ চিন্তায় তখন করাচি-ইসলামাবাদের পরিবর্তে ঢাকা হয়ে উঠতে চাইছে সদ্যমধ্যবিত্ত নাগরিক চিন্তার কেন্দ্র। কবিতার সম্ভাবিত প্রাণভোমরাটি সে পথেই নিজস্ব হয়ে উঠল, পেল স্বতন্ত্র দিশা। এ প্রবণতাতেই সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের কবিতায় হয়ে ওঠেন অনবদ্য ও স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত কবি।

সুফিয়া কামাল তার সাঁঝের মায়া প্রকাশ করেন ১৯৩৮ সালে। এরপর মায়া কাজল (১৯৫১), মন ও জীবন (১৯৫৭)। চল্লিশের কাব্য-পরিম-লে তিনি কবি হয়ে উঠেছেন। এর প্রমাণ তার কবিতায় সচকিতরূপে বিধৃত Ñ ‘অশ্বিনী নক্ষত্রে চন্দ্র যাপিতেছে পূর্ণিমার রাতি/বিরহের অশ্রুজল বিন্দু বিন্দু ঝরাইতেছে স্বাতি।/অসীম মমতাভরে সুক্তি সে জলের লভি স্বাদ,/বক্ষ প্রসারিয়া দিলÑ লভিল সে মুকুতা প্রসাদ।/পরম গোপন ধন বক্ষ মাঝে রাখি আবরিয়া/সাগর অতলে সুক্তি ব্যথানন্দে রহিল ডুবিয়া’। কবির ছন্দে-আনন্দে প্রাক-পাকিস্তানের আদর্শ অপ্রকাশিত নয়। তবে সুফিয়া কামাল পূর্ববাংলায় স্নিগ্ধ সংবেদনশীল মনে লেখালেখি করেন, প্রকৃতিপুটে প্রেম-নস্টালজিয়া-বিরহ স্বচ্ছন্দে ধারণ করেন। এ সময়ের অন্য কবির মতো বিশেষ কোনো আদর্শ বা জাতীয়তাবাদী দর্শনে তার কবিতা ততটা প্রখর নয়। তবু নিছক শ্যামল-সজল প্রকৃতি তার কাব্যের অনাদ্যন্ত পটভূমি। মননশীলতায় তিনি একদম পূর্ণ পরিশুদ্ধ। প্রকৃতিমুগ্ধতা (ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যে) অনুভূতির রঙে উৎসারিত। প্রকৃতির মুগ্ধ বর্ণনা-বিবরণে এক ধরনের চলচ্ছবিময় তিনি। তার ভেতরেই মন্ময় ভাবের প্রকাশ বিকশিত। প্রেম-বুদ্ধি আবেগের তারল্যে ছন্দোময়। সেখানে আধুনিক উপাদানসমূহ সফল পরিচর্যার অবকাশ পায় না। বাৎসল্য বা মাতৃত্ব তার কাব্যে পেয়েছে অপরিমেয় বিশিষ্টতা। উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪), দীওয়ান (১৯৬৬), প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৬৮), অভিযাত্রিক (১৯৬৯), মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০), মোর যাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২) এসব কাব্যগ্রন্থ কবির সহজাত কাব্যচিন্তনের ফসল। সুফিয়া কামালের স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলন বের হয় ১৯৭৬ সালে।

চল্লিশে মুসলিম বাঙালি কবিরা অনেকেই আধুনিক দৃষ্টিচেতনায় কবিতা লিখলেও সুফিয়া কামালের পাশাপাশি মহীউদ্দিন (১৯০৬-১৯৭৫), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯), আজিজুল হাকিম (১৯০৮-১৯৬২), মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা (১৯১০-১৯৭৯), আ. ন. ম. বজলুর রশীদ (১৯১১-১৯৮৬) প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তারা কেউ কেউ পাকিস্তানে মানবতা বা সাম্যবাদী চেতনাধারায় কবিতা লিখে খ্যাতিমান হলেও সুফিয়া কামাল অনবদ্যভাবে প্রকৃতিসচেতন ‘রূপসী বাংলা’র কবি। স্বাধীন বাংলাদেশে শেষদিন পর্যন্ত রয়ে যান কবিতারচনার পাশাপাশি আদর্শ মমতাময়ীর প্রজ্বল প্রদীপশিখারূপে। নারী জাগরণ ও চেতনার পথিকৃৎরূপেও তিনি হয়ে ওঠেন ‘জননী সাহসিকা’র অনন্য প্রতীভূ। সুফিয়া কামাল আমাদের কবিতা-ঘরানার অনন্য শ্রমশীল এক কবিস্বাতন্ত্রিক কাব্যবীক্ষণের প্রবাদপ্রতিম কবিব্যক্তিত্বÑ যা আমাদের এ ভূখ-ের মানবতাবাদী কাব্যধারার প্রাতিস্বিক সৃষ্টিশীলতার চিরন্তন সারবত্তাস্বরূপ এবং শ্রেয়োশীলতারও নামান্তর, সন্দেহ নেই।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে