কষ্টের আকাশে এক টুকরো হাসি

  নাহিদ হাসান রবিন

১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মামাবাড়ি অনেক দূর হওয়ায় ইচ্ছে থাকলেও তেমন যাওয়া হয় না। তার ওপর ভার্সিটির ছুটিছাটার একটা ব্যাপার তো আছেই। এবার মামাতো বোনের বিয়ের সুবাদে সপ্তাহখানেক থাকা যাবে মামাবাড়িতে। কয়েকদিন আগে থেকেই এটা-সেটা গোছাতে ব্যস্ত ছিল চৈতি। আর মনে মনে হাজার পরিকল্পনা করে রেখেছে। মামাবাড়ি আসার পর সেভাবেই চলতে থাকে। রোদ-বৃষ্টি আর ধুলো-বালির সঙ্গে মিতালি জমিয়ে কত মজাই না করছে। খাবার-দাবারের দিকেও কোনো খেয়াল নেই। গ্রাম পেলে যেন আনন্দের সীমা থাকে না চৈতির। বিয়েবাড়িতে চেনা-অচেনা শত মানুষের হৈচৈ। সবাই ব্যস্ত। কেউ কাজে, কেউবা আড্ডায়। চৈতিও এই বিয়েতে এসেছে আড্ডা দিতে আর আনন্দ করতে। কিন্তু কাল রাতের ছোট্ট একটি ঘটনা কেন্দ্র করে চৈতির সব আনন্দ আর আড্ডা উধাও হয়ে যায়। গত দুদিন আড্ডার কোনো কমতি ছিল না। অনেক দিন পর সমবয়সী খালাতো ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা হয়ে বেশ ভালোই কাটছিল সময়। এই আনন্দঘন সময়ের মাঝে হঠাৎ কাল রাতে অচেনা এক যুবককে কিনা কী বলতে গিয়ে সব আনন্দ উধাও হয়ে গেল।

বাড়ির অনেকেই দু-চারটা মন্দ কথা শুনিয়েছে, যা চৈতি এখনো মেনে নিতে পারছে না। ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও বড় কিছু নয়। একেবারেই মামুলি। কাল সকাল থেকে দুজন ছেলে কনের ঘরের মেঝে আর দেয়ালে আলপনা ও সাজসজ্জার কাজ করছে। চৈতি ও তার সহপাঠীরা বেশ কয়েকবার ওই ঘরে গিয়ে কাজ করা দেখে এসেছে। ছেলে দুটোর একজন লাল গেঞ্জি পরা। লম্বা মতোন চেহারা, বড় বড় চুল আর খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা। দেখেই শিল্পীর মতো মনে হয়। কাজও করছে বেশ নান্দনিক। ছেলেটার চোখে দু-একবার চৈতির চোখ পড়লেও কথা হয়নি। তবে কী এক টানে বা এমন শিল্পকর্ম দেখার জন্য চৈতি বেশ কয়েকবার ওই ঘরে গিয়েছে। শেষবার গিয়েছিল কাল রাতে। আঁকাআঁকি ও সাজসজ্জার কাজ তখন শেষ। ছেলে দুটো মেঝেতে বসে সিগারেট ফুকাচ্ছে আর গল্প করছে। চৈতিরা সেই সময় ঘরে ঢোকে। লম্বা মতো ছেলেটি মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অন্য ছেলেটিকে বললÑ সব গুছিয়ে নে। এই ফাঁকে চৈতি একটি আলপনার দিকে আঙুল তুলে বললÑ এটার বাইরের অংশটা সাদা রঙ হলে আরও ভালো হতো।

ওরে বাবা, এই কথা শুনে লম্বা মতো ছেলেটি ক্ষেপে গিয়ে বললÑ কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ এটা বলার জন্যই কি এখানে এসেছেন? আপনার কি মনে হয়, আমরা এখানে কাজ শিখতে এসেছি? মোটেও না। আমাদের এখানে অনুরোধ করে আনা হয়েছে। আপনি এত ভালো জানেন, তখন আমাদের ডাকার কী দরকার ছিল? বিরতিহীনভাবে কথাগুলো বলল ছেলেটি। চৈতি ও তার সহপাঠীরা যেন হতভম্ব হয়ে গেল। কেউ কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একটু পর ঘটনাটি পুরো বাড়ির লোকজনের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল। অনেকেই এসে চৈতিকে দু-চারটি কথা শুনিয়ে গেল। এমন কথা বলা ঠিক হয়নি মোটেও, এসব নানা কথা।

মেয়েটি নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে পাশের রুমে গিয়ে খাটের ওপর উবু হয়ে শুয়ে আছে। খানিক পরে চৈতির মা আর মামি এসে বলল, ছেলে দুটোকে তোর ভাই ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছে এসব করানোর জন্য। চারুকলায় পড়ালেখা করে ওরা। ওর কথায় তুই কিছু মনে করিস না। কিন্তু এসব সান্ত¡না চৈতির মাথায় ঢোকে না। নতুন করে একটা চিন্তা ঢুকে পড়ে মাথার মধ্যে। চারুকলার একজন ছাত্র এমন আচরণ কীভাবে করতে পারে। এমন অপমানের কথা চৈতি কিছুতেই ভুলতে পারে না।

আজ এমিলির বিয়ে। একটু পর বরপক্ষের মানুষেরা আসবে। সমবয়সী লোকজনরা সবাই এমিলিকে ঘিরে বসে আছে। এখানে সবার আগে থাকার কথা ছিল চৈতির। কারণ চৈতি আর এমিলি শুধু বোনই নয়, ওরা অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অথচ বাইরের একজন লোকের সঙ্গে সামান্য একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন প্রিয় মানুষকে ছেড়ে অন্য ঘরে বসে কাঁদছে। বিয়েবাড়ির ব্যস্ততায় চৈতির দিকে কারো খেয়াল না থাকলেও এমিলির খেয়াল ঠিকই আছে। চৈতিকে ডাকার জন্য বেশ কয়েকবার লোক পাঠিয়েছে। শেষমেশ পার্টি থেকে উঠে গিয়ে নিজেই চৈতিকে ধরে নিয়ে আসে। সবাই আনন্দ করছে যার যার মতো করে। কিন্তু চৈতি প্রচ- রকম অপমানে কেমন গুটিয়ে গেছে। রাত থেকে এখন পর্যন্ত মুখে কিছু দেয়নি। মামি এসে কয়েকবার অনুরোধ করেও কাজ হয়নি। হবে-ইবা কেমন করে। সবার আদরের চৈতি। কখনো এভাবে কেউ কড়া করে কথা বলেনি। তা ছাড়া অবুঝ বালিকাও নয় যে, এই অপমানটা ভুলে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া একটা সুন্দরী মেয়ে এমন অপমান হজম করা তার জন্য কঠিনই বটে।

বাইর বাড়িতে সিডি প্লেয়ারে ধুম-ধাড়াক্কা গান বাজছে। ছোট ছেলেমেয়েরা সেখানে অনেক মজা করে নাচ-গান করছে। অনেক ব্যস্ততার মাঝেও বাড়ির সবার মধ্যে একটা উৎফুল্ল ভাব। কেবল চৈতি সাঁতার কাটছে বিষণœতার মহাসাগরে। এমন সময় ছোট মামার ছেলে এসে চৈতির হাতের মধ্যে একটা কাগজ দিয়ে গেল। কিসের কাগজ, কে দিল, এসব বুঝে ওঠার আগেই পিচ্চিটা দৌড়ে চলে গেল। অনেকটা অনীহা নিয়েই চৈতি কাগজের ভাঁজটা খোলে। বেশ বড় একটা কাগজে সম্মোধনবিহীন চিঠি। অনেক সুন্দর করে দুই লাইন লেখা। কী সুন্দর লেখা! লেখার দুধারে নান্দনিক আলপনা। হাতের লেখা দেখে তো অবাক চৈতি। তার পর ঝটপট পড়ে নেয় লেখাটিÑ ‘জানি রেগে আছেন। আপনার রাগ ভাঙানোর সাধ্য আমার নেই। কাল রাতের ঘটনার জন্য আমি অনুতপ্ত। সারা রাত ঘুমাইনি।’

প্রচ- রাগ আর ক্ষোভের মধ্যেও কষ্টের আকাশে এক টুকরো হাসি দোল খেয়ে গেল। চৈতির চোখের সামনে ভেসে উঠল লাল শার্ট পরা ছেলেটির মুখচ্ছবি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে