কবি আসে কবি যায় আবুল হাসান আসেন না

  অজয় দাশগুপ্ত

২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!/মানুষের লোকালয়ে ললিতলোভনকান্তি কবিদের মতো/তুমি বেঁচে থাকো/তুমি ফের ঘুরে ঘুরে ডাকো সুসময়!’

আমরা তখন নিতান্তই তরুণ। সদ্য স্বাধীন দেশে মানুষের মনে মনে অন্ন চিন্তা চমৎকার। তার পরও আমাদের ভুবন ছিল প্রতিভার আলোয় ভরপুর। সে সময় বাংলাদেশের কবিতায় যে কাজ হয়েছিল, যে মোচড় আমরা দেখেছি আজ তার ছিটেফোঁটাও নেই। কবি ও কবিতা তখন একাকার। মূলত আমরা তাকে জানতাম বোহিমিয়ান এক কবি হিসেবে। তিনি এবং কবি নির্মলেন্দু গুণের বন্ধুত্বের খবর ছিল মুখরোচক। কোন মসজিদের বারান্দায় শুয়ে তারা রাত্রি যাপন করেছিলেন বা কীভাবে তারা ঘুরে ঘুরে সময় কাটাতেন এসবের পাশাপাশি তাদের কবিতা হয়ে উঠেছিল নতুন জাতিসত্তার আত্মার খোরাক।

একটা ঘটনার কথা বলি। চট্টগ্রামে তখন বাংলাদেশ পরিষদ নামে একটি লাইব্রেরি ছিল। তার হলরুমে বসত রুচি ও মূলধারার নানা আসর। এমনই এক শোকঘন আসরে গিয়েছিলাম এক বিষণœ সকালে। ভালো করে পড়া না হলেও তখন ‘রাজা যায় রাজা আসে’ আমাদের মুখে মুখে। আমরা এই কবিরÑ ‘ঝিনুক নীরবে সহো/ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ভিতরে বিষের বালি, চোখ বুজে মুক্তো ফলাও’ তখন মনে গেঁথে নিয়েছি। আর শুরুতেই কিনা ছন্দপতন। আমাদের গোঁফ গজানোর বয়সে ভালো লাগার কবি পাড়ি দিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। সে কারণে এই শোকসভা। মনে পড়ে গুটিকয় কবি আর শ্রোতার মাঝে হঠাৎ এসে হাজি হয়েছিলেন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। কবি গীতিকার অধ্যাপক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল কথার রাজা। লাল একটা ছোট ফিয়েট গাড়িতে তার আগমন এবং নিজ থেকে অংশগ্রহণে সকালটাই ভিজে গিয়েছিল আর্দ্রতায়। যেমনটা আবুল হাসানের কবিতায় আছেÑ ‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,/মায়াবী করুণ/এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?/এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?/পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্নাভেজা চোখ?/ মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষè তমোহর/কী অর্থ বহন করে এই সব মিলিত অক্ষর?’

সেদিন সে পাথর আর্দ্র করে তুলেছিল আমাদের চোখ। হেনা স্যার কথা বলেননি তেমন। সঙ্গে আনা রাজা যায় রাজা আসে থেকে কয়েকটা কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। তাতেই খুলে গিয়েছিল এক অপার আনন্দময় বিষাদ ভুবন। মাত্র এক দশকের কবিতা চর্চায় তার যে ব্যপ্তি আর ধ্রুপদী মনোভঙ্গি তার তুলনা এখনো মেলে না। সত্তরের উচ্চকিত কবিদের ভিড়ে একা এবং নিঃসঙ্গ আবুল হাসানই লিখেছিলেন : অবশেষে জেনেছি মানুষ একা। মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অসহায় আর একা। এই নির্জনতা আমরা জীবনানন্দ ও শামসুর রাহমান ছাড়া দেশের প্রধান কবিদের ভেতর খুব একটা পাই না। নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ কিংবা সমসমায়িক কালের আরও অনেক কবিকে ছাড়িয়ে তার যে বিশুদ্ধ উচ্চারণ ধারণা করি, সেটাই তার পাঠ ও মেধার ফসল। যা আজ অবধি অধরা থেকে গেছে। নানাদিক থেকে রাজনীতি ও সামাজিক আক্রমণে কবিতা যত উচ্চকিত আর নিনাদ হয়েছে আবুল হাসান ততই আমাদের দুরবিনে এসেছেন দূরের কোনো মায়াবী পাখি হয়ে। এই তো কবি ও কবিতার আয়ু। মায়া আর ভালোবাসা না থাকলে, সলজ্জতা না থাকলে সে কবি মাইক মঞ্চে কাঁপানো কেউ হতে পারেন বটে মনে স্থায়ী হতে পারেন না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যারা বহুপ্রজ যাদের প্রকাশের অদম্য ইচ্ছা কবিতাকে খাটো ও খাটোতর করে তোলে আমার মতো তাদের সবার উচিত বারংবার আবুল হাসানের কাছে ফিরে যাওয়াÑ ‘যদি সে সুগন্ধি শিশি, তবে তাকে নিয়ে যাক অন্য প্রেমিক!/আতরের উষ্ণ ঘ্রাণে একটি মানুষ তবু ফিরে পাবে পুষ্পবোধ পুনঃ/কিছুক্ষণ শুভ্র এক স্নিগ্ধ গন্ধ স্বাস্থ্য ও প্রণয় দেবে তাঁকে।/একটি প্রেমিক খুশি হলে আমি হব নাকি আনন্দিত?/যদি সে পুকুর, এক টলটলে সদ্য খোঁড়া জলের অতল।/চাল ধুয়ে ফিরে যাক, দেহ ধুয়ে শুদ্ধি পাক স্মৃতিরা সবাই।/একটি অপার জাল, জলের ভিতর যদি ফিরে পায় মুগ্ধ মনোতল।/এবং গাছের ছায়া সেইখানে পড়ে, তবে আমি কি খুশি না?’

এমন রোমান্টিসিজম ও বিষাদ আজকাল অচেনা। তার কবিতার শুদ্ধতা জলের মতো প্রবহমান। নেশায় লাগুক আর না লাগুক জীবনধারণের জন্য তার প্রয়োজন পড়ে। তখন তিনি গভীর প্রেমে। সুরাইয়া খানম নামে এক সুন্দরী বিদুষী প্রেমিকাকে নিয়ে অসাধারণ সব কবিতা তখন আমাদের মুগ্ধ করার পাশাপাশি বাংলা কবিতায় চিরকালের জন্য জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু প্রেম বা বিরহ সবকিছু ছাপিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে গেল মানুষের অজানা এক জগৎ। সেই অন্ধকার অমৃতপুরীতে তখন তার যাওয়ার বয়স হয়নি যদিও। ঠাট্টা করে নিজেই বলতেন, তার হৃদযন্ত্র ছোট তো হয়নি হয়েছিল স্ফীত। জর্মানিতে চিকিৎসা করিয়ে আসার পরও সেই বিশা। হৃদযন্ত্র বাগ মানেনি। হয়তো জানতেন বলেই যৌবনে লিখেছিলেন অন্তর্গত দুঃখ ও অন্য জগতের এমন কবিতাÑ ‘এতটা বয়স চলে গেল, তবু কী আশ্চর্য, আজও কি জানলাম,/চড়–ইয়ের ঠোঁটে কেন এত তৃষ্ণা? খড়ের আত্মায় কেন এত অগ্নি, এতটা দহন?/গোলাপ নিজেই কেন এত কীট, এত মলিনতা নিয়ে তবুও গোলাপ?/এতটা বয়স চলে গেল, তবু কী আশ্চর্য, আজও কি জানলাম,/একটি শিশুর কেন এত নিদ্রা, এত গাঢ় ঘুম আর/তখন আমরা কেন তার মতো ঘুমুতে পারি না?’

এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তার মতো কবি আমরা আর দ্বিতীয় কাউকে পাইনি। যার যার ভুবনে তারা যেমনই হোক, আবুল হাসানকে অতিক্রম করার মতো কবিতা বাংলাদেশের কবিতায় হাতেগোনা। বিপুল ভা-ার কিনা জানি না, তবে যেটুকু যখন দিয়েছেন তখনই তা ব্যতিক্রম। এমনকি তিনি যখন স্বাধীন দেশে পেয়ে হারানোর বেদনার কথা লিখছেন তখনো কি মৃদু আর কি পরিমিত তার কবিতার ভাষা। ছত্রে ছত্রে বেদনা আর ভালো লাগার স্পর্শহীন কথা সাজিয়ে দিলেই কবিতা হয় না। সেটা আবুল হাসান পাঠ করলেই বোঝা সম্ভব।

ছোট ভাইটিকে আমি

কোথাও দেখি না,

নরম নোলক পরা বোনটিকে

আজ আর কোথাও দেখি না!

কেবল পতাকা দেখি,

কেবল উৎসব দেখি,

স্বাধীনতা দেখি,

তবে কি আমার ভাই আজ

ঐ স্বাধীন পাতাকা?

তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদিতে উৎসব?

বুকে হাত দিয়ে বলা যায় এর নামই কালজয়ী অমর কবিতা। যখন তিনি চলে গেলেন, তখন আমাদের কবিতা ছটফট করছিল নানা যন্ত্রণায়। কবিদের ভেতর তখন সৃজনের যন্ত্রণা ব্যতীত খ্যাতি পুরস্কার বা পদকের যন্ত্রণা ছিল না এতটা। নীরব-নিভৃত সুন্দর সময়ের কবিরা তখন দেশজ ভাবনায়ও ছিলেন শান্ত।

আজ সেই শান্তি কোথাও দেখি না। রোদন রূপসী কোমল কালো মিসট্রেসের তিরিশ বছর কাল কুমারী থাকার অভিশাপ বোঝেন না কবিরা। সে কারণেই তিনি অনন্য। দেখবেন কী অবলীলায় মাত্র ২৮ বছর বয়সের কবি বলছেন তার মৃত্যু নেই। যে কবি কালজয়ী, যিনি কলম ধরেছিলেন অমরত্বকে পায়ে ঠেলে বরণীয় হওয়ার জন্য তার মৃত্যু থাকে না। মৃত্যু হতে পারে না। আজ তার সেই প্রেমিকা বা তিনি কেউ নেই। তারার আলোয় ভোরের স্নিগ্ধতায় কবিতার ধবল পালে হাওয়ার মতো এসে লাগেন তিনি।

ভেবে আশ্চর্য হই কীভাবে জানতেন তার মরণ সীমাহীন এক জীবনকে আলিঙ্গন মাত্র। তাই তো লিখতে পেরেছিলেনÑ ‘ধান বুনলে ধান হয় না, বীজ থেকে পুনরায় পল্লবিত হয় না পারুল/তবু রয়েছি আজও আমি আছি,/শেষ অঙ্কে প্রবাহিত শোনো তবে আমার বিনাশ নেই/যুগে যুগে প্রেমিকের চোখের কস্তূরীদৃষ্টি,/প্রেমিকার নত মুখে মধুর যন্ত্রণা,/আমি মরি না, মরি না কেউ কোনোদিন কোনো অস্ত্রে/আমার আত্মাকে দীর্ণ করতে পারবে না।’

আবুল হাসান আমাদের প্রিয় কবি পৃথক পালঙ্কে ঘুমায় জীবনের শরশয্যা। কবি আসে কবি যায়, সহজে আবুল হাসান আসেন না বাংলা কবিতায়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে