নিজের মুখের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়া মানুষের মন

  আনিফ রুবেদ

২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বারান্দা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে, নিজের মুখের ওপর যখন নিজেরই পা পড়ে, নিজের পায়ের তলায় নিজের মুখটা ঢেকে যায়, তখন ভীষণ ব্যথা পায় মফিজুল হক। ভেতর থেকে উথলে আসে কান্নার ঢেউ। সে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে নিচে পড়ে থাকা ছেঁড়া পেপারের সব কটি টুকরো তুলে নিয়ে এসে নিচতলার ইজি চেয়ারে বসে।

অশ্রু সজল চোখে বসে মনের ভেতরে বাঘ শিকার করার কথা ভাবতে থাকে। ভাবতে থাকে তুমুল যৌবনে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ানো রক্তের নাচনের কথা। পেপারের টুকরোগুলো সাজিয়ে পাজলের মতো করে ছাপানো ছবিছাপ মেলায়। কালো কালো পোকার মতো বর্ণ, বাক্যে লেখা ঘটনা মেলায়। পুরো ছবি মেলে না। ঘটে যাওয়া ঘটনা মেলানোর চেষ্টা করে, মেলে না। ছবির কিছু কিছু অংশ হারিয়ে গেছে, ঘটনার ভেতর থেকে কিছুটা হারিয়ে গেছে।

একসময় তার কান্না থামে এবং অনেকটা শান্তের ভাব আসে ওপরে। কিন্তু ভেতরে তখনো বিক্ষুব্ধ ঝড়ঝঞ্ঝা। অশ্রু ঝরার পরেও দুটা টসটসে জলের ফোঁটা লেগে থাকে দুচোখে। চোখের নিচে দুটো জলফল ঝরে যাব যাব করেও ঝরছে না। সমগ্র মুখে বয়সের দাগ বিড়ালের আঁচড়ের মতো জটিল জাল তৈরি করেছে। চোখের জল এসব বয়সের আঁচড়ে পড়ে ভরে উঠেছে। একেকটা জরার দাগকে একেকটা নদীর মতো দেখাচ্ছে। এসব নদীতে আছে মাছ, মাছের কাঁটা, বালিচর, ডুবে যাওয়া রূপ, যৌবন, শক্তি, শিশুকাল, ফলমূল, সঙ্গম, যন্ত্রণা, কর্পূরের মতো সুখ।

মায়েজা বেগম চা দিতে এলে, সে লুকানোর চেষ্টা না করেই চোখের জল মুছে। মায়েজা বেগম বিস্মিত হয়ে যায় তার স্বামীর চোখে পানি দেখে। সে মফিজুল হককে প্রশ্ন করেÑ ‘কেন কাঁদছ তুমি?’ তখন সে পেপারের ছেঁড়া টুকরোগুলো দেখায়। টিটেবিলের ওপর ছেঁড়া ছবির পাজল দেখে চমকে ওঠে মায়েজা বেগমও। মফিজুল হক বলেÑ ‘এই যে পেপার আর এই যে পেপারে ছাপানো আমার ছবি, এই ছবির ওপরে পা দিয়ে ছিলাম মায়েজা বেগম, নিজের মুখের ওপর নিজে পা দিয়েছিলাম। নিজের ইতিহাসের ওপর নিজে পা দিয়েছিলাম।’ অমীমাংসিত পাজলের মতো ছবি দেখেই পুরো ছবিটা মায়েজা বেগমের মনে পড়ে। বিয়ের কিছুদিন পরেই এই ছবিটা পেপারে প্রকাশিত হয়, একটা মানুষখেকো বাঘ মারার কারণে। এই পেপার বহু যতœ করে বহুদিন ধরে রেখে দিয়েছিল মফিজুল হক। তা টেনে এনে কখন নাতি-পুতিরা ছিঁড়ে ফেলে রেখেছিল। এসব ছেঁড়া টুকরো মায়েজা বেগমও দেখেছে। তখন খেয়াল করেনি কোন পেপারের টুকরো এগুলো। টুকরোগুলোর ওপর দিয়ে ভ্রুক্ষেপ না করেই সেও হেঁটে গেছে, স্বামীর মুখের ওপর পা পড়েছে নিশ্চয়ই তারও। এসব ভাবতে ভাবতে সেও পাশের চেয়ারে কাঁদতে বসে।

তাদের ছেলেবউটা কী করার জন্য যেন নিচতলাতে আসছিল, এসে তাদের এভাবে দেখে মুচকি হেসে ওপরে চলে যায় ফিরে। ওপরে গিয়ে তার হাসির ফোয়ারা ছুটে যায়। সে হাসতেই থাকে। তার স্বামী তাকে হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করে। বউটা বলেÑ ‘দেখ গিয়ে নিচে, বুড়োবুড়ি গলা ধরে খোকাখুকির মতো কাঁদছে।’ আবার হাসির ফোয়ারা ছোটে। দুটো হাসির ফোয়ারা ছোটে।

ছেলেটা নিচে নেমে আসে মায়ের-বাপের ব্যাপার দেখার জন্য। তার মুখে-চোখে তুমুল হাসি। চেপে রাখা হাসি। হাসির বানে বাঁধ দিয়ে রেখে প্রশ্ন করেÑ ‘বাবা-মা তোমাদের কী হয়েছে? সামান্য এই পেপার ছেঁড়ার জন্য এমন করে কাঁদে?’ সে তার হাসি রুখে রাখতে পারে না, সারা মুখ দিয়ে চুয়ে চুয়ে পড়ে। মফিজুল হকের দৃষ্টি এড়ায় না বিষয়টা। সে ভেজা, ঝাপসা দৃষ্টিতে সামনে তাকায়, সে তাকেই দেখতে পায়Ñ এই তো সেই যৌবন, এই তো সেই তেজি শরীর, এই তো সেই রূপ। তার যৌবন, তার রূপ, তার তেজ তার কাছ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাকেই উপহাস করছে। মফিজুল হক প্রশ্নের উত্তর না করে তার পুত্রের দিকে ভাবলেশহীনের মতো তাকিয়েই আছে। এই ভাবলেশহীনভাব ভেঙে আবার তার যৌবন, তার রূপ বা তার ছেলে তাকে বলেÑ ‘বাদ দাও বাবা, ছোট বাচ্চারা বুঝতে পারেনি পেপারটা ছিঁড়ে ফেলেছে।’

পুত্র ওপরে যাবার সিঁড়ি ভাঙে খট খট খট খট শব্দ তুলে। মফিজুল হক দেখেÑ ‘তার যৌবন তাকে ছেড়ে, তাকে ছিঁড়ে সিঁড়ি ভেঙে চলে যাচ্ছে ওপরে। ওপরে একজন নতুন মায়েজা বেগম আছে। নতুন মফিজুল হক সেই মায়েজা বেগমের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে হাসিকলা করছে।

বৃদ্ধ মফিজুল হক বৃদ্ধা মায়েজা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলেÑ ‘চলো মায়েজা বেগম আমরা বাগানে হাঁটাহাঁটি করি।’

বিকেল পার হয়ে গেছে। সন্ধ্যার আকাশ শিশুর গালের মতো লাল। বাগানের মাটিতে তারা নামল। হাঁটাহাঁটি করল। খুব ভোরে মালী বাগানের আগাছাঘাস তুলে ছোট ছোট স্তূপ করে রেখেছে এক কোণে। মফিজুল হক ও মায়েজা বেগম হাঁটতে হাঁটতে এসে আগাছার স্তূপের ওপর বসে। তারা একে-অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসে। তাদের হাসির রঙ আগাছা ঘাসগুলোর শরীরে লাগতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার লাল সূর্য শিশুর মতো খট খট করে হাসছে। তারা সূর্যের দিকে তাকাল হাসতে হাসতে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে