রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা আত্মজৈবনিক ও সর্বজনীন

  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এই কবি ও তার কবিতার সঙ্গে আমার একই সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং সেটা তার আত্মপ্রকাশের কালেই। সেই সময়ে আমি ‘সাহিত্যপত্র’ নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করি। সম্পাদনার কাজটি ছিল আনন্দদায়ক। নতুন ও পুরনো লেখকের সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ ঘটত; সেটা ছিল এক ধরনের সামাজিকতা। ভেতরে একটা আমলাতান্ত্রিকতা যে সচল ছিল না তাই-বা কী করে বলি। লেখা আসে, বিবেচনার জন্য, অনেকটা দরখাস্তের মতো। বাতিলের, গ্রহণের, পরিমার্জনার ক্ষমতা রাখি, সেটা কম কিসে! আমলাতান্ত্রিকতা আমার পরিবেশের ভেতর ছিল, খানিকটা হয়তো আমার পিতার কাছ থেকেই পাওয়া। যিনি সরকারি কর্মচারী ছিলেন। রেজাউদ্দিন স্টালিন এসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কামরায়, কবিতা নিয়ে। সেই সাক্ষাৎকারে আমলাতান্ত্রিকতা হয়তো নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছিল, যে জন্য তার নামের বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে কৌতূহল প্রকাশ করেছিলাম। স্টালিন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সপ্রতিভভাবে বলেছিল নামটি তার মায়ের দেওয়া। বুঝলাম পারিবারিক পটভূমিতে রাজনীতিসচেতনতা রয়েছে। এরপর আমলাতন্ত্রের চৌকাঠটি পার হয়ে তার লেখায় চোখ বুলিয়েই টের পেয়েছি আমার সামনে নতুন এক কবি উপস্থিত, যে লিখবে এবং লিখবে নিজের মতোন করে। ওর কবিতা পত্রিকার পরের সংখ্যাতেই ছাপা হয়েছিল। তারপর ওই পত্রিকায় তো বটেই, আমার সম্পাদিত অন্য পত্রিকাতেও ওর লেখা প্রকাশ করতে পেরে খুশি হয়েছি। খুশি হয়েছেন পাঠকও। সেটা আমি জানি। ওই বয়সে অনেকেই কবিতা লেখে, কাব্যযশোপ্রার্থী হয়, কিন্তু টিকে থাকে না। রেজাউদ্দিন স্টালিন লেগে থেকেছে এবং তার কবিতা অচিরেই পাঠকগ্রাহ্য হয়েছে। স্টালিনের কবিতার প্রথম পাঠে যে মৌলিকত্বের দেখা পেয়েছিলাম, তা আরও বিকশিত হয়েছে। আত্মপ্রকাশের কালে যে নিজস্বতা ছিল তা কখনই মলিন হয়নি, বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতায় অনুভূতি আছে। সেটা তো থাকতেই হবে, অনুভূতি ছাড়া কে কবে কবিতা লিখেছেন। কিন্তু দেখতে পাই যে ওর অনুভূতি বক্তব্য হয়ে ওঠে। বলার প্রয়োজন পড়ে না, তবু স্মরণে রাখার জন্য বলতে হয় যে বক্তব্য আর কবিতা এক নয়। বক্তব্য কবিতার রূপ নেয় যদি তাতে নান্দনিকতা থাকে তবেই। শব্দ, শব্দের অর্থ, তার ধ্বনি, অনুষঙ্গ, উৎপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপকল্প সবকিছুই জরুরি। তবে সবকিছুই আসে বক্তব্যের প্রয়োজনেই। বক্তব্যই আঙ্গিক তৈরি করে নেয়, উল্টোটা ঘটে না; তাই বলে আঙ্গিক ও বক্তব্য যে পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকে এমনটা মোটেই নয়, তারা অভিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য বটে, ব্যবচ্ছেদ ঘটাতে গেলে কবিতার মৃত্যু ঘটে।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের জগৎটা আমাদের পরিচিত তার সীমানাটা আমরা জানি। কিন্তু ওই সীমানাটা এই কবি মানে না। নিজের শক্তিতে তাকে সে প্রসারিত করে নেয়। এবং একই সঙ্গে গভীরতাও সৃষ্টি করে। দেখার দৃষ্টি, অনুভবের শক্তি, কল্পনার ক্ষমতা, ভাবনার বৈশিষ্ট্য এবং উপস্থাপনার অনুশীলিত দক্ষতায় পরিচিত বিষয়গুলো নতুন হয়ে ওঠে। ওর কবিতায় স্থান আছে, রয়েছে বৃষ্টিভরা আকাশ, আছে আকাশ ও পৃথিবীর জানাজানি, রয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। সব মিলিয়ে একটা নিজস্ব ও ভিন্ন রকমের জগৎ। স্টালিনের কবিতা এই সঙ্গে আত্মজৈবনিক ও সর্বজনীন। ভালো কবিতায় দুটি উপাদান বেশ ভালোভাবে থাকে। একটি গদ্য, অন্যটি নাটকীয়তা। গদ্য আসে যুক্তির আকারে, লুকিয়ে থাকে সে বক্তব্যের পারম্পর্বের ভেতরে। রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতায় গদ্য আছে। তার কবিতায় শৃঙ্খলা কেবল ছন্দ ও ছন্দস্পন্দের নয়, সেই সঙ্গে যুক্তিরও। আছে নাটকীয়তাও। সব সফল শিল্পকর্মে ওই নাটকীয়তাটা থাকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে। নাটকীয়তা তৈরি হয় দ্বন্দ্ব থেকে। দ্বন্দ্ব বিষয়ের সঙ্গে আঙ্গিকের, বক্তব্যের এপক্ষের সঙ্গে ওপক্ষের। স্টালিনের কবিতার প্রাণবন্ততা ও প্রবহমানতা ওই দ্বান্দ্বিক নাটকীয়তার ফলে খুব স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়ে যায়। আমরা আকৃষ্ট হই। অনেক সময়েই মনে হয় সে একটি গল্প বলছে, আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠি পরিণতিটা জানার জন্য। গন্তব্যে পৌঁছে দেখি সেখানে অভিনবত্ব আছে, যেমন রয়েছে স্বাভাবিকতা।

বাংলা ভাষায় ক্রিয়াপদ নিয়ে সমস্যা আছে। স্টালিনের কবিতায় ক্রিয়ার ব্যবহার স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক। কবিতা পঙ্ক্তিতে সবল ক্রিয়ার উপস্থিতি বক্তব্যকে সজীব করে তোলে। উপস্থাপনায় পৌরুষের পরিচয় দেখি, কোথাও কোথাও পুরুষতান্ত্রিকতার প্রকাশও অনিবার্যভাবেই ঘটেছে। বিশেষণের সতর্ক অথচ মৌলিক প্রয়োগে বিশেষ্যগুলো আকর্ষক হয়ে ওঠে। কবিতায় রূপক থাকে, থাকতেই হয়; স্টালিনের কবিতাতেও আছে। তার ব্যবহৃত রূপকগুলো আমাদের ভাবিত ও উদ্বেলিত করে। দেশি-বিদেশি বহু মিথ সে ব্যবহার করেছে; সেগুলোও নতুন হয়ে উঠেছে। স্টালিন কোথাও আড়ষ্ট নয়। কিন্তু সর্বদাই অনুভব করি যে তার স্বতঃস্ফূর্ততা ও সাবলীলতার ভেতরে সংযমের অদৃশ্য বিধান কাজ করছে।

তার সব কবিতাই সুখপাঠ্য এবং একটি অন্যটির মতো নয়। আবার সফল রচনাই নির্ভুলরূপে নিজস্ব। স্টালিনের আছে দেখার ও গ্রহণ করার ক্ষমতা। তার ঘরের দরজা-জানালা খোলা, সামনে আছে উন্মুক্ত প্রান্তর, রয়েছে দেশের ও বিশ্বের ইতিহাস। তবে পথচলাটা তার নিজস্ব। একটি কবিতায়, নাম যার ‘পথের নির্বাচন’ স্টালিন নিজের পথচলার কথাটা বলেছে। তিনটি পথ ছিল সামনে, একটি স্বর্গের, অন্যটি নরকের। এ দুটির কোনোটিই তার কাছে গ্রাহ্য হয়নি। উভয়কে প্রত্যাখ্যান করে তৃতীয় পথটি সে বেছে নিয়েছে। পথ তাকে বলছেÑ

এ পথে আপনি স্বাধীন;

আপনার সবকিছু আপনি স্বেচ্ছায় নির্বাচন করুন।

কোনো পথপ্রদর্শক নেই। আপনিই আপনার নিয়ন্তা;

এগোনোর কিংবা ফেরার দায়িত্ব আপনার নিজের।

এই কবি স্বাধীন এবং স্বনিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রণটা শিল্পের। সে এগোয়, পথ ভোলে না এবং অন্যদের ডাকে নিজ নিজ পথ খুঁজে নেওয়ার জন্য। গন্তব্যটা হচ্ছে সমৃদ্ধ ও সুন্দর জীবন; এই যাত্রা অভিযাত্রিক কিন্তু তাই বলে যে অনিকেত তা নয়, এবং গন্তব্যে পৌঁছার চেয়েও মূল্যবান হচ্ছে পথচলা ও পথচাওয়া, স্থির গন্তব্য যে রয়েছে এমন নিশ্চয়তাই বা কে দেবে।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতার অনেক কিছুই আমার ভালো লাগে, বিশেষভাবে ভালো লাগে পরাভূত হতে অসম্মতির প্রকাশ। তার এ জিনিসটা মোটেই আরোপিত নয়, এটা এসেছে একেবারে ভেতর থেকেই। সে শ্রমশীল ও আশাবাদী, সে দুঃখকে স্বীকার করে, কিন্তু হতাশ হয় না। এই দৃঢ়তা নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার রচনাকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তার পথচলা অব্যাহত থাকুক, এটা বিশেষভাবে কামনা করি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে