sara

আমাদের আনোয়ার ভাই

  নুরুল করিম নাসিম

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফেসবুকের কল্যাণে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চিত্রগ্রাহক ও আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু সংবাদ পেলাম একটু দেরিতে। খবরটা যোগাযোগমাধ্যমে জানালেন আনোয়ার হোসেনের এক ঘনিষ্ঠজন শর্টফিল্ম আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ঢাকার সন্তান হাশেম সুফী। হাশেম সুফীর মাধ্যমে ১৯৬৯-এর উন্মাতাল দিনগুলোতে শর্টফিল্ম আন্দোলন করতে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয়। তখন সবেমাত্র তিনি ১৯৬৭ সালে ২ ডলারে কেনা প্রথম ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা শুরু করেছেন। স্থিরচিত্রে ছিল তার অপার আগ্রহ। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে চলচ্চিত্রেও তিনি ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন। সূর্যদীর্ঘল বাড়ী, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, লালসালু, অন্য জীবন ছবিগুলোর তিনি আলোকচিত্রী হিসেবে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন; দেশের মানুষ, দেশের প্রকৃতি তার অসাধারণ সব ছবিতে বাক্সময় হয়ে উঠেছে। তার ছবি কথা বলত, তিনি ছিলেন ক্যামেরার কবি।

জন্ম ১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার আগা নওয়াব দেউড়িতে। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। বাবা সিনেমা অফিসে চাকরি করতেন। তখন থেকে তিনি ছবি দেখতে শুরু করেন এবং চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ গড়ে ওঠে।

ছেলেবেলা থেকে আঁকাআঁকি ও রঙের প্রতি ঝোঁক ছিল, কিন্তু তিনি অংকনশিল্পী হননি। বুয়েটে স্থাপত্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু তাতে মন বসাতে পারেননি। চলে গেলেন ভারতের পুনেতে ফটোগ্রাফি শিখতে ২০১৬ সালের মে মাসে তিনি জেডএইচ শিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফটোগ্রাফির ওপর একটি সেমিনারে এসেছিলেন। সেদিন আনোয়ার ভাই তার বক্তব্যের পরিপূরক হিসেবে কিছু ‘সøাইড’ দেখিয়েছিলেন তরুণ দর্শকদের। দীর্ঘ এই সেমিনারে এতসব প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল, বক্তব্যের এত শাখা-প্রশাখা উঠে এসেছিল, বক্তব্যের এত শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছিল, এত প্রাণবন্ত তর্ক-বিতর্ক জমে উঠেছিল, আমরা পরবর্তী কোনো আলোচনা অনুষ্ঠানে এ বিষয়টি নিয়ে আরেকটি সেমিনার আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিলম্বিত সন্ধ্যায় সত্যজিত রায়ের ‘মহানগর’ ছবিটি প্রদর্শন করলাম। ছবি শুরু হওয়ার আগে খুব সংক্ষিপ্ত স্বাগত ভাষণ দিতে হলো। সেই অনুষ্ঠানে, মনে পড়ে আনোয়ার ভাইকে আমরা ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা দেখিয়েছিলাম। তার পরও অনেকবার দেখা হয়েছে। তিনি পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকার চলচ্চিত্রের ফটোগ্রাফি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রথমে ছিলেন স্টিল ফটোগ্রাফার, পরে রূপান্তরিত হলেন চিত্রগ্রাহকে। পাশাপাশি ডকুমেন্টারি ছবিও তৈরি করেছেন। সেসব জীবনের শুরুর কাহিনি। শর্টফিল্মও তার অপার আগ্রহ ছিল। আবু ইসহাকের সূর্যদীঘল বাড়ীর ফটোগ্রাফির সময়ে তিনি অভিনয় ব্যক্তিত্ব ডলি ইব্রাহিম (পরে ডলি আনোয়ার) বিয়ে করেন। যে কারণেই হোক বিয়ে টেকেনি। সুফী ভাইয়ের কাছে শুনেছি, তিনি ফ্রান্সে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করেন। মাঝে মধ্যে দেশেও আসতেন। দেশ তাকে ভীষণভাবে টানত। তিনি সেখানে ফরাসি নারীকে বিয়ে করেন এবং তার স্ত্রী-সন্তানরা ফ্রান্সে বসবাস করেন। দীর্ঘ ২০ বছর আলোকচিত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে মাত্র ২ ডলার দিয়ে কেনা প্রথম ক্যামেরা দিয়ে তার আলোকচিত্রী জীবনের শুরু। তিনি তার অসামান্য অবদানের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর কার্তিকপুর জেডএইচ শিকদার বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে তিনি এখানকার নয়নাভিরাম পারিপার্শ্বিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। তার ক্যামেরামুখরও বাক্সময় হয়ে ওঠে। তিনি ছাত্রছাত্রীদের তাদের সেলফোন অথবা ক্যামেরায় ছবি তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন। তা ওয়াশ করে আমাদের কাছে তিনি জমা দিতে বলেন। তিনি চলে যান জেলা শহর শরীয়তপুরে। ঠিক সাত-আট দিন পর আনোয়ার ভাই আবার ফিরে আসেন কার্তিকপুরে। এরই মধ্যে তুমুল উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভেতর। ক্যামেরা নিয়ে বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আনোয়ার ভাই, আর হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তাকে অনুসরণ করছে একদল সাহসী ছাত্রছাত্রী। গ্রামবাংলায় এ রকম এর আগে কখনো দেখা যায়নি। কার্তিকপুর মূলত অজপাড়াগাঁ। তেমন কোনো বিল্ডিং চোখে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল ব্যাংকের দুটো শাখা ছাড়া আর কিছু নেই। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে, তখন দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে কেনাকাটা করতে। আনোয়ার ভাই জনপদের এসব ছবি তুললেন অপার আগ্রহ ও ভালোবাসা নিয়ে। পালপাড়া, ঠাকুরবাড়ি, ফকিরবাড়ি, চিশতিনগর এবং অসংখ্য মাজারের ছবি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও প্রেক্ষাপট বা চঊজঝচঊঈঞওঠঊ থেকে তুললেন এবং ছাত্রছাত্রীদের হাতে-কলমে শেখাতে লাগলেন। প্রকৃতি ও বনভূমি যেন তার ক্লাসরুম। পালপাড়ায় কুটির শিল্প কীভাবে গড়ে উঠেছে, মাটির পুতুল ও তৈজষপত্রের ছবি তুললেন অনেক সময় নিয়ে। সেখানেও আমাদের ছাত্রছাত্রীরা তাকে সঙ্গ দিল। কী এক নেশায় মেতে উঠেছে ছাত্রছাত্রীরা যেন। ওদের নিয়ে একটি ফটোগ্রাফি সংগঠন গড়ে দিলেন। ফটোগ্রাফির প্রতি এ রকম ভালোবাসা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। দুপুরে লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হলো, কিন্তু তিনি তেমন একটা কিছু খেলেন না। তিনি বললেন, তার হৃদরোগ আছে। তাকে হিসাব করে চলতে হয়। ছবি তোলার সময় এমন নিমগ্নতা তাকে পেয়ে বসত তিনি খাওয়া-দাওয়া সবকিছু ভুলে যেতেন।

আগেই বলেছি, আনোয়ার ভাই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, সেসব ছবিও তিনি দেখালেন। তবে তার আসল জায়গা ছিল স্টিল ফটোগ্রাফিÑ স্থিরচিত্র। জীবনের শেষ দিনগুলোয় তিনি সেখানেই ফিরে এসেছিলেন। চলচ্চিত্র ফটোগ্রাফির দীর্ঘ ধকল তার সইত না। তিনি সময় নিয়ে, নিজের মতো করে ছবি তুলতে ভালোবাসতেন। সেটাই ছিল তার আপন ভুবন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে