sara

কবি ও সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু

  রিয়া চক্রবর্তী

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে কবি বুদ্ধদেব বসু অতিপরিচিত নাম। ১৯০৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের পরেই মায়ের মৃত্যু হয়। ছোট্ট বুদ্ধদেব বসু প্রতিপালিত হন তার দাদু, দিদিমার কাছে। তার দাদু চিন্তাহরণ সিংহ ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত। তিনি তার নাতির পড়ালেখার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই বুদ্ধদেব বসু বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা অত্যন্ত ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তার বন্ধু হয়েছিলেন অজিত দত্ত, প্রভু গুহঠাকুরতা, সুধীশ ঘটক, ভবোতোষ দত্ত, ভৃগু গুহঠাকুরতা, প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো উজ্জ্বল ছাত্ররা। বুদ্ধদেব বসুর লেখালেখির চর্চা স্কুলজীবন থেকেই শুরু। পনেরো বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ করেছেন হাতে লেখা পত্রিকা ‘পতাকা’ ও ‘ক্ষণিকা’। ষোলো বছর বয়সে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মর্মবাণী’ প্রকাশিত হয়েছিল।

আধুনিক বাংলা ইতিহাসে ১৯২৭ সালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরই জীবনানন্দ দাশের প্রথম কবিতার বই ‘ঝরাপালক’ প্রকাশিত হয়েছিল। আবার এই বছরই প্রকাশিত হয়েছিল বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রগতি’। বুদ্ধদেব বসু ছাড়াও প্রগতির আরেক সম্পাদক ছিলেন কবি অজিতকুমার দত্ত। ১৯৩৫ সালের অক্টোবরে বুদ্ধদেব বসু প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহযোগিতায় সাহিত্যপত্রিকা ‘কবিতা’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকার হাত ধরেই সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে কবি জীবনানন্দ দাশের যোগসূত্র স্থাপিত হয়। ‘প্রগতি’র প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যায় ১৩৩৪ সালে শ্রাবণ মাসে জীবনানন্দের ‘খুশ-রোজী’ কবিতাটি ছাপা হয়। জীবনানন্দের প্রথম গ্রন্থ ‘ঝরা পালক’র ৩৫টি কবিতার মধ্যে একটি প্রগতিতে প্রকাশিত হয়েছিল। এ পত্রিকাটিতে বুদ্ধদেব বসু সযতেœ জীবনানন্দ দাশের কবিতা ছাপতেন। কবি জীবনানন্দ দাশ গবেষক ক্লিনটন বি সিলি জানিয়েছেন, ‘প্রগতি কেবল জীবনানন্দ দাশের কবিতা ছাপেনি, বুদ্ধদেব নিজে দায়িত্ব নিয়েছিলেন জীবনানন্দের ওপর দুটি সম্পাদকীয় লেখার, যা ছিল তার ওপর লেখা প্রথম আলোচনা।’

এ বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট হয়, বুদ্ধদেব বসু ছিলেন প্রথম সুহৃদ, যিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রথম আলোচনা করেছিলেন। জীবনানন্দের প্রতি বুদ্ধদেবের এ মনোভাব আমৃত্যু ছিল। ১৯২৭ সালের জুলাই মাস থেকে প্রকাশিত প্রগতি নানা কারণে ১৯২৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বাঙালি সাহিত্যিক ও পাঠকদের চিন্তার বিকাশে মানসম্মত একটি সাহিত্য পত্রিকা করার ইচ্ছে বুদ্ধদেব বসুর মনে-মগজে গেঁথে ছিল। ‘কবিতা’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সে ইচ্ছের কেবল প্রতিফলনই হলো না, তার ইচ্ছে সফলভাবে বাস্তবায়িতও হয়েছিল। ১৯৬০ সালে কবিতা পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এর ১০৪টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রকাশনার দীর্ঘ ২৫ বছর এ সাহিত্যপত্রটি বাঙালি সাহিত্যিক ও পাঠকের কাছে পরম মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছিল। কেননা বুদ্ধদেব বসু লেখা নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রকাশনা পর্যন্ত দরদ দিয়ে সম্পাদনা করতেন। বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ এ সাহিত্যপত্রের বিভিন্ন সংখ্যায় সে সময়ের প্রখ্যাত সব লেখকই ‘কবিতা’য় লিখতেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদক হিসেবে কবিতায় ‘প্রকাশযোগ্য’ কবিতা ছাপতে চাইতেন না। তিনি চাইতেন ‘ভালো’ কবিতা। ১৯৫৫ সালের ৫ জানুয়ারি শামসুর রাহমানের কাছে লেখা এক পত্রে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ‘প্রকাশযোগ্য কবিতা ছাপাতে চাই না, ভালো কবিতা চাই।’

তিনি যখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র তখনই ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতা ‘যৌবন পথিক’। সময়টা ছিল হাতে লেখা ‘প্রগতি’ পত্রিকার প্রকাশের সময়। কলেজের প্রথম পরীক্ষায় স্কলারশিপের টাকায় তিনি ‘প্রগতি’ পত্রিকার মুদ্রিত রূপ প্রকাশ করেছিলেন। এই পত্রিকায় জীবনানন্দ দাশ ছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বিষ্ণু দে, অজিত দত্তের মতো বিখ্যাত কবিরা কবিতা লিখেছেন। ১৯৩০ সালে ‘বাণী বন্দনা’ পত্রিকায় আমরা অন্য এক বুদ্ধদেব বসুকে পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ থেকে সরে এসে আধুনিক রোমান্টিক কবিতাকে আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছি। যদিও বাংলা কবিতায় রোমান্টিকতার উৎস মুখ খুলে গিয়েছিল কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতার প্রয়াসে। তার পর রবীন্দ্রনাথের কলম ও ভাষার যুগলবন্দি কবিতাকে নিয়ে গিয়েছিল রোমান্টিকতার শীর্ষে। কিশোর বুদ্ধদেব বসু যে কী ভীষণ রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মুগ্ধ ছিলেন, তার সেই সময়কার কবিতায় পর্যন্ত রাবীন্দ্রিক প্রভাব লক্ষ করা যায়। তার ‘মর্মবাণী’ বইয়ের ‘জীবন দেবতা’ নামক কবিতায় লিখলেনÑ

‘হে মোর জীবন দেবতা,

আমার পরাণে নিভৃত গোপনে

কি এনেছো তুমি বারতা?’

আবার ওই বইয়ের ‘তৃপ্তি’ কবিতায় তিনি লিখেছেনÑ

‘যাহা কিছু তুমি দিয়েছ হে মোরে

সেই ভালো মোর সেই ভালো,

বন্ধ রেখেছ আঁধারের ঘোরে,

সেই আলো মোর সেই আলো।’

এসব কবিতাকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিধ্বনি বলাই যায়। কিন্তু ‘বাণী বন্দনায়’ আমরা পেলাম একেবারে স্বতন্ত্র এক রোমান্টিক বুদ্ধদেব বসুকে। যার রোমান্টিক উচ্চারণ কবিতাকে দিলেন এক নতুন চলার পথ। রোমান্টিকতার সঙ্গে সঙ্গে তার তীর্যক ভাষার অঙ্কনে তিনি তৈরি করলেন তার নিজস্বতা, নতুন এক মূর্তি। যা ছিল মন্দ্র, মধুর, গভীর, শানিত অথচ প্রশান্ত, স্নিগ্ধ আর রাবীন্দ্রিক উচ্চারণ থেকে অনেকটাই আলাদা।

এবার আসি কবির অনুবাদ কবিতার কথায়। ১৭৯৮ সালে দুজন কবি মিলে কাব্যগ্রন্থ রচনা করলেন, তার নাম দিলেন খুৎরপধষ ইধষষধফং. আর সেই কবিদ্বয় হলেন ডরষষরধস ডড়ৎফংড়িৎঃয আর ঝধসঁবষ ঞধুষড়ৎ ঈড়ষবৎরফমব. কাব্যগ্রন্থটি ১৭৯৮ সালে প্রকাশিত হলেও ১৮০০ সালে দ্বিতীয় সংস্করণে একটি ভূমিকা সংযোজিত হয়েছিল। পরে ১৮০৫ থেকে ১৮১৫-এর মধ্যে সেটি পরিমার্জিত হয় এবং কবি ডড়ৎফংড়িৎঃয যে ভূমিকা লিখেছিলেন, তিনি সেখানে ঘোষণা করলেনÑ ‘চড়বঃৎু রং ঃযব ংঢ়ড়হঃধহবড়ঁং ড়াবৎভষড়ি ড়ভ ঢ়ড়বিৎভঁষ ভববষরহমং: রঃ ঃধশবং রঃং ড়ৎরমরহ ভৎড়স বসড়ঃরড়হ ৎবপড়ষষবপঃবফ রহ ঃৎধহয়ঁরষরঃু.’

কিন্তু পাশ্চাত্য সাহিত্যের এই ধারাবাহিকতায় এক ধরনের বাঁক বদল ঘটিয়েছেন ফরাসি কবি ংযধৎষ নড়ফষবৎ. তার লেখা ১৮৫৭ সালে খধ ঋষবঁৎং ফঁ গধষ নামে যে কাব্যগ্রন্থ, সেখানে তিনি অবলম্বন করেছিলেন মনের ভেতরে পুঞ্জীভূত ক্ষত ও যন্ত্রণার মেঘ। আর ছিল একটা কালো রোমান্টিকতার ধারা। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বোদলেয়ারকে পছন্দ করতে পারেননি। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্র অনুরাগী হয়েও বোদলেয়ারের কবিতার টানে বহু কবিতা অনুবাদ করেছেন। সেসব কবিতা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাঙালি কবিদের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল। এক অনুবাদ কবিতাÑ

‘বলো আমাকে রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি/সবচেয়ে ভালোবাসো?/তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীকে?/পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীÑ কিছুই নেই আমার।/তোমার বন্ধুরা?/ঐ শব্দের অর্থ আমি কখনই জানিনি।/তোমার দেশ?/জানি না কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান।/সৌন্দর্য?/পারতাম বটে তাকে ভালোবাসতেÑ দেবী তিনি অমরা।/কাঞ্চন?/ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো/ঈশ্বরকে।/বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালোবাসো তুমি?/আমি ভালোবাসি মেঘ, ... চলিষ্ণু মেঘ/উঁচুতে... ঐ উঁচুতে.../আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল।’

কবি কল্পনায় নারী বা প্রেমিকাকে এক বিশেষ নামে এক একজন কবি তাদের কবিতায় প্রকাশ করেছেন। সেই সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একটি নামের বন্ধনে কবির প্রেমিকা বা নারীকে অভিহিত করেছেন বা করেন। তেমনই এক নাম ‘বনলতা সেন’, জীবনানন্দ দাশ তার বহু কবিতায় এই নাম ব্যবহার করেছেন। কবি বুদ্ধদেব বসুর এ রকম এক কল্পিত নারীর নাম ‘কঙ্কা বা কঙ্কাবতী’।

‘পৃথিবীর শেষ সীমা যেইখানে, চারদিকে খালি আকাশ ফাঁকা,

আকাশের মুখে ঘুরে-ঘুরে যায় হাজার-হাজার তারার চাকা,

যোজনের পর হাজার যোজন বিশাল আঁধারে পৃথিবী ঢাকা।

(তোমার চুলের মতো ঘন কালো অন্ধকার,

তোমারি আঁখির তারকার মতো অন্ধকার;

তবু চলে এসো; মোর হাতে হাত দাও তোমারÑ

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না।)’

১৯৩৭ সালে তিনি ‘কঙ্কাবতী’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া তার লেখায় আমরা আরও কয়েকটি নারীর নাম পাই, যেমনÑ অমিতা, রমা এবং অপর্ণা। আরও কোনো কোনো নাম তার কবিতায় মাঝেমধ্যে উচ্চারিত হয়েছে। এসব নারী বাস্তবে তার পরিচিত, তার ভালোবাসাজন। আর এখানেই কবি বুদ্ধদেব বসুর অভিনবত্ব। যা নিতান্তই সাংসারিক, তাকে তিনি আকর্ষণ করে নেন কবিতার রোমান্টিক কল্পনার বৃত্তে। সেখানেই সেই অতি পরিচিতরা আকাশের নক্ষত্রের মতো জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। আবার কখনো হয়ে ওঠে কুয়াশা মাখানো ধূসর!

তার রচিত ‘চিল্কায় সকাল’ কবিতাটি পুরোপুরি এক রোমান্টিক কবিতা। আবার অন্য ধরনের ভাষাতেও রূপের আশ্চর্য এক মূর্ততাকে তিনি যখন অবয়ব দান করেন, তৈরি হয় এক স্ফটিক ভাস্কর্য! কবি বুদ্ধদেব বসুর কবিমানসের গঠনে এক ধ্রুপদী উপাখ্যানের নতুন পুষ্প প্রস্ফুটিত হয়েছে। সেইসঙ্গে আধুনিক মনের দ্বিধাদীর্ণতা, আত্মক্ষয়ী, বিপন্ন বিস্ময় ছাড়াও তীর্যক শানিত এক আত্মাধিকারও অনুভব করা যায়। একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তার সৃষ্ট কবিতাগুলোর মধ্যে প্রিয়তম কবিতা বেছে নিতে। তিনি তার ‘ইলিশ’ কবিতাটি নির্বাচন করেছিলেন।

‘ছোটে নৌকাগুলি; প্রাণপণে ফেলে জাল, টানে দড়ি

অর্ধনগ্ন যারা, তারা খাদ্যহীন, খাদ্যের সম্বল।

রাত্রি শেষে গোয়ালন্দে অন্ধ কালো মালগাড়ি ভরে

জলের উজ্জ্বল শস্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব,

নদীর নিবিড়তম উল্লাসে মৃত্যুর পাহাড়।

তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে ঘরে

ইলিশ ভাজার গন্ধ; কেরানীর গিন্নির ভাঁড়ার

সরস শর্ষের ঝাঁজে। এলো বর্ষা, ইলিশ-উৎসব।’

কবি বুদ্ধদেব বসু পেরেছিলেন বিশ শতকের আধুনিকতার সর্বমাত্রিকতাকে তার সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে মূর্ত করতে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে