sara

প্রেমভাগ্য

  অনুরূপ আইচ

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি আবাসিক এলাকার লেকপাড়ের রাস্তা। রাস্তার বামপাশে একটি গাছের নিচে ফুটপাতে সোলায়মানের চায়ের দোকান। তার দোকানের আশপাশে আর কোনো চায়ের দোকান নেই। দশ হাত দূরে একই ফুটপাতে বসে আঙ্গটি-পাথর বিক্রি করে পঞ্চাশোর্ধ্ব জ্যোতিষী বিল্লাল। বিল্লালের সঙ্গে সোলায়মানের খাতির ভালো। বিল্লালকে প্রতিদিন দুয়েক কাপ চা ফ্রি খাওয়ায় সোলায়মান। যে কারণে সোলায়মানও একটা পাথরের আংটি ফ্রি দিয়েছে সোলায়মানকেÑ যাতে সোলায়মান যাকে মনে মনে ভালোবাসে তার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে হয়। একই কারণে প্রতিদিন সোলায়মানের হাতের রেখা দেখেও ভবিষ্যৎবাণী করে বিল্লাল। সোলায়মানের ধারণা, বিল্লাল জ্যোতিষী হিসেবে ভালো, তার কথাও মিলে সোলায়মানের জীবনে।

সোলায়মানের চায়ের দোকানের উল্টোদিকের ফুটপাতে ঝালমুড়ি বিক্রি করে আক্কাস। আক্কাস ও সোলায়মান সমবয়সী। তবে কেন জানি আক্কাসকে পছন্দ করে না সোলায়মান। তারা বেচাবিক্রির ফাঁকে ফাঁকে দুজন দুজনকে টিপ্পনি কেটে কথা বলে। এর একটা কারণও রয়েছে। তারা দুজনে মনে মনে একটা মেয়েকেই ভালোবাসে। কিন্তু মেয়ের মাকে ভয় পেয়ে তারা কেউ মুখ খুলে কথাটা বলতেও পারে না মেয়েটাকে। এরা আবার প্রত্যেকে থাকেও একই বস্তিতে।

মেয়েটির নাম জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্না তার মা জাহানারার সঙ্গেই রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করে সিটি করপোরেশনের অধীনে। প্রতিদিন সকালে মায়ের সঙ্গে কাজে যোগ দিয়ে কাজ শেষ করে মায়ের সঙ্গে বস্তিতে ফিরে যায় জ্যোৎস্না। সে দেখতে একটু সুন্দর বলে তার মা জাহানারা সব সময় মেয়েকে চোখে চোখে রাখে, যাতে পিতৃহীন জ্যোৎস্না বিপথে চলে না যায়।

আক্কাস অনেকবার বস্তিতে জ্যোৎস্নাদের ঘরে গিয়ে জাহানারার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, নানাভাবে ফুসলানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু আক্কাসের অ্যাটিচুড মোটেও পছন্দ করেন না জাহানারা বেগম। আক্কাস যে ধান্দাবাজ টাইপের ছেলে, তা বোঝেন। অন্যদিকে সোলায়মানকে তার অনেক পছন্দÑ যদিও এটা তিনি বুঝতে দেন না কাউকে। তবে মাসিক টাকা দেওয়ার বিনিময়ে সোলায়মানকে তিনবেলা খাবার রান্না করে দেন জাহানারা। সেই খাবার জ্যোৎস্না দুবেলা দিয়ে যায় সোলায়মানের ঘরে এবং দুপুরে টিফিন বক্সে করে জাহানারা নিজেই দিয়ে যায় সোলায়মানের দোকানে।

তাই বস্তিতে সোলায়মান যে ঘরে থাকে সে ঘরে একটি মাদুর, একটি প্লাস্টিকের গ্লাস, একটি ভাঙা টিনের থালা ও একটি পানির জগ ছাড়া আর কিছুই নেই। সোলায়মানের বাবা-মাও বেঁচে নেই। ভাইবোনও নেই। এ বিষয় নিয়েও জাহানারা ভাবেনÑ এমন চালচুলোহীন একটা ছেলের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দেবেন কী করে! কোনো রাখঢাক না রেখে একদিন এ কথাটা জাহানারা সরাসরি বলেই দিলেন সোলায়মানকে। এর পর থেকে সোলায়মানেরও সেই চিন্তা, নিজের ঘরে আসবাবপত্র জোগাড় করবে কী করে। যা আয় করে তা দিয়ে টেনেটুনে চলে। আর কিছু টাকা সঞ্চয় করে বিয়ে করবে বলে।

এ ঘটনা সোলায়মান খুলে বলে জ্যোতিষী বিল্লালের কাছে। তাকে অভয় দিয়ে বিল্লাল বলে, ৫০০ টাকা দিয়ে একটা আংটি কিনে নিতে। তা হলে শুভ ফল পাবে। কিন্তু পাঁচশ টাকা তো অনেক টাকা সোলায়মানের কাছে। এত টাকা এই মুহূর্তে তার কাছে নেই। কিন্তু আংটিটি আজকে কেনাই দরকার সোলায়মানের। কারণ সে বিল্লালকে বড় জ্যোতিষী মনে করে। তার ধারণা, এর আগে বিল্লাল তাকে একটি আংটি উপহার দিয়েছে বলেই এখন জ্যোৎস্নার সঙ্গে বিয়ের কথা এগোচ্ছে।

যাহোক পরে বিল্লালের কাছে দরকষাকষি করে ৩৫০ টাকায় আংটিটি কিনে নেয় সোলায়মান। পরদিন থেকে সোলায়মানের জীবনে নতুন মোড় নেয়। সে প্রতিদিন ভোরে দোকান খুলতে গিয়ে ভাঙা চেয়ার-টেবিল, আলনা, আলমিরা ও ভাঙা খাট পায় তার দোকানের পাশে গাছের তলে। এগুলো কে রেখে যায়, কেউ জানে না।

দিনের পর দিন একটানা এমন ঘটনা ঘটে আর সোলায়মান অবাক হয়। প্রতিদিন সে সকাল থেকে রাত অবধি খেয়াল করে গাছতলে ফেলে রেখে যাওয়া এই জিনিসগুলো কেউ নিতে আসে কিনা। কিন্তু না, রাত ১২টা বাজলেও কেউ তা নিতে আসে না। তখন জ্যোতিষী বিল্লাল প্রতি রাতে ফুটপাতে নিজের চেম্বার বন্ধ করার সময় সোলায়মানকে বলে যায়, আজকে এটা তোর বাসায় নিয়ে যাস। আল্লাহ তোকে দিচ্ছে ঘর সাজাতে। আমার দেওয়া পাথরে তোর কাজ হচ্ছে। এবার আর তোর বিয়ে ঠেকবে না।

এই করতে করতে বস্তিতে সোলায়মানের ঘর মোটামুটি সজ্জিত হয়ে গেছে আসবাবপত্রে। ঘরে এখন টেবিল-চেয়ার আছে। আলনা আছে। আলমারি রয়েছে। বাকি ছিল একটি খাট। তাও আজ সে পেয়ে গেছে একটা বেডসহ। আজ রাতে সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে, সত্যি বিল্লালের পাথরে তার ভাগ্য খুলছে। কাল সে জাহানারা বেগমের কাছে বলবে, জ্যোৎস্নাকে বিয়ে করতে সে প্রস্তুত।

কিন্তু বিধি বাম সোলায়মানের। বিয়ের আলাপ চূড়ান্ত হয়েও ভেঙে যেতে বসেছে। কারণ বাপ-মাছাড়া ছেলেকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে না জাহানারা বেগম। উনাকে বস্তির অন্যরা বুঝিয়েছে, তোমার মেয়ে দেখতে এত সুন্দর। তোমাদের গ্রামে একটা বাড়ি আছে। তোমার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি না থাক, অন্তত শ্বশুর-শাশুড়ির আদর পাবে নাÑ এমন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিয়ের পর ছেলে যদি মেয়েকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় অন্য কোথাও তখন কার কাছে জবাবদিহি চাইবে জাহানারা!

যে রাতে জাহানারা বেগম এই কথাগুলো বলেছে সোলায়মানকে সে রাতে সে খাওয়া-দাওয়া করেনি দুশ্চিন্তায়। এখন সে বাবা-মা কোথায় পাবে! সারারাত সে আল্লাহকে ডেকে বলে, আল্লাহ... আমাকে সব দিলেন। এবার আমাকে বাবা-মা জোগাড় করে দিন প্লিজ। নইলে আমার স্বপ্নÑ আমার বিয়ে ভেঙে যাবে।

রাতভর সোলায়মান আল্লাহর কাছে ইবাদত করতে থাকে।

পরদিন দোকানদারি করতে গিয়েও কাজে মন বসছে না। তার দিকে তাকিয়ে শুধু বাঁকা হাসি হাসে আক্কাস। এতে করে সোলায়মানের মনে হয়, এই প্যাঁচ খেলেছে আক্কাস। তবুও সে মুখ ফুটে কিছু বলে না আক্কাসকে। সে শুধু ব্যাপারটি বিল্লালকে খুলে বলেছে। বিল্লাল আশ্বাস দিয়ে বলে, সোলায়মান... চিন্তা করিস না। আল্লাহ যখন তোর ঘরে সব জিনিস জোগাড় করে দিয়েছে। নিশ্চয় তোকে বাবা-মাও জোগাড় করে দেবেনÑ আমার পাথর বিফলে যাবে না তোর জীবনে।

ওইদিন এক বুড়া ও বুড়ি সোলায়মানের দোকানের একটু দূরে বসেছিলেন সন্ধ্যা থেকে। তাদের বুকে জড়ানো একটি পোঁটলা। সোলায়মান তাদের খেয়াল করলেও যেচে কথা বলেনি। কিন্তু রাতে আক্কাস, বিল্লাল ঘরে ফিরে গেলে সোলায়মানও ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখন সে দেখতে পায়, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ফুটপাতের ওই জায়গায়ই বসে আছেন বুড়া-বুড়ি। তারা কোনো কথা বলছেন না পরস্পর। তাদের নিথর দৃষ্টি সম্মুখপানে।

দোকান বন্ধ করে ঘরে ফেরার সমপ্য রাতের বেলা সোলায়মান এই বুড়া-বুড়ির কাছে যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে, তাদের ছেলের ফ্ল্যাট পাশের বিল্ডিংয়ে। তার ছেলে বিদেশে থাকে। এই ফ্ল্যাটে ছেলের বউ-বাচ্চারা থাকে। ছেলের বউ পুরনো জিনিস বিদায় করে নতুন আসবাব কিনবে বলে একে একে তাদের সব আসবাবপত্র এই গাছের তলে একটা-দুটা করে ফেলে রেখে যেত। ঘরের সব জিনিস বিদায় করার পর আজকে তাদের বের করে দিয়েছে ফ্ল্যাট থেকে। এখন তাদের চোখজুড়ে শুধু হাহাকার। তারা কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, ভবিষ্যৎ কী তাদেরÑ কিছুই জানে না।

বৃদ্ধ লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোলায়মানকে বলেন, আমরা এখন পরিবারে অচল পয়সা, বুঝলে!

এসব শুনে সোলায়মান বলে, আপনারা আমার ঘরে চলুন। আমি বস্তিতে থাকি। আমার ঘরে আল্লাহর রহমতে সব জিনিসপত্র জোগাড় হয়েছে। শুধু আমার বাবা-মায়ের প্রয়োজন। কারণ, আমি এতিম।

এই বুড়া-বুড়িকে নিজের বস্তিতে ঠাঁই দিল সোলায়মান। কেউ কেউ বস্তিতে নিন্দা করে বলছিল, বিয়ে করার জন্য নাকি বাবা-মা ভাড়া এনেছে সোলায়মান। নিন্দুকের মুখে ছাই পড়লÑ যখন মাসের পর মাস অতিক্রম হতে লাগল। আর এই বুড়া-বুড়ি নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসা দিতে লাগল সোলায়মানকে। সোলায়মানও যে নতুন বাবা-মাকে পেয়ে অনেক খুশি। তার ঘরে শুধু সুখ আর সুখ।

অন্যদিকে সোলায়মানের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় অধিক মনোকষ্টে ভুগছিল জ্যোৎস্না। এতদিনে জাহানারা বেগমও বুঝতে পারলেন, তার মেয়ে আসলে সোলায়মানকেই ভালোবাসে প্রচুর।

এ কয় মাস সোলায়মানের জাহানারার বাসার খাবার খাওয়ার আর দরকার পড়েনি। কারণ তার নতুন বাবা বাজার করতেন। আর নতুন মা রান্না করতেন। টানা এই কয়দিন সোলায়মান অভিমানের চোটে কথাও বলেনি জ্যোৎস্না বা তার মায়ের সঙ্গে। জাহানারা তার ভুল বুঝতে পেরেছে। অন্যের কানকথা তার মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিচ্ছিল। মেয়ের ভালোবাসা সম্পর্কেও তিনি এখন ওয়াকিবহাল। মেয়ের মা হিসেবে জাহানারা বেগম প্রস্তাব নিয়ে গেল সোলায়মানের নতুন বাবা-মায়ের কাছে। তারাও এতে খুব খুশি হলেন।

ধুমধাম করে সোলায়মান ও জ্যোৎস্নার বিয়ের আয়োজন হলো বস্তিতে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে