sara

ভালোবাসায় ভুলিয়েছে নাসির

  শ্যামলকান্তি দাশ

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সকলেই যেমন কবি নয়, কেউ কেউ কবি, তেমনি সকলেই বন্ধু নয়, কেউ কেউ বন্ধু। আমার এই ‘কেউ কেউ’ বন্ধুদের একজন নাসির। বাংলাদেশের যশস্বী কবি-সাংবাদিক নাসির আহমেদ। নাসিরকে কবি হিসেবে চিনতাম অনেক দিন আগে থেকেই। কিন্তু প্রত্যক্ষ আলাপ আর চেনাজানা ২০০০ সালের দিকে। কবি মঞ্জুষ দাশগুপ্ত আর কাজল চক্রবর্তীর সৌজন্যে সেই সামান্য পরিচয় এখন নিবিড় বন্ধুতায় পরিণত। আমার বাংলাদেশের বন্ধুদের তালিকায় বলতে দ্বিধা নেই, এখন শীর্ষনাম নাসির আহমেদ। নাসিরের চরিত্রে এমন কিছু দুর্লভ গুণ আছে, যা প্রথম দেখাতেই আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল। আমি চমৎকৃত হয়েছিলাম। ভালোবাসা আর তার শ্যামল কান্তি দিয়েই সে আমাকে মজিয়ে ছিল।

বাংলাদেশ নিয়ে আমার মধ্যে এখন একটা ঘোর তৈরি হয়েছে। এই সুন্দর দেশটার নামে আমি এখন সর্বদাই আপ্লুত হয়ে থাকি, কয়েক বছর আগেও এটা ছিল না। বাংলাদেশের সাহিত্য পড়তাম, গান শুনতাম, নাটক দেখতাম, কাউকে কাউকে চিঠি লিখতাম, কলকাতায় কেউ এলে আলাপচারিতার সুযোগ খুঁজতামÑ ব্যস, ওই পর্যন্ত, এবং সবই দূরে থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই যে এখন এত স্বপ্ন আর আবেগ, দরদ আর আকুলতা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি, বাংলাদেশের নামে এই যে কথায় কথায় আচ্ছন্ন হয়ে যাই, ওখানকার মাটি, মানুষ এই যে আমাকে এত জড়িত করে, এর মূলে আছে কিন্তু নাসির। বন্ধু নাসির আহমেদ। বাংলাদেশের মাটিতে, ঢাকায়, সে-ই আমাকে প্রথম বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। তার কাছ থেকেই আমি প্রথম পেয়েছিলাম প্রাণের উত্তাপ। তাকে আমার অচেনা মনে হয়নি। অপরিচিত মনে হয়নি। মনে হয়নি সে একজন বিদেশি। একটি নয়, তার লেখা অনেক কবিতার সৌন্দর্য আর রহস্য নাসিরই প্রথম আমার কাছে উন্মোচন করেছিল। নাসিরের চোখেই আমি বাংলাদেশকে চিনেছিলাম। এ জন্য তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতারও শেষ নেই। আলাপের প্রথম দিনটিতেই বুঝতে পেরেছিলাম, নাসির কেবল একজন খ্যাতিমান কবি বা সাংবাদিক নয়, সুন্দর কথা বলতে পারে। তার সর্বাঙ্গে বাংলাদেশের জল-মাটি-হাওয়ার মেদুরতা। সে সৌন্দর্য সাধক এবং প্রেমিক। প্রত্যয়ী এবং প্রাঞ্জল। অভিমানী এবং অহঙ্কারহীন। কবিতার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। বন্ধুদের জন্য তার ভালোবাসা, ত্যাগ তুলনারহিত। সব মিলিয়ে রঙে রেখায় ঝলমলে, সুদৃশ্য, প্রায় ছবির মতো চরিত্র নাসির আহমেদ। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই মন ভালো হয়ে যায়, চিত্ত প্রসন্ন হয়ে ওঠে। মনের মধ্যে একটা কবিতা কবিতা ভাবের জন্ম হয়।

আমার সঙ্গে যখন পরিচয়, তখন পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কবিতা লিখছে নাসির। সে বাংলা ভাষার একজন অগ্রগণ্য কবি। সত্তরের দশকের বাংলা কবিতার সে অহঙ্কার। রক্তাক্ত সমকাল, সমাজ, সংসার, জীবনের নানা জাল-জটিলতা, ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন, নাগরিক মানুষের নানা কৃত্রিমতা, ভান-ভ-ামি তার কবিতায় বাক্সময় হয়ে উঠেছে। নাসির যখন লেখে : ‘হরিণ কোথাও নেই। বাড়ির সামনের মাঠে/ রৌদ্রে ও জ্যোৎস্নায় ঝলমল করে শুধু/ সবুজ ঘাসের বুকে রক্ত চাপ চাপ/ তুমুল লড়াইয়ে মত্ত স্বগোত্রীয় ষাঁড়দের উষ্ণ রক্ত ঝরে।’ কিংবা ‘দিনকে রাত্রি করে ফেলে আজ কোনো যাদুকর/ মিথ্যে মন্ত্রে দেখায় আঁধার/ চরাচর আজ দেখছে সবাই হতাশার মতো কৃষ্ণপক্ষ/ রৌদ্রের ছায়া দেখবে না কেউ...’ বুঝতে পারি নাসিরের অভিপ্রায়, তার কবিতার উদ্দীষ্ট কী। কিন্তু পরমুহূতেই তিনি যখন লেখেন, ‘...অভিমান আর দুঃখ এখন বড় বেমানান/ আলোভুক এই সময়ের মুখোমুখি/ দাঁড়াতেই হবে এবং দু’চোখে নাবিকের মতো/ জ্বালতেই হবে স্বপ্নের বাতিঘর’Ñ তখন নাসিরের চিন্তা ও চেতনার মহৎ আমাদের কাছে দীপ্ত হয়ে ওঠে। আমরা প্রাণিত হয়ে উঠি। নন্দিত হয়ে উঠি।

নাসির বিশ্বাসের কবি। ভালোবাসার কবি। তার প্রেমের কবিতাগুলো স্নিগ্ধ, লাবণ্যময়, আনন্দোজ্জ্বল। ‘রক্ত গোলাপ দল মেলেছে তোমার মনে/ব্যস্ত তুমি মৌমাছিদের গুঞ্জরণে/স্বপ্নাহত সুদূর থেকেই তাকিয়ে থাকি/তোমার জন্য স্বপ্ন তবু নীল জোনাকী/নিভু নিভু জ্বলতে থাকে সঙ্গোপনে/ অনাহূত অমিই তোমার কুঞ্জবনে/।’ আরেকটি ছোট কবিতাÑ ‘পথের ওপর ছড়িয়ে আছে পাথরখ-গুলো/ডাইনে বাঁয়ে, সামনে পিছে পাথর এবং ধুলো/সংসারী এই ধুলোর মাঝেই স্বপ্নজীবী আমি/তোমার নামের পাশে এসেই হঠাৎ করে থামি।’ তার রাগ ও ক্ষোভের মধ্যেও দেখেছি সারল্যের ছবি। কবিতাসংক্রান্ত তার দু-একটি নির্দেশ মান্য না করায় সে আমার সঙ্গে পত্রালাপ বন্ধ করে দিয়েছিল। শুধু পত্রালাপই নয়, নাসির বলেছিল আমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ রাখবে না। যদি বাড়াবাড়ি করি, তা হলে ইন্ডিয়ার সঙ্গেও সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেবে। আমি একটু বিচলিত হয়েছিলাম। কিন্তু ঢাকায় দেখা হতে নাসির অন্য মানুষ! কোথায় তার রাগ, কোথায়ই বা অভিমান। সহাস্যে বুকে টেনে নিয়েছিল। এ রকম মদির মধুর এবং ঈর্ষণীয় পঙ্ক্তি লেখা নাসিরের পক্ষেই সম্ভব। এ রকম অজস্র পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা যায়। নাসিরের কবিতায় স্বাতন্ত্র্য, তার উচ্চারণের বলিষ্ঠতা, তার শব্দের ঐশ্বর্য, চিত্রকল্প রচনার অসামান্য ক্ষমতা ছন্দের কুশলতা আমাদের মুগ্ধ করে। তার প্রতিটি কবিতাই হৃদয় নিংড়ে লেখা। এবং সেই কবিতা পাঠ এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। এই বাংলায় অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে তার কবিতার পাঠক অনেক, এখান থেকেও প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতার বই। আরও একটি বই প্রকাশের অপেক্ষায়। এখানকার নানা অনুষ্ঠানে সে পুরস্কৃত হয়েছে বিভিন্ন সময় সর্বই তার অনবদ্য কবিকর্মের পরিচয়বাহী। নাসিরের ছোটদের জন্য লেখা ছড়া-কবিতাগুলোও আমার বিবেচনায় অনবদ্য।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে