মুনীর চৌধুরীর প্রবন্ধ ও নাটক

  শহীদ ইকবাল

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাহিত্য সমাজ-আশ্রিত, এমন আপ্তবাক্য মেনে নিয়ে, সাতচল্লিশ সময়-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যের উৎস ও উৎপত্তি নির্ধারণে, রাজনৈতিক পাঠ বেশি জরুরি হয়ে যায়। কারণ দেশভাগ বদলে দিয়েছিল আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-মনস্তত্ত্ব সবকিছু। বাংলাদেশের সাহিত্য তথা নাটকের বিভাগোত্তর মনস্তত্ত্বটি এমন পরিম-লে লিখিত। শাহাদাৎ হোসেন লেখেন ‘মস্নদের মোহ’। আবুল ফজল লেখেন ‘কায়েদে আজম’। কিন্তু বাঙালি মুসলমান লেখকদের নাটক রচনা কিংবা মঞ্চে আসা ছিল দূরপরাহত ব্যাপার। ওই সময়ে বাঙালি মুসলমানদের চর্চা তেমন ছিল না। বিভাগ-পূর্ব নাটকের ধারা দেশভাগের গ্রহণ-ছায়ায় পড়ে। ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে আমরা দেখি পঞ্চাশের পরে গ্রাম-গঞ্জে নাটক লেখা শুরু হয়, মঞ্চস্থও হয়। সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ তেমন থাকে না। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নাটক তখন লেখা হয়। কল্যাণ মিত্র, এম. গোলাম রহমানের অধিকাংশ নাটকই বগুড়া থেকে প্রকাশিত হয়। ঢাকাকেন্দ্রিক যারা নাটক লেখেন ইব্রাহিম খাঁ, ফররুখ খলিল পাকিস্তানকে অবলম্বন করে নাটক লেখেন। ঠিক এই সময়ে মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১) জেলে বসে ‘কবর’ নাটক লেখেন। তার রক্তাক্ত প্রান্তর আকর্ষণীয়। নাটকের পূর্ণাঙ্গ মানবীয় প্রেম আকর্ষণীয়। তবে মধ্যবিত্ত-অনুবর্তী নাটকই লক্ষণাক্রান্ত হয়। বস্তুত, সমাজবিধৃত রূপটি তখন মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক। তাই নাটকে আসে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকট, সংশয়, দ্বিধা, ভয়, ঐতিহ্যপ্রীতি প্রকরণবন্দি হয়। এভাবে ক্রমেই এগিয়ে চলে নাটক, বিভিন্ন কালনিরিখে। বাঙালি চেতনা, অস্তিত্বের পরীক্ষাটিও এর ভেতরেই চলে। প্রসঙ্গত, নাটক অনুবাদও হয়। মুনীর চৌধুরী পাশ্চাত্য নাটক অনুবাদ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিষয়-উপাদানে যুক্তি-জিজ্ঞাসার প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধ সমালোচনামূলক, মননশীল ও গবেষণামূলক। প্রবন্ধ যুক্তি-পরম্পরার ভেতর দিয়ে পরিষ্কার সিদ্ধান্তটিতে আসে। এবং তার জন্য অবশ্যই সৌন্দর্য ও রুচিজ্ঞান আবশ্যক। এরূপেই স্বতন্ত্র একটি শৈলী সৃষ্টি হয়, যা পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকে উসকে দেয়, পরিচালিত করে পরিশুদ্ধতার দিকে। এর মূলে ছিলেন মুনীর চৌধুরী। বাংলাদেশের সাহিত্যে সব রকমের প্রবন্ধেরই প্রাচুর্য পরিলক্ষিত।

গবেষণা ও সমালোচনা গ্রন্থে মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যরুচি অদ্যাবধি সর্বজনবিদিত। মীর-মানস (১৯৬৫)-এ লেখক মীর মশাররফ আর শিল্পলোকের অধিষ্ঠাত্রী মশাররফকে কাটাছেঁড়ায় নেমেছেন। যুক্তিতে-বিশ্লেষণে; সঙ্গত-সসম্ভ্রমে মশাররফের চিত্তদ্বন্দ্ব চিহ্নিত করেছেন। উঠে এসেছে সমাজ-সংস্কৃতি-আচার-সংস্কার; নতুন তথ্যে ও ভাষ্যে। মশাররফ আলোচনায় দিক্ উন্মোচনকারী এ গ্রন্থটি গবেষণা ও সমালোচনা সাহিত্যে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। মুনীর চৌধুরীর তুলনামূলক সমালোচনা (১৯৬৯) ও বাঙলা গদ্যরীতি (১৯৭০) অন্যতম গ্রন্থ। গদ্যের রীতি-প্রকৃতি, ভাষাতাত্ত্বিক ধ্যানধারণা, বাংলা লিপি-বানান ইত্যাকার বিষয়ে আলোচনা গ্রন্থটি। পূর্ব বাংলায় বাংলা ভাষার চর্চা-সমৃদ্ধি-নিরীক্ষা এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা গ্রন্থটি।

মুনীর চৌধুরী ব্যতিক্রমী নাট্যকার। তার মৌলিক পূর্ণাঙ্গ নাটক দুটি : রক্তাক্ত প্রান্তর (১৯৬১), চিঠি (১৯৬৬)। এ ছাড়া তার তিনটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে ১২টি একাঙ্কিকা। এ তিনটি গ্রন্থ : কবর, দ-কারণ্য, পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য। ১৭৬১-এর পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পটভূমিকে অবলম্বন করে লেখা রক্তাক্ত প্রান্তর মুনীর চৌধুরীকে বিশেষ খ্যাতি এনে দিয়েছিল। কারণ দুটিÑ এক. সপ্রতিভ ও আধুনিক জীবনদৃষ্টির প্রকাশ, যেখানে যুদ্ধবিরোধী তৎপরতার কথা; দুই. সৃজিত চরিত্রে হৃদয়াবেগ ও কর্তব্যবুদ্ধির দ্বন্দ্বের বিন্যাস। রক্তাক্ত প্রান্তর মহাকবি কায়কোবাদ রচিত মহাশ্মশান-অবলম্বী হলেও সর্বজনপ্রিয় প্রবৃত্তির রূপায়ণ, ইচ্ছাবাসনার দ্বন্দ্ব নাটকটি পূর্ণাঙ্গ জীবনকেই যেন স্পর্শ করেছে। এ ক্ষেত্রে মুনীর চৌধুরীর অলঙ্কারসমৃদ্ধ ভাষা, রসবোধসম্পন্ন শ্লেষ-ব্যঙ্গ, মনুষ্য চরাচরের বিবিধ বিধানের কটাক্ষ নাটকটিকে সর্বজনপ্রিয় করে তুলেছে। মধ্যবিত্ত জীবনের ক্রিয়াকর্মই তার নাটকের বিষয়। দেশ-সমাজ ছাপিয়ে সবকিছু দিবালোকের সত্যতায় এক রকমের অনিবার্যতা অর্জন করেছেÑ তার শিল্প। মুনীর চৌধুরীর মৌলিক একাঙ্কিকার মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে লেখা ‘মানুষ’ (রচনা ১৯৪৭, প্রথম প্রকাশ ১৯৫০), ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘কবর’ (রচনা ১৯৫৩, ১৯৬৬, বাংলাদেশে প্র. অ. ১৯৭২), পাশ্চাত্য অ্যাবসার্ড রীতিতে পৌরাণিক পুননির্মাণ ‘দ-কারণ্য’ (১৯৬৬) তীক্ষèধী সংলাপে উজ্জ্বল ও জীবন্ত। তবে এসবের মধ্যে প্রতিবাদী নাটিকা কবর মুনীর চৌধুরীর সার্থক রচনা। বিভাগোত্তর সময়ে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের শোষণ, নিপীড়নকে প্রতীকী ইঙ্গিতে এখানে শুধু তুলে আনা নয়; শাসক চরিত্রের স্বরূপ ও সামষ্টিক প্রতিরোধের শক্তিকেও নাটকে দেখানো হয়েছে। হাফিজ, নেতা, মুর্দা ফকির এমন চরিত্রকে বায়ান্নর রক্তাক্ত পটে স্থাপন করে চরম উৎকণ্ঠার পরিবেশে লেখক প্রখর দ্বন্দ্বকে তুলে এনেছেন। এ ক্ষেত্রে মুনীর চৌধুরীর সফলতা সংযত সংলাপে অধিকতর ব্যঞ্জনায় বাস্তবতাকে সুদূরপ্রসারী করে তোলায়। তার অন্যান্য মৌলিক একাঙ্ক নাটক নওজোয়ান কবিতা মজলিশ (১৯৪৩), সংঘাত (১৯৪৩), গু-া (১৯৪৪), একটি মশা (১৯৮২), নেতা (১৯৮২), ঢাক (১৯৮২), গতকাল ঈদ ছিল (১৯৮২), একাঙ্কিকা (১৯৪৫), রাজার জন্মদিন (১৯৪৬), বেশরিয়তি (১৯৪৭), পলাশী ব্যারাক (১৯৪৮), ফিটকলাম (১৯৪৮), আপনি কে (রচনা ১৯৪৮, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৫), নষ্ট ছেলে (১৯৫০), মিলিটারী (১৯৫০), দ- (১৯৬৬), দ-ধর (১৯৬৬), একতলা দোতলা (১৯৬৫), কুপোকাৎ (১৯৬৬), মর্মান্তিক (১৯৬৭), বংশধর (১৯৬৭)।

মুনীর চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরিত নাটক : জর্জ বার্নাড শ’র ণড়ঁ হবাবৎ পধহ ঃবষষ-এর রূপান্তর কেউ কিছু বলতে পারে না (১৯৬৭), জন গলসওয়ার্দির ঞযব ংরষাবৎ নড়ী-এর রূপান্তর রূপার কৌটা (১৯৬৯), জোহান অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের ঞযব ভধঃযবৎ-এর রূপান্তর জনক (১৯৭০)।

রপান্তরিত একাঙ্ক নাটক : স্বামী সাহেবের অনশনব্রত (১৯৪৬), জমা খরচ ও ইজা (১৯৬৮), মহারাজ (১৯৬৮), গুর্গন খাঁর হীরা (১৯৬৮), ললাট লিখন (১৯৬৯)।

তার অনূদিত পূর্ণাঙ্গ নাটক : উইলিয়াম শেক্সপিয়ার অবলম্বনে ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’র অবলম্বনে মুখরা রমণী বশীকরণ (১৯৭০)। এ নাটকে অনুবাদকের দক্ষতার পরিচয় মিলেছে। যথেষ্ট স্বাধীনতা নিয়ে মুনীর চৌধুরী প্রকৃত নাটকীয় আবহ সৃষ্টি, দক্ষ সংলাপ তৈরি এবং রসবোধের তীক্ষè পরিমার্জনা এনে ইন্দ্রিয়গ্রামে যথেষ্ট প্রাণ সৃষ্টি করেন। নাটকটির অনুবাদক হিসেবে মুনীর চৌধুরী একটি দৃষ্টান্ত।

অনূদিত রূপান্তরিত অসমাপ্ত নাটক : শেক্সপিয়ারের ওথেলো, টেনেসি উইলিয়ামসের এ স্ট্রিটকার নেমড ডিজায়ার অবলম্বনে গাড়ির নাম বাসনাপুর, রোমিও-জুলিয়েট, শেক্সপিয়ারের মাচ অ্যাডু অ্যাবাউট নার্থিং-এর অনুবাদ অকারণ ডামাডোল, জর্জ বার্নার্ড শ’র ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান, ইউজিন ও’নীল মর্নিং বিকাস ইলেকট্রার অনুবাদ ইলেকট্রার জন্য শোক, শেরিডানের দ্য স্কুল ফর স্ক্যান্ডাল।

উপর্যুক্ত অংশে মুনীর চৌধুরীর প্রবন্ধ ও নাটকের একটি বিবরণী উপস্থাপন করা হয়েছে। এর ভেতর দিয়ে মুনীর চৌধুরীর গদ্যমনস্কতা সম্পর্কে ঈষৎ ধারণা পাওয়া যাবে। গদ্যকার মুনীর চৌধুরী বিভাগোত্তর সময়ে বাংলা গদ্যে এনেছেন নতুন অর্থ, বিবেচনায় এনেছেন বিশেষ অভিমুখ। এই নতুনত্ব ও বিশেষত্বটি কী? যুক্তিপরম্পরা, আধুনিক চিন্তা, ভাবনার স্বচ্ছতা এবং অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী উদার প্রবণতার আদর্শ। এই আদর্শই তাকে এমন প্রাঞ্জল গদ্যবীক্ষার দিকে মনোনিবেশ দেওয়ার সামর্থ্য জুগিয়েছে। একজন বড় গদ্যকারের মূল শর্ত, প্রভাবিত করার শক্তি। মুনীর চৌধুরী তীব্রভাবে পরবর্তী প্রবন্ধকারদের প্রভাবিত করেছেন, যা বাংলাদেশের প্রবন্ধ তথা গদ্য সাহিত্যে তৈরি করেছে নতুন অভিমুখ। একই কথা নাটকের ক্ষেত্রেও। ফলে তাকে পাঠ করা জরুরি।

আরও বলা যায়, যুক্তি ও বুদ্ধির যে চিন্তন-জগৎ মুনীর চৌধুরীর মননে তৈরি হয়েছিল, তাতে তিনি এক বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত একটি জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তিকেই প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন, যা তার গদ্যশিল্পের স্বরূপ ও স্বয়ম্প্রকাশ বটে, সন্দেহ নেই।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে