প্রান্তরের গাছের ছায়ায়, যাও...

  রিয়া চক্রবর্তী

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘অমলকান্তি আমার বন্ধু,/ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।/রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,/শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে/এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে, দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।/আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।/অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।/সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!’

২৫ ডিসেম্বরের দুপুরে মুকুন্দপুরেরর এক বেসরকারি হাসপাতালে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন আমাদের প্রিয় কবি, যিনি আমাদের মধ্যকার অমলকান্তিকে রোদ্দুর করতে চেয়েছিলেন, যিনি ছিলেন ‘কলকাতার যিশু’, আজ ‘অন্ধকার বারান্দা’য় বিরাজমান। আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার সময় তিনি ছিলেন ৯৪ বছরের যুবক। তাকে প্রথম দেখি কলকাতার কবিতা উৎসবে। বেশ খানিকটা দূরে বসে তাকে দুচোখ ভরে দেখছি। তখনই অসুস্থ তিনি। তবু তাকে যখন বলতে বলা হলো কিছু, তিনি সেই বয়সে, অসুস্থ অবস্থায় স্মৃতি থেকে তার কবিতা পাঠ করলেন। মজার মজার কথা বলে আমাদের হাসিয়ে তুললেন। ভাবতেই অবাক লাগছে সেই তিনি আজ নেই।

‘উলঙ্গ রাজা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৭৪ সালে কবি সম্মানিত হয়েছেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারে। এ ছাড়া সম্মানিত হয়েছেন তারাশঙ্কর-স্মৃতি সম্মান এবং আনন্দ শিরমণি পুরস্কারে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট পেয়েছিলেন ২০০৭ সালে।

‘একদিন সমস্ত যোদ্ধা বিষণœ হবার মন্ত্র শিখে যাবে।

একদিন সমস্ত বৃদ্ধ দুঃখহীন বলতে পারবে, যাই।

একদিন সমস্ত ধর্ম অর্থ পাবে ভিন্ন রকমের।

একদিন সমস্ত শিল্পী কল্পনার প্রতিমা বানাবে।

একদিন সমস্ত নারী চোখের ইঙ্গিতে বলবে, এসো।

একদিন সমস্ত ধর্মযাজকের উর্দি কেড়ে নিয়ে

নিষ্পাপ বালক বলবে, হাহা।

একদিন এইসব হবে বলেই এখনও

সূর্য ওঠে, বৃষ্টি পড়ে, এবং কবিতা লেখা হয়।’

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নীল নির্জন’, ‘অন্ধকার বারান্দা’, ‘সময় বড় কম’, ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’, ‘নিরক্ত করবী’, ‘নক্ষত্র জয়ের জন্য’, ‘আজ সকালে’। অজস্র কবিতার পাশাপাশি তাকে মনে রাখবে টিনটিনকে বাংলা সাহিত্যে উপস্থাপিত করার জন্য। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন গোয়েন্দা চরিত্র ‘ভাদুড়ি মশাই’। তিনি ‘পিতৃপুরুষ’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। ১৯৫৪ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’ প্রকাশিত হয়। তখন বয়স ৩০ বছর। ১৯৯০ সালে বিশ্বকবি সম্মেলনে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তার লেখা কবিতা ‘অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল’ এবং ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ বাঙালির কাছে রীতিমতো প্রবাদে পরিণত হয়েছে।

‘ঈশ্বরের সঙ্গে আমি বিবাদ করিনি।/তবুও ঈশ্বর/হঠাৎ আমাকে ছেড়ে কোথায় গেলেন?/অন্ধকার ঘর।/আমি সেই ঘরের জানলায়/মুখ রেখে/দেখতে পাই, সমস্ত আকাশে লাল আভা,/নিঃসঙ্গ পথিক দূর দিগন্তের দিকে চলেছেন।/অস্ফুট গলায় বলে উঠি :/ঈশ্বর! ঈশ্বর!’

তিনি কখনো বলেছেনÑ ‘কবিতাকে ফাঁকি দিয়ে, তার থেকে সময় চুরি করে নিয়ে আমি গদ্যকে দিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেছেনÑ ‘কবিতা লেখায় আমার কল্পনার জোর তত নেই। আমি চারপাশে যা দেখি, যা শুনি, যে ধরনের অভিজ্ঞতা হয় এ শহরটার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে, তাই নিয়েই আমার কবিতা। একেবারে চোখের সামনে যা ঘটতে দেখলুম, তার ভিত্তিতে তক্ষুণি লেখা। যেমন কলকাতার যিশু, উলঙ্গ রাজা, বাতাসি।’ তিনি এই প্রসঙ্গেই একবার লিখেছিলেনÑ ‘একবার আনন্দবাজার অফিস থেকে বিকেল বেলায় দোতলা বাসে উঠে বাড়ি ফিরছি। হঠাৎ বাসটা প্রচ- ব্রেক কষে থেমে গেল। তাকিয়ে দেখি, একটা বছর চার-পাঁচের সম্পূর্ণ উলঙ্গ শিশু চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ে রাস্তার উল্টো দিকের ফুটপাথে ছুটে চলে যাচ্ছে। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। বাস, ট্যাক্সির মধ্য দিয়েই সে দুরন্ত দৌড়ে রাস্তাটা পার হচ্ছে। সেই রাতেই লিখি কলকাতার যিশু।’

‘স্টেটবাসের জানালায় মুখ রেখে/একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে।/ভিখারি-মায়ের শিশু,/কলকাতার যিশু,...’। এ বছরের ২৯ জুলাই মারা গিয়েছিলেন তার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী। বন্ধুর স্মৃতিচারণায় ‘দেশ’ পত্রিকায় নীরেন্দ্রনাথ লিখেছিলেনÑ ‘আমারও আর দেরি নেই। রমাপদকে বেশি দিন একা থাকতে হবে না। ও খুব শিগগিরই কথা বলার লোক পেয়ে যাবে।’ সেই লেখার শেষে নীরেন্দ্রনাথ লিখেছিলেনÑ ‘এখন একদম শয্যাশায়ী অবস্থায় আছি। আর ক্রমাগত এই কথাটা ভাবছি, আমি শিগগিরি যাব।’

১৯২৪ সালের ১৯ অক্টোবর অবিভক্ত ভারতের ফরিদপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক পড়াশোনা সেখানকার পাঠশালায়। পরে ১৯৩০ সালে কলকাতায় চলে আসা। কলকাতার ভবানীপুরে মিত্র ইনস্টিটিউশন স্কুলের পাঠ শেষ করে বঙ্গবাসী এবং সেন্ট পলস কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৫১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজে যোগ দেন। একটা দীর্ঘ সময় তিনি ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। লিখেছেন ছোটদের জন্য বহু ছড়া। এ ছাড়া কবি নীরেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, গদ্যকার, গোয়েন্দা-গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, ভ্রমণ-কাহিনিকার, সম্পাদক। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন কবি।

‘শিশুটি কোথায় গেল? কেউ কি কোথাও তাকে কোন/পাহাড়ের গোপন গুহায় লুকিয়ে রেখেছে?/নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে/ঘুমিয়ে পড়েছে কোন নির্জন নদীর ধারে কিংবা/প্রান্তরের গাছের ছায়ায়/যাও, তাকে যেমন করেই হোক খুঁজে আনো।/সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে নির্ভয়ে দাঁড়াক।/সে এসে হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে জিজ্ঞাসা করুক;/রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’

এই ঘোর অসময়ে, দুঃসময়ে ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ এই নির্ভীক প্রশ্ন করার মানুষ আজ চিরনিদ্রায় শায়িত! তার আত্মার আমরা শান্তি কামনা করি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে