সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল তিন ভুবনের তিন যাত্রী

  নুরুল করিম নাসিম

০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেই ছিল এক সময়। দুর্বিনীত, উদ্ধত, অসহায়। চলচ্চিত্র, নাটক ও শর্টফিল্ম আন্দোলন নিয়ে যুব সম্প্রদায় মেতে উঠেছিল সেদিন। দেশে তখনো সেলফোন আসেনি, আজকের মতো প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের এতটা প্রসার হয়নি। দেশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। আমরা তখন সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছি। সৃজনশীল কিছু একটা করার জন্য আমরা উদগ্রীব। দেশের রাজনৈতিক হাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। আমরা ভিন্নধারার চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিয়ে মেতে উঠেছি।

মগবাজারে কবি ও কথাশিল্পী লায়লা সামাদের বাড়িতে নিয়মিত চলচ্চিত্র বিষয়ে আড্ডা হতো, সভা হতো, শুদ্ধ ও ব্যতিক্রমধর্মী চলচ্চিত্র নিয়ে কথাবিনিময় হতো। ঢাকাইয়া পোলা হাশেম সুফী ঢাকা সিনে সার্কেল প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি একদিন ম্লান ময়লা বিকেলে পুরনো ঢাকার আমার নারিন্দার বাসায় এসে হাজির। আমি তো অবাক। তার বগলে সত্যজিৎ রায়ের জীবনের ওপর ম্যারি সিটনের লেখা বই চঙজঞজঅওঞ ঙঋ অ উওজঊঈঞঙজ। সুফী ভাইকে ঘরে নিয়ে বসালাম। তিনি বললেন, ‘ফর্মালিটি রাখেন। এইসব আমার ভাল্লাগে না। যে কারণে কলতাবাজার থেকে ছুটে আসছি, সেইটা বলি। ঢাকা সিনে সার্কেলে এদ্দিন সদস্য ছিলেন, অহন একটা দায়িত্ব নিতে হইবো। আপনাকে সাধারণ সম্পাদক হইতে হইব। আর প্রথম যে চলচ্চিত্রটি দেখাইবেন, সেইটা মৃণাল সেনের হইলে ভালো হয়।’ আমি খুব খুশি এবং উদ্বিগ্ন। সামনে কলেজ ফাইনাল। স্কুলের পরীক্ষায় আর্টস গ্রুপে প্রথম বিভাগ পেয়েছি, কিন্তু মাধ্যমিকে উঠে কেমন যেন সৃজনশীল অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। মা বারংবার বলছেন, এটা ভালো নয়। তুমি রোজ দেরি করে বাড়ি ফেরো। তুমি জ্যেষ্ঠ। তোমাকে একটা শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে।

বাবার বদলির চাকরি। তিনি সরকারের প্রশাসনে আছেন এবং তার দায়িত্ব পালন করতে হয় সেখানে। বাবার কাছ থেকে আমি ও আমার ছোট ভাই চলচ্চিত্র বিষয়ে অনুপ্রাণিত হই।

তিনি ‘গুলিস্তান’ ও ‘নাজ’ সিনেমা হলে নিয়ে গেলেন একদিন ঘওএঐঞঝ ঙঋ ঞঐঊ এঊঘঊজঅখ দেখাতে, তারপর দেখালেন ইঊঘঐঅজ, সত্যজিতের ‘মহানগর’, ঋত্বিকের ‘সুবর্ণরেখা’ এবং মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ দেখালেন। চলচ্চিত্রকারদের সম্পর্কে অনেক তথ্য গল্পের মতো বলে গেলেন। মা ছিলেন ভিন্নগ্রহের মানুষ। কলকাতার লেডি ব্রাবন স্কুলের ছাত্রী হয়ে কী করে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে নিরাসক্ত হন, তা আমার কিছুতেই বোধগম্য হয় না।

ক্রমশ মৃণালের প্রেমে পড়ে গেলাম। একে একে প্রায় সব ছবি দেখে ফেললাম। বাবা এ তথ্য আগেই আমাকে দিয়েছিলেন যে, ভারতে প্যারালাল বা সমান্তরাল সিনেমার জনক ছিলেন তিনি। ঋত্বিক ও সত্যজিৎ ঘরানা থেকে তার অবস্থান অনেকটা দূরবর্তী, সে কথাও বাবা বলেছিলেন। সুফী ভাই বললেন, ‘পদাতিক’ পুনশ্চ, একদিন প্রতিদিন, খারিজ ছবিগুলো ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে খোঁজ নিয়ে প্রদর্শনের আয়োজন করতে হবে। তিনি বাজারের ফর্দের মতো আমাকে যে তালিকা হাতে তুলে দিলেন, যত সহজে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথাগুলো আমাকে বললেন, বাস্তবে তা প্রয়োগ করা ততটা সহজ ছিল না। পর দিন ভারতীয় দূতাবাসে গেলাম, সেখানে কেউ আমাকে চেনে না, হাশেম সুফী ভাইকে চেনে এবং গভীর শ্রদ্ধা করে। তার কথা বলাতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে একটা তারিখ দিলেন আমাদের। এদিকে দূতাবাসের অডিটরিয়াম ফাঁকা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে গোয়েন্দারা আমাদের অনুসরণ করছে। সে যে কী এক বিরূপ সময়। পাকিস্তানি প্রশাসন ভারতের দূতাবাসে আমাদের যাতায়াত ভালো চোখে দেখত না।

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র অন্য দুজনÑ সত্যজিৎ কিংবা ঋত্বিক ঘটকের সাথে মেলে না। সত্যজিৎ মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট ও টানাপড়েন, ঋত্বিক ঘটক দেশভাগের দুঃসহ বেদনা ও শেকড়হীনতা বা জড়ড়ঃষবংংহবংং তুলে ধরেছেন তাদের ব্যতিক্রমধর্মী চলচ্চিত্রে। কিন্তু মৃণাল সেন সে পথে যাননি। তার চলচ্ছবি, তার ছবির ভাষা মানুষের বোধকে তুমুলভাবে নাড়া দেয়; যেমন একদিন প্রতিদিন, কিংবা কলকাতা ৭১, অথবা ভুবন সোম। তার নির্মিত ১৬টি ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। ১৯৪১ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত হন। চলচ্চিত্রে অনন্য অবদানের জন্য দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। শ্যাম বেনেগালের কথা ধার নিয়ে বলা যায়, ‘সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল ভারতীয় সিনেমার তিন দিকপাল ও কিছুটা সমসাময়িক ঠিকই কিন্তু তারা একে অন্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরানারÑ আর মৃণাল দার কাজ তো তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। বাংলাদেশের ফরিদপুরের সন্তান মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে। হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। বামপন্থি এই লেখক রাজনীতি সচেতন ছিলেন কিন্তু কোনো দিন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য হিসেবে তিনি পার্লামেন্টেও গেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান ২২শে শ্রাবণের মুক্তি পাওয়ার পর। স্ত্রী গীতা সেন ছিলেন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী, তার প্রেরণা, তার সহযোগী। ২০১১ সালে তিনি প্রকাশিত তার আত্মজীবনী ‘তৃতীয় ভুবন’-এর শুরুতে লিখেছেন : ‘চারদিকে কত কী-ইনা দেখি। শুনিও কত কী। পড়ি, লিখি। এই শোনা-দেখা-পড়া-লেখাÑ এই সব কিছুর মধ্য দিয়ে করবার মতো করিও বেশ কিছু। লেখাজোখা।’

মৃণাল সেন বেঁচে থাকবে শুধু চলচ্চিত্রপ্রেমিক মানুষের হৃদয়ে নয়, সাধারণ মানুষের মনেও। তার মৃত্যুর সাথে সাথে ২০১৯ সালের ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি ঐতিহ্যময় অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে