ঊনষাট পেরিয়ে

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল

  মনি হায়দার

০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেই কবে বাংলা সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয়েছে, সেই কাল কবে, কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে নির্দিষ্ট করে লেখা খুব কঠিন। কারণ ইতিহাসের পাতায় কোনো সাক্ষ্য নেই, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যাত্রার নির্দিষ্ট সময় বা কালের। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় বা কাল ধারণ করতে বাংলা আমরা যদি চর্যাপদের কাল ধরি, তা হলে অনেক বছর বা কাল পার হয়েছে বাংলা সাহিত্যের। বাংলা সাহিত্যের বিপুল যাত্রায় বা যাত্রাপথে কত পথিক যে আশ্রয় নিয়েছে, হিসাব মেলানো কঠিন। হাজার হাজার রক্তপিয়াসী বাংলা ভাষার লেখক যাত্রা করেছিলেন সুদূরের পথে, একটাই অভিলাষে, রেখে যাবে স্বাক্ষর বাংলা ভাষা চর্চার দেয়ালে। শত বছরের পথপরিক্রমায় অগণন পথিকের একজন পথিক মোহিত কামাল। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্লান্তিবিহীন একজন যাত্রী।

মোহিত কামাল বাংলাদেশের সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে জন্মেছেন ১৯৬০ সালের ২ জানুয়ারি। পিতার কর্মস্থল অনুসারে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে এবং শিল্পনগরী খুলনার খালিশপুরে। একজন লেখকের লেখার সৃজনশীলতা তৈরি হয় শৈশবের উঠানে নানামাত্রিক অভিজ্ঞতায়। তার নানামাত্রিক লেখার যে বীজ আজ আমাদের সামনে প্রকাশ করে চলেছেন, বিস্ময় বৈকি! কারণ জীবনের গভীরে তিনি মনোচিকিৎসক। অসংখ্য মনোরোগীর মনোবৈকল্য নিয়ে কাজ করেন। তিনি নিরেট গদ্য লেখেন। গল্প-উপন্যাসের আখ্যান তৈরি করা, আবার তৈরি করা আখ্যান হাজার হাজার শব্দের বুননে উপস্থাপন করাÑ সময় কখন দেন তিনি! মানুষই প্রধান অনুষঙ্গ মোহিত কামালের লেখার। মানুষ আমরা নিশ্চয়ই। আবার অমানুষও আমরা খুব সহজে। এই যে মানুষ আর অমানুষের পৌনঃপুনিক খেলা, খেলার মধ্যে আত্মহননের যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, মোহিত কামাল সেই ক্রিয়াকে তুলে আনেন লেখায়, গল্পে, উপন্যাসে মনোসমীক্ষার অতুলনীয় রেখায়, পাদটিকায়। কেবল বড়দের লেখায় নিজেকে ব্যাপুত রাখেননি, ছোটদের সাহিত্যও তিনি ক্রমঅগ্রসরমান। আমাদের চির আধুনিক কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন নিয়ে লিখেছেন অনবদ্য উপন্যাসÑ দুখু। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের যে আকাশ, সে আকাশ রঙিন যেমন, মেঘে ঢাকাও। অনন্য নজরুলকে নিয়ে মোহিত কামালের দুই খ-ের কিশোর উপন্যাস ‘দুখু’ আকাশ আর বেদনার অনন্য নজির। ২০০৬ সালে মোহিত কামালের প্রথম উপন্যাস ‘মন’ পাঠকদের বিমোহিত করে। সেই শুরু আর ফিরে তাকাননি তিনি। ক্রমাগত লিখে চলেছেন আর নিজেকে অতিক্রম করছেন। একের পর এক প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাসÑ মায়াবতী, সুখপাখি আগুনডানা, না, চেনা বন্ধু অচেনা পথ, ঘর, অহনা, পাথর পরাণ, মরুঝড়, আঁধারে আলোর ঢেউ, পথভ্রষ্ট ঘূর্ণির কৃষ্ণগহব্বর, চন্দন রোশনি, তবুও বাঁধন, বিষাদনদী, সুস্মিতার বাড়ি ফেরা, দুমুখো আগুন, চোরাগলি, হৃদমুকুটে সন্দেহপালক। না, এখানেই থেমে নেই বা থেমে থাকেননি মোহিত কামাল। তিন খ-ে অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে বের হয়েছে উপন্যাস সমগ্র। কথাসাহিত্যিকদের প্রকৃত শক্তির জায়গা ছোটগল্প। মোহিত কামাল ছোটগল্পেও রেখেছেন স্বাচ্ছন্দ্য স্বাক্ষর।

১৯৯৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় গল্পগ্রন্থÑ কাছের তুমি দূরের তুমি, সময় প্রকাশন থেকে। মাঝখানে ছোট্ট একটা বিরতি দিয়ে ২০০১-এ বের হয় গল্পগ্রন্থ : ‘জোছনা রাতে বাড়িয়েছি হাত’। আবার বিরতি। ‘চাঁদমুখ’ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। না, আর বিরতি নেই। প্রতিবছর বইমেলায় একের পর এক ছোটগল্পের বই এসেছে, পাঠকরা গ্রহণ করেছেন আর কথাকার হিসেবে মোহিত কামাল নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। বের হয়েছে গল্পগ্রন্থÑ উড়ালমন, সন্দেহপ্রাচীর, আগুন কয়লায় পোড়া জীবন, চাবি, পৃথিবীতে কে কাহার, নেতার আসন গ্রহণ। ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় নির্বাচিত গল্পসংগ্রহÑ চোখের ভেতর চোখ। আর চলতি নতুন বছরে আসছে মোহিত কামালের ৭৫ গল্প, বিদ্যাপ্রকাশ থেকে। ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি লেখায় ও সৃজনে। তার লেখায় বাংলাদেশের নানামাত্রিক জীবনের রূপ, রস, গন্ধ ও বিষাদ খুব সহজেই অনুভব করতে পারি। একজন থেকে অনেকজনে রূপান্তরিত হওয়াই একজন কথাশিল্পীর কাজ। খুব সহজে, নিবিড় নৈকট্যে সেই আদিম ও অকৃত্রিম সহজীয়াকে ধারণ করে তিনি নিজের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম।

আমাদের দেশে আমরা কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি। নিজের ভেতর দিয়ে অন্যকে দেখি ও দেখাই। সেখানে ভিন্নমাত্রার ব্যতিক্রম মোহিত কামাল। ‘শব্দঘর’ সাহিত্য পত্রিকার রুচি ও নান্দনিকতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিটি সংখ্যা প্রকাশের আগে সম্পাদক হিসেবে ভাবনার দিগন্ত প্রসারিত রাখেন। একটি সংখ্যা থেকে আর একটি সংখ্যা একেবারেই আলাদা এবং সম্পাদক হিসেবে তিনি ঝুঁকি নেন। ঝুঁকি নেন তরুণদের লেখা ছাপিয়ে। সাহস ও মেধার স্ফুরণ দেখলেই তিনি গল্প বা লেখা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন না। কিছু কিছু পত্রিকার সম্পাদকের লেখা ছাপানোর ব্যাপারে কোষ্ঠকাঠিন্য আছে। নিজেদের চিন্তার বাইরে ভিন্ন চিন্তার লেখা দেখলেই আঁতকে ওঠেন, কম্পন দিয়ে জ¦রে কাঁপেন, মোহিত কামাল কাঁপেন না। দায় নেন এবং প্রকাশ করেন; যা এই সময়ে লেখা প্রকাশের একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে মোহিত কামালের সম্পদনায় প্রকাশিত ‘শব্দঘর’।

নিজেকে এবং অন্যকে কত বিচিত্র বিভঙ্গে প্রকাশ করা যায়, একটা নজির স্থাপন করেছেন মোহিত কামাল, দুটি ভিন্ন রুচি বা আঙ্গিকের বই সম্পাদনা করে। প্রথমটি বাংলাদেশের তরুণদের ৩০ গল্প বড়দের তরুণবেলার ৩০ গল্প, বিদ্যাপ্রকাশ, ২০১৮। দ্বিতীয়টি বাংলাদেশের এ সময়ের তরুণদের ৩৫ গল্প : প্রতিষ্ঠিত ৩৫ কথাসাহিত্যিকের প্রথম গল্প বিদ্যাপ্রকাশ, ২০১৯। দুটি বইয়ের চিন্তা যেমন অভিনব, তেমন সাহসী। কেবল কিছু লেখা সংগ্রহ করে সাদা কাগজের মধ্যে ঠেসে দিলেই হয় না, রুচি ও মননের সৃজন দরকার; যা একক প্রযন্তে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ভালোবেসে করে যাচ্ছেন মোহিত কামাল। একটু অবাক লাগছে, দৃশ্যমান তরুণ মোহিত কামাল আর এক বছর পর ৬০ বছর ধরে ফেলবেন। জীবন এমনই। নীরবে জীবন কাজ করে যায়। সময়কে হাতের মুঠোয় পুরে নিত্যনতুন প্রণোদনায়, চিন্তায়, প্রকাশে, সৃজনে সবাইকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাবেন সামনের দিকে, আমরা সেটাই চাই মোহিত ভাই। এতসব কাজ ও সৃজনের মধ্য আপনি অবিচল আমাদের চিরতরুণ মোহিত কামাল এগিয়ে চলুন, এগিয়ে থাকুন, সব সময় কামনা করি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে