অমর একুশে গ্রন্থমেলা গৌরব ও অর্জনের মিলনমেলা

  আমিনুর রহমান সুলতান

১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অমর একুশে গ্রন্থমেলা গৌরবের এ কারণে যে, ভাষা আন্দোলনের চেতনায় স্নাত হয়ে বাঙালি তার বাংলা ভাষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আছে। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা। বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করতে হয় ১৯৪৮ সাল থেকেই। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসক বাঙালির নিজস্ব ভাষার অধিকার হননের মধ্য দিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। কিন্তু বাঙালি ‘ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা নির্মাণে’ রাজপথে প্রতিবাদী মিছিলে আত্মত্যাগী হতে দ্বিধান্বিত হননি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। আর বাংলা ভাষার একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার জন্য একুশ দফার ১৬ নম্বর দফায় যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তারও বাস্তবায়ন হয় ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ‘বাঙালির জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক’ হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান। আর অর্জন এ জন্য যে, আবহমান বাংলার লোক উৎসব বা জাতীয় উৎসবগুলোর মধ্যে অমর একুশে গ্রন্থমেলাও অন্যতম উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এ গ্রন্থমেলার প্রভাব সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনের মাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বইমেলা বা গ্রন্থমেলা।

বাংলা একাডেমির অমর একুশের গ্রন্থমেলার এই আয়োজনে যুক্ত থাকে সারাদেশের প্রকাশকদের প্রতিনিধি হিসেবে ‘বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’, ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি’। মাসব্যাপী গ্রন্থমেলা বিশ্বের সবচেয়ে সময়ের ব্যাপ্তির দিক থেকে দীর্ঘতম বইমেলা। এই মেলা বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত। শুক্র ও শনিবার বাদে অন্যান্য দিনে বিকাল ৩টা থেকে শুরু হয়ে মেলা চলে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। শুক্র ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে শুরু হয়। দুপুরে চলে নামাজ ও মধ্যাহ্নবিরতি। আবার চলে বিকাল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত।

‘একুশে আমাদের পরিচয়’Ñ এই সেøাগান নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৪ সালে গ্রন্থমেলা শুরু হয়েছিল। এর আগে বেশ কয়েক বছর বিচ্ছিন্নভাবে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। বর্তমানে মেলার পরিসর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন অবস্থার অবসান হয়েছে। অনেক শৃঙ্খলা ও নান্দনিকতায় মেলাটির আকর্ষণ বেড়েছে। মিলনমেলা হিসেবেও গুরুত্ব পেয়েছে। মেলায় শিশু-কিশোররা যাতে তাদের পছন্দের লেখকের প্রিয় বইটি বা নতুন কোনো বই সহজে খুঁজে পেতে পারে, এ জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শিশু কর্নার। শিশুতোষ গ্রন্থ যারা অধিক প্রকাশ করেন এবং অন্যান্য প্রকাশনা থেকেও যারা শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ করেন, তারাই শিশু কর্নারকে সমৃদ্ধ করেন। শিশু কর্নার ছাড়াও শুক্র ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে শিশুপ্রহর। শিশুপ্রহরে কেবল শিশু-কিশোররাই তাদের অভিভাবকদের নিয়ে মেলায় প্রবেশ করতে পারে। শিশুপ্রহরে তারা স্বচ্ছন্দে ঘুরেফিরে পছন্দের বই কিনে থাকে। এ মেলা মানেই প্রকাশকদের মেলা অর্থাৎ এক প্রকাশক অন্য প্রকাশকের বই বিক্রি করতে পারেন না। নিজেদের প্রকাশিত গ্রন্থ বিক্রি করতে পারেন। তবে তাদের পরিবেশিত গ্রন্থ বিক্রির সুযোগ রয়েছে। মেলার শোভাবর্ধন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর জন্য থাকে পৃথক প্যাভিলিয়ন। স্টলগুলো আকর্ষণীয় ও নান্দনিক করে তুলতে স্টলগুলোর জন্য রয়েছে পুরস্কার।

স্টল ছাড়াও বইয়ের ছাপা-বাঁধাই আকর্ষণীয় ও মনোরম প্রচ্ছেদ অর্থাৎ গ্রন্থের পরিপাটির জন্যও পুরস্কার প্রদান করা হয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে। পুরস্কারগুলো হলো বিষয় ও গুণগত মানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’। মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠানকে ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক সংখ্যক বই প্রকাশের জন্য ‘রুকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’।

গ্রন্থমেলায় যুক্ত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেসব লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়, সেসবের জন্য স্টল রয়েছে।

লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে অনেক পাঠকের তেমন ধারণা নেই। মেলায় এসে নতুন করে পরিচিত হচ্ছেন লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে। লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও লেখকদের নামের সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছেন পাঠকরা।

উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে রয়েছে দ্রষ্টব্য, পরাগ, শীতলপাটি, গল্পকথা, কবিতা বাংলা, সাম্প্রতিক, জলতরঙ্গ, বনপাংশুল, খেয়া, মাদুলি, জংশন, মেঘ, ঘুংঘুর, জমিন, ঘাসফুল, নৃ, হুচ, শাঁখ, লোক, কবি, কোরাস, দাগ, শব্দবিন্যাস এবং মানুষ, করাতকল, অর্বাক, ধ্রুপদী, কবিতাচর্চা, দেশলাই, বাংলা লিপি, পাতাদের সংসার, কুঁড়েঘর, থকবিরিম, পুনশ্চ, শিরদাঁড়া, প্রান্তস্বর, বিবর্তন, বাংলানামা, কালের ধ্বনি, নতুন এক মাত্রা, অবিনশ্বর, মত ও পথ, অমিত্রাক্ষর, চিহ্ন, প্রকাশ, সব্যসাচী, লাটাই, অনুভূতি, মানুষ, পাঁপড়, চৈতন্য, খনন, দাঁড়কাক, চিবিমা, দৃষ্টি, বৈঠক, ল্যাম্পপোস্ট, রোদ্দুর, প্রতিশিল্প, চারবাক, কাশবন, শব্দগুচ্ছ, শালুক, ব-বর্গীয়, পর্ব, মেঘফুল, চিরকুট, কবিতাপত্র, প্রতিবুদ্ধিজীবী, চর্যাপদ, একবিংশ, ধমনী, গল্পকার, টাঙ্গন, খড়িমাটি, প্রতিকথা, চালচিত্র ও ময়মনসিংহ জং।

এমন অনেক লেখক আছেন, যারা নিজেদের উদ্যোগে বই প্রকাশ করে থাকেন। তাদের প্রকাশিত বইগুলো বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে।

এ গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজন করে থাকে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বেশ কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন’-এর উদ্বোধক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন অধ্যাপক ফ্যাঁন্স ভট্টাচার্য, ফাদার পল দ্যতিয়েন, অধ্যাপক হান্স হার্ডার, পবিত্র সরকার, সুবোধ সরকার, অধ্যাপক ইমানুল হক, কবি জেমিসু, সৈয়দ হাসমত জালাল, কবি সিন্ডি লিন ব্রাউন, ভোজপুরি কবি চন্দ্রভূষণ, উদয় নারায়ণ সিংহ, নবনীতা দেবসেন প্রমুখ। গ্রন্থমেলা কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য সম্মেলনের অর্জন, তাৎপর্যপূর্ণ ও অনন্যতায় দাঁড় করিয়েছে। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও গ্রন্থমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয়। এ বছর থেকে কবি জসীমউদ্্দীন সাহিত্য পুরস্কারও মেলার শেষ দিন প্রদান করা হবে। এই রীতিও চালু হচ্ছে, যা অব্যাহত থাকবে। কবি জসীমউদ্্দীন সাহিত্য পুরস্কারের প্রারম্ভ বছরের প্রাপক কবি নির্মলেন্দু গুণ।

বিদেশে বসবাসরত কবি, সাহিত্যিকÑ যারা বিশ্বে পরিচিত, তাদের মধ্যেও এই মেলা নিয়ে উৎসবের কমতি নেই। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে তারা মেলায় আসেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, সালেহা চৌধুরী, নামজুন নেসা পিয়ারি, পূরবী বসু, ইকবাল হাসান, সৈয়দ ইকবাল, শামীম আজাদ, নাদিরা মজুমদার, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, লুৎফর রহমান রিটন, আহমাদ মাযহার, হাসান আল আবদুল্লাহ প্রমুখ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার অনেক কবি-সাহিত্যিক বইমেলা ঘুরে যান। মেলা উপলক্ষে বই খুবই গুরুত্ব পায় এবং প্রচার পায় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায়। দেশের ও বিশ্বের আগ্রহী মানুষ ঘরে বসেই বইমেলার দর্শনার্থী হয়ে ওঠে মিডিয়ার সুবাদে। পাঠক-ক্রেতা সরাসরি সাক্ষাৎ পান প্রিয় লেখকদের।

বইমেলার বই কেনার জন্য সারা বছর যেমন অপেক্ষায় থাকেন পাঠক-ক্রেতারা, তেমনি প্রকাশক ও লেখকরা অপেক্ষায় থাকেন বই প্রকাশের তাড়নায়। আর এ সময়ের জন্য ছাপাখানা, বাঁধাইখানা ও কাগজ বিক্রি কেন্দ্রগুলোও উৎসবে পরিণত হয়। কোটি টাকার যে বই বিকিকিনি হয় এ মেলায়, এখানে না এলে তা কেউ আন্দাজই করতে পারবেন না।

বই, পাঠক, প্রকাশক ও লেখককে একসঙ্গে ধরে রাখার জন্য বাংলা একাডেমির এই অমর একুশে গ্রন্থমেলার ভূমিকা অনবদ্য।

বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীÑ এসব মাহেন্দ্রক্ষণ সামনে রেখে ২০১৯ অমর একুশের গ্রন্থমেলার মূল প্রতিবাদ্য বিষয় করা হয়েছে ‘বিজয়’।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে