কবিতার অদ্ভুত আনন্দ

  ফারুক সুমন

১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্পের শাখায় কবিতা এমন একটি প্রবাহের নাম। ভাষাহীন বোবা অনুভূতি কবিতা হয়ে ভর করে। সোনাদানা কিংবা উচ্চমার্গীয় কোনো প্রত্যাশা নেই। তবু একজন কবি শব্দের আরাধনায় কাটিয়ে দেন মূল্যবান এক জীবন। শব্দ-শস্যের সম্ভাবনায় কবির অপেক্ষার সীমা নেই। এখানে যেন কবি গেয়ে ওঠেন ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।’ একজন কবি জীবনের সার্থকতার গান শুনতে পান বলেই কবিতায় খোঁজেন জীবনের স্ফূর্তি ও সম্ভাবনা। কবিতার জন্য, শুধু কবিতার জন্য কত বদনাম কবুল করে একজন কবি পথ চলেন। কবিতার পথে চলতে চলতে আমৃত্যু তিনি দহন মেনে নেন হৃদয় গহনে। কবির ভাষায় উপলব্ধি হয়তো এ রকমÑ ‘কবিতার জন্য কবুল করেছি অনেক বদনাম/ভুল পথে হেঁটে গেছি এতটাই দূরে যে/প্রত্যাবর্তন কোনো অর্থই বহন করে না’ (খালেদ হোসাইন)। ধূলিমলিন বসনে কবি যাপন করেন নিখাদ মানবজীবন। তিনি অনুভব করেন পরিশেষ জীবনের গন্তব্য মূলত অনিশ্চিত। কৃত্রিম পোশাক কিংবা বেশভূষায় বাহ্যিক চাকচিক্যের জৌলুস থাকলেও মানবমুক্তির তরে অন্তরে গোপন আনন্দের উদ্ভাস ঘটাতে হবে।

কবি স্বপ্ন দেখেন সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কবিতার বৃহৎ ভূখ-জুড়ে তাই মানুষের জয়গান। মানবতার জয়গান। পৃথিবীতে হাজারো ভাষা আছে। সব ভাষাতেই কবিতা রচিত হয়। কিন্তু ভাষা স্বতন্ত্র হলেও কবিদের জীবনযাপন ও জীবনদর্শন প্রায় নিকটবর্তী। পৃথিবীর মানচিত্রে যে অংশেই কবি অবস্থান করুন, অনুভব ও উপলব্ধির অঙ্গীকারে কবিরা যেন একই কান্নাহাসি সাঙ্গ করে বেঁচে আছেন। কবি মানেই ভিন্ন ভাবনার কেউ। কবি মানেই প্রবাহিত স্রোতের বিপরীতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। বাতাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কবি জানতে চান বাতাসের গতিপ্রকৃতি। মত ও পথের প্রাগ্রসর ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন বলেই সমকালে কবির ভাগ্যে জোটে উন্মাদের অভিযোগ। মহৎ কবি এসবের তোয়াক্কা করেন না। কারণ তিনি হয়তো অনুমান করতে পারেন পৃথিবীতে উদয়াস্তের সংজ্ঞা কী। হ্যাঁ, এটা এই অর্থে হয়তো উন্মাদনা। মাত্র একটি কালোত্তীর্ণ পঙ্্ক্তি একজন কবিকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে। কবির অভিমুখ শিল্পপানে। সময় এবং সময়জ্ঞান দুই বাহুতে ভর দিয়ে একজন কবিকে উড়তে হয় শিল্পাম্বরে। কবিতার মৌলিকতাই একজন মহৎ কবির শিল্পস্বর চিহ্নিত করে। ফলে প্রতিটি পঙ্্ক্তি সৃষ্টিমুহূর্তে কবি বহন করেন শ্রেষ্ঠত্বের অহঙ্কার। তার কাছে একটি মনোমুগ্ধকর পঙ্্ক্তির সৃষ্টি মানে জীবনের সার্থক উন্মোচন।

পৃথিবীর সব মানুষই কবি। কবিতা হচ্ছে কবির অন্তর আহরিত বাণী বিন্যাস। আবেগ ও কল্পনার উচ্চমার্গীয় বহির্প্রকাশই কবিতা। আবেগ ও কল্পনা যদি কবিতার অন্যতম প্রধান রসদ হয়, তবে স্বভাবতই মানুষ কবি। কারণ প্রত্যেকটি মানুষ আবেগ ও কল্পনা আশ্রয় করে যাপন করে শিল্পজীবন। কেবল কাব্যিক ভাষা নেই বলে, অনুভব ছন্দোবদ্ধ ও আলঙ্করিক সৌন্দর্যে প্রকাশ করতে পারে না বলেই কবি অভিধা তাদের কপালে জোটে না। মানুষমাত্রই ভেতরে বোবা, ভাষাহীন এক কবিসত্তা লালন করে। কবিতা অদ্ভুত এক আনন্দদুয়ার অবারিত করে অনুরাগীর অনুভবে। আভাসে-ইঙ্গিতে, শব্দ-সৌন্দর্যে সাঙ্গীতিক মূর্ছনায়, উপমা ও চিত্রে তৈরি হয় কবিতার নান্দনিক ভুবন। যেখানে কবিতানুরাগী নিজের স্বপ্ন-কল্পনা, আবেগ, মেধা ও অভিজ্ঞতার স্তরানুযায়ী পরিভ্রমণ করে যখন তখন। ফলে ব্যক্তিভেদে কবিতার উপভোগ ও উপলব্ধিতে দেখা দেয় পার্থক্য। আর এটাই স্বাভাবিক। কবিতা এক ধরনের আশ্রয় বৈকি। মানুষের সুখ-দুঃখের বিবরণ প্রতীক ও ব্যঞ্জনাবহ শব্দরাজিতে মূর্ত হয়ে ওঠে কবিতায়। ধরা-অধরার দোলাচলে মানুষ জীবনব্যাপী কবিতার রূপরসগন্ধ অনুভবের চেষ্টা অব্যাহত রাখে আমৃত্যু। কিন্তু পায় কী? শিল্পের এ অতৃপ্তিই শিল্পের চূড়ান্ত ক্ষমতা। কবিতা ভাবপ্রধান শিল্পমাধ্যম। ভাবপ্রধান বলেই কবিতায় সমর্পিত কবি এক ধরনের ঘোরের ভেতর নিমগ্ন থাকেন। একটি পঙ্্ক্তির আশায়, একটি স্বপ্নময় শব্দের সন্ধানে কবি আপন অন্তরাত্মা সঁপে দিয়ে অস্থির অপেক্ষায় থাকেন। শুধু কবিতার অভিলাসে ছিপ ফেলে ঠায় বসে থাকেন ভাবের পুকুরে। অদৃশ্যলোকের শব্দপ্রত্যাশায় স্বপ্নকল্পনায় মগ্ন হয়ে মনে মনে চলতে থাকে কবিতার জিকির। ব্যঞ্জনাবহ শব্দই কবির আরাধ্য। কেবল শব্দের আশায় দীনহীন জীবনযাপনে তার কোনো আক্ষেপ নেই। এ কারণে কখনো কখনো কবিকে উন্মাদ আখ্যা বরণ করে সমাজ কিংবা স্বদেশচ্যুত হতে হয়।

স্রষ্টার সৃষ্টিরাজির মাঝে কবি এক অনন্য স্রষ্টা। অকল্পনীয় দৃশ্যের উন্মোচন, অনাস্বাদিতপূর্ব অনুভবের আবিষ্কার, অনির্বচনীয় আনন্দের উৎসদুয়ার কেবল কবিই মেলে ধরতে পারেন ভাষাসৌকর্যে। মাঝির যেমন দাঁড়টানা হাতে কড়া পড়ে, কবিও কবিতার ধ্যানে ক্লান্তিহীন পরিব্রাজক। কবির কলিজায় কবিতার আরাধনায় স্বপ্নানন্দের কড়া পড়ে। কবিতার অপেক্ষায় কবির আক্ষেপ সীমাহীন। কবি বিশ্বাস করেন, তার হাতেই বুঝি সৃষ্টি হবে সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। এই বিশ্বাস কবিকে স্বীয় লেখায় সচল রাখে। একজন কবির অন্তরে শব্দপতন কিংবা পঙ্্ক্তির পতন কিছুটা নক্ষত্রপতনের মতো। একটি শব্দ কিংবা পঙ্্ক্তির উদয়নে কবি অস্থির হয়ে ওঠেন পরের শব্দ কিংবা পঙ্্ক্তির অপেক্ষায়। দিন যায় রাত আসে, রাত যায় দিন আসে। কিন্তু কবির প্রতীক্ষার অন্ত নেই। কখন কৃপা হবে কবিতাদেবীর, নক্ষত্রপতনের মতো শব্দপতন হবে কবির অন্তরাকাশে। ক্লান্তিহীন এই অপেক্ষা কেবল একজন কবিই করে থাকেন। এই ব্যাকুলতা শুধু ব্যঞ্জনাবহ শব্দের, অন্তর আহরিত শব্দের প্রত্যাশায়। এতেই কবির আনন্দ, অদ্ভুত আনন্দ।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে