যেমন চাই একুশে বইমেলা

  ইকবাল খন্দকার

০৬ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি বছর শেষ হওয়া মানে যেমন নতুন বছরের আগমন, ঠিক তেমনি একুশে বইমেলার জোর প্রস্তুতি। এখন চলছে সেই প্রস্তুতির সময়। তাই এখন আমরা আমাদের প্রত্যাশার কথা জানাতেই পারি। একটা সময় ছিল, যখন মেলা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে এটা শুনলেই আমরা নানা দুশ্চিন্তায় ভুগতাম। নতুন জায়গায় মেলা জমবে কিনা, মেলার সেই প্রাণ থাকবে কিনাÑ এ রকম আরও অসংখ্য প্রশ্ন আমাদের মনে জাগত। কিন্তু এসব প্রশ্ন এখন উত্তরে পরিণত হয়েছে। হ্যাঁ, নতুন জায়গায়ও মেলা জমছে, মেলার প্রাণও আছে। শুধু তাই নয়, দুই ভাগে ভাগ হওয়ার মধ্য দিয়ে মেলার পরিধি বাড়ার কারণে এখন মেলার প্রাণবন্ত আমেজটা আরও বেড়ে গেছে। তবে এর মধ্যেও কিছু অব্যবস্থাপনা আমাদের চোখে পড়েনি তা কিন্তু নয়। আমরা মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করব, আগামী মেলায় যেন এই অব্যবস্থাপনাগুলো আর দেখতে না হয়। প্রথম যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলা স্থানান্তর করা হয়, তখন সবার একটাই অভিযোগ ছিল মূল রাস্তা থেকে মেলার অবস্থান বেশ দূরে হওয়ায় ক্রেতা-পাঠকরা বুঝতেন উদ্যানে মেলা হচ্ছে। যে কারণে দাবি ছিল মেলাটা যাতে রাস্তাসংলগ্ন করা হয়। এ দাবির অনেকটাই পূরণ হয়েছিল ২০১৬-এর বইমেলায়। কারণ এ মেলায় বেশ ক’টি স্টল ফেলা হয়েছিল রাস্তার কিনারঘেঁষে। এতে মেলায় আসা বইপ্রেমী ও রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকজনের বুঝতে অসুবিধা হয়নি এখানে মেলা হচ্ছে। তবে আমাদের দাবি, স্টলগুলো যেন আরেকটু পরিকল্পিতভাবে ফেলা হয়। দেখা যায় স্টল রাস্তার পাশ থেকে শুরু হলেও লম্বা হয়ে চলে যাচ্ছে অনেক দূর পর্যন্ত। এত দূর, যত দূর পর্যন্ত পাঠকরা যেতে চান না। যদি স্টলগুলো পরিকল্পিতভাবে ফেলা হয়, তাহলে মেলার শেষ মাথা এত দূর পর্যন্ত যাওয়ার কথা নয়। আরও অল্প জায়গার মধ্যেই পুরো মেলা গুছিয়ে ফেলা সম্ভব। এতে নানাভাবে উপকৃত হতাম আমরা। পাঠকের উপকারের কথাটাই আগে বলি। যদি পরিকল্পিতভাবে স্টল ফেলা হয়, যদি স্টলগুলোর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা রাখা না হয়, তাহলে পাঠকরা অল্প জায়গা ঘুরেই তাদের পছন্দের সব স্টল পেয়ে যাবেন। অপ্রয়োজনীয় বিস্তৃত জায়গা ঘুরে তাদের আর কান্ত হতে হবে না। এবার বলি প্রকাশকদের উপকারের কথা। দুই স্টলের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা রাখলে যেসব প্রকাশনীর স্টল একটু দূরে পড়েছে, তারা এই ফাঁকা জায়গায় চলে আসার চেষ্টা করে। অনেকের চেষ্টা সফলও হয়। এতে পুরো মেলার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। যদি অপ্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গাগুলো না রাখা হয় আর পুরো মেলার স্টলগুলো ফেলা হয় পরিকল্পিতভাবে, তাহলে সব স্টলই থাকবে পাঠকদের সাধ্য ও দৃষ্টিসীমার মধ্যে। ফলে কোনো প্রকাশককেই আর স্থানান্তরের চিন্তা করতে হবে না। তবে হ্যাঁ, এর পরও যদি কোনো প্রকাশক এ অনিয়মটি করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এই বিশ^াস আমাদের আছে। বাংলা একাডেমি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতনও বটে। এই সচেতনতা আগামী মেলার সময়ও অব্যাহত থাকবে, এমন প্রত্যাশা সবার। পাঠকরা প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করেন নির্দিষ্ট স্টলের নাম্বার জানা থাকলেও নাকি সেটি খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ স্টল নাম্বারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে স্টল ফেলা হয় না। সাজানো-গোছানো মেলার স্বার্থে এ বিষয়টির দিকে মনোযোগ দেওয়া অবশ্যই জরুরি। ধরা যাক কেউ ৫ নম্বর স্টলটি খুঁজছেন। তিনি যাতে ২০ নম্বর কিংবা ১০০ নম্বর স্টলে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারেন ৫ নম্বর স্টলটা কোন দিকে হতে পারে, সেই ব্যবস্থাটা রাখা আবশ্যক। এতে স্টল খুঁজে বাড়তি সময় নষ্ট করতে হবে না পাঠকদের। বাংলা একাডেমি চত্বরে যখন শিশু কর্নার ছিল, তখন শিশুরা সহজেই সেটি খুঁজে বের করতে পারত। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশু কর্নার নিয়ে যাওয়ার পর বিপাকে পড়তে হচ্ছে শিশু ও তাদের অভিভাবকদের। কারণ প্রথম দেখায়ই শিশু কর্নারকে চিহ্নিত করে ফেলার মতো বিশেষ কোনো নিদর্শন সেখানে নেই। যা আছে, সেটাও সেভাবে চোখে পড়ে না শিশু কর্নারের অবস্থান মেলার ভেতরের দিকে হওয়ার কারণে। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি নিয়ে ভাববে এবং কীভাবে শিশু কর্নারটিকে শিশুদের আকর্ষণের জায়গায় পরিণত করা যায় সেই ব্যবস্থা নেবেÑ এই প্রত্যাশা সবার। যারা শিশুদের নিয়ে মেলায় ঢোকেন, তারা প্রথমেই যান বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। গিয়ে যদি দেখেন সেখানেও শিশুতোষ বই পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে তারা আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢোকার প্রয়োজন মনে করেন না। এতে তাদের জানাই হয় না শিশু কর্নার তাদের জন্য বইয়ের কত বিশাল ভা-ার সাজিয়ে বসে আছে। তাই শিশুতোষ বইয়ের স্টলগুলোকে দুপাশে না রেখে এক পাশে অর্থাৎ শিশু কর্নারে নিয়ে যাওয়া আবশ্যক। তাহলে অভিভাবক ও শিশুদের বিভ্রান্ত হতে হবে না। বছর দুয়েক আগেও মানুষ মেলায় যেতে ভয় পেত ধুলাবালির কারণে। কিন্তু এখন এ সমস্যাটি নেই। কারণ এখন নিয়মিত পানি ছিটানো হয়। পানি ছিটানোর এ প্রক্রিয়াটি আগামীতেও সচল থাকলে ক্রেতা-দর্শককে আর মেলার ধুলাবালি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। এক প্রকাশনীর বই অন্য প্রকাশনীর স্টলে পাওয়া যায়Ñ এটি একটি পুরনো অভিযোগ। বইমেলাকে এই অভিযোগমুক্ত রাখার জন্য বাংলা একাডেমির বিশেষ একটি টিম মেলার স্টলে স্টলে ঘুরে থাকে। আমাদের দাবি, এই নজরদারিটা এবার আরও বাড়–ক। প্রকাশনীগুলো কেবল নিজেদের বই-ই রাখুক। নইলে প্রকাশনীর স্বকীয়তা নষ্ট হয়। সর্বোপরি প্রশ্নবিদ্ধ হয় মেলার নিয়মশৃঙ্খলা। বছর চারেক আগে হঠাৎ করেই বইমেলায় ডোরেমনের জোয়ার এসেছিল। ডোরেমনের জন্য মৌলিক কোনো শিশুতোষ বই সেভাবে বিক্রি হচ্ছিলই না। এরপর মৌলিক লেখক ও প্রকাশকদের প্রতিবাদের মুখে ভাটা এসেছে এই জোয়ারে। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, এটা বলা যাবে না। এখনো মেলার অনেক স্টলেই ডোরেমন এবং এই জাতীয় অনেক বই-ই বিক্রি হচ্ছে, যা আমাদের মৌলিক শিশুসাহিত্যের জন্য অনেক বড় হুমকি। আমরা আশা করব, বাংলা একাডেমি কঠোর অবস্থানে থেকে এই হুমকি মোকাবিলা করবে। নিশ্চিত করবে একুশে বইমেলা কেবল মৌলিক বইয়েরই মেলা। অমৌলিক কিংবা পাইরেটেড বই বিক্রির জায়গা একুশে বইমেলা নয়। প্রতিবছরই দেখা যায় মেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পরও অনেক স্টল সাজানোর কাজ চলছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটি হয় শেষ মুহূর্তে মেলার স্টল পরিকল্পনা এবং তৈরির কাজ করার জন্য। তাই সবারই দাবি ছিল যাতে কাজগুলো আগে থেকেই করা হয়। এবার বাংলা একাডেমিকে অন্যান্য বছরের চেয়ে তৎপর মনে হচ্ছে। তাই আমরা আশাবাদী, এবার মেলা শুরু হওয়ার পর আর কোনো অর্ধসজ্জিত স্টল দেখতে হবে না, শুনতে হবে না হাতুড়ি-কাঠের ঠুকঠাক আওয়াজ। প্রতিবারের মেলায় একবার করে হলেও বৃষ্টি হয়। আর এই বৃষ্টিতে হাজার হাজার টাকার বই নষ্ট হয় প্রকাশকদের। কিন্তু স্টল বানানোর সময় বৃষ্টির বিষয়টি মাথায় রাখলে অবশ্যই এ ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চলতি বছরের মেলা যখন বৃষ্টি আর ঝড়-তুফানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হলো, তখন অনেকেরই ধারণা ছিল মেলা ফাঁকা যাবে। কিন্তু বিকাল হতে না হতেই মানুষের ঢল নামল। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় পাঠকদের ফিরে যেতে হয়েছে সূর্যাস্তের পর পরই। অথচ এইটুকু জায়গার বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা খুব কঠিন কাজ ছিল না। আন্তরিকতা ও তৎপরতা থাকলেই হতো। আগামী মেলা এ ধরনের কোনো সমস্যার মুখোমুখি হবে না, এ বিশ^াস আমাদের আছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে হঠাৎ করে মেলার সময় কমিয়ে দেওয়ায় বইপ্রেমীরা হতাশ হয়েছিলেন। তবে এবার সেই হতাশা অনেকটাই কেটে যাবে। কারণ আগামী মেলার সময় আধা ঘণ্টা বাড়ানো হবে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ এ বছর মেলার ফটক রাত ৮টায় বন্ধ হলেও আগামী বছর বন্ধ হবে সাড়ে ৮টায়। এটি অবশ্যই সবার জন্য ইতিবাচক একটি ব্যাপার। এতে যারা অফিস-আদালতে চাকরি করেন, তারাও চাইলে প্রতিদিনই মেলায় আসতে পারবেন। একুশে বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। তাই আমরা চাই বিগত বছরগুলোর ছোটখাটো অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে উঠে আগামী মেলাটি হয়ে উঠুক শতভাগ পরিকল্পিত, গোছানো ও দৃষ্টিনন্দন।

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে