শিল্প ও নন্দন উপচার সৌম্য সালেক

  আমিনুল ইসলামের কবিতা

০৬ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অবলোকনের সার্বিক গুণ চূড়ান্তভাবে কবির দৃষ্টিতেই সম্পন্নতা লাভ করে। এ দৃষ্টির মধ্যে একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে চিত্ত, চক্ষু, রূপচিত্র, আলোক এবং ভাবরাশি। তার পর সেই অভিজ্ঞতার সঞ্চিত স্ফূর্তি ভাষার মাধ্যমে বিমুক্ত হয় এবং পাঠের মাধ্যমে ঋদ্ধ চেতনার সেই মনন-কৃত্য আমাদের উপলব্ধিকে স্পর্শ করে ভাবে-বেদনায়, বিবিধ উদ্ভাসনে। ‘আমার সব কথা প্রস্তুত ছিল ভালবাসার মঞ্চে যৌথ/ ঘোষণা হওয়ার মুগ্ধ প্রতীক্ষায়/ তারা আহত বলাকা হয়ে পড়ে আছে বারান্দায়/ তাদের ডানায় বিদ্ধ হচ্ছে নীরবতার বুলেট/ অথচ আর্তধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে না/ তারা স্বপক্ষীয় ফায়ারে বিদ্ধ সৈনিকÑ হতাশ ও হতবাক।’Ñ ‘দাঁতাল স্তব্ধতা’ শিরোনামের এই পাঠ আমিনুল ইসলামের কবিতা থেকে নেওয়া। বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিবিশেষ আর্তি বা রোদনের সঞ্চার ঘটলেও সমষ্টিকে ছুঁতে চায় না যেন, কিন্তু যখন তা প্রাত্যহিকতাকে মারাত্মকভাবে মেরে যায়, তখনি তা সবাক রোদনের সঙ্গে ছুঁয়ে যায় সমগ্র পরিধি; এই হানা হাঙরের মতো নীরব ঘাতক। কবির চোখ তাকে উদ্ভাবনে নিয়ে আসে শিল্পের সূক্ষ্ম বুননে। এখানে প্রশ্ন হতে পারে, কবিতায় শিল্পের দৃশ্যরূপ বা প্রকাশ কেমন? অনুভূতি প্রতিটি স্বাভাবিক মানুষের মধ্যেই সক্রিয় থাকে। এমনকি কতক অনুভূতি জীবজন্তুও অনুধাবনে সক্ষম। আসলে এখানে পার্থক্যটা হচ্ছে বর্ণনা বা উপস্থাপনগত। হাসি, কান্না, বিষাদ, বিসম্বাদ, বিরহ, বিয়োগ, উচ্ছ্বাস ও প্রাপ্তির অনুভূতি যখন চূড়ান্ত অভিব্যক্তি লাভ করে তার দৃশ্যায়ন বা শব্দ সজ্জার মধ্যেই শিল্পের বিস্তার ও প্রকাশ; এর মধ্যে ধ্বনি এবং শব্দ-বিন্যাসের নৈপুণ্য ভাব ও বক্তব্যের আবেশকে পরম রূপ শক্তি দেয় আর যখন সেই পঠনÑ ভাবনাকে আকর্ষণ করে সেটাই কবিতার শিল্পকীর্তি। তবে কবিতার শিল্পরূপ যে কেবল উচ্চকণ্ঠ তা কিন্তু নয়, বরং অধঃনত বোলেও কবিতা উচ্চ-শিল্পের অধিগমনে উন্নীত হতে পারে। এমন কিছু শিল্পসার্থক কবিতা আছে যার উপলব্ধি ও অনুভবের জন্য বারবার চেষ্টা চালাতে হয়। বর্তমান কাব্য প্রবণতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বক্তব্যের চেয়ে প্রকরণের দিকেই কবিদের মনোযোগ অধিক লক্ষণীয়। বক্তব্যের স্পষ্টতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা এখানে বুদ্ধদেব বসুর কিছু পাঠ তুলে ধরছি : ‘নতুন যারা কবিতা লিখেছেন আজকাল, তারা অনেকেই দেখছি প্রথম থেকেই টেকনিক নিয়ে বড্ড বেশি ব্যস্ত, সেটা কোথা থেকে এসেছে, তা আমি জানি যথাসময়ে তার সমর্থনও করেছি। কিন্তু এখন সেটাকে দুর্লক্ষণ বলে মনে না করে পারি না। ‘চোরাবালি’ বা ‘খসড়া’ লেখার সময় যেসব কৌশল ছিল প্রয়োজনীয় আজকের দিনে অনেকটাই তার মুদ্রাদোষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে; আর তাছাড়া যখন ভঙ্গি নিয়ে অত্যধিক দুশ্চিন্তা দেখা যায়, যেমন চলতিকালে ইংরেজ মার্কিন কাব্যে, তখনই বুঝতে হয় মনের দিক থেকে দেউল হতে দেরি নেই। আমি এ কথা বলে কলাসিদ্ধির প্রাধান্য কমাতে চাচ্ছি না। কিন্তু কলাকৌশলকে পুরো পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার পরও এই কথাটি বলতে বাকি থাকে যে, কবিতা লেখা হয়, স্বরব্যঞ্জনের চাতুরি দেখাতে নয়, কিছু বলারই জন্য, আর সেই বক্তব্য যেখানে যত বড়Ñ যত স্বচ্ছন্দ তার প্রকাশ, প্রকরণগত কৃতিত্ব সেখানেই তত বেশি পাওয়া যায়। মনে হয় এখন বাংলা কবিতায় নতুন করে স্বচ্ছন্দ সাধনার সময় এসেছে, প্রয়োজন হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তিকে ফিরে পাওয়ার।’ আমিনুল ইসলাম, নব্বই দশকের এই কবি সেই স্বচ্ছন্দ এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশেরই অনুগামী। স্বচ্ছন্দ নদীর মতো বয়ে চলার ছন্দ যেখানে বহমান, সেখানেই শিল্পের সম্পন্নতা। তার ‘ভালোবাসার সুপ্রীমকোর্টে দাঁড়িয়ে’ শিরোনামের কবিতা থেকে পাঠÑ ‘মানুষ কত প্রাণীকে হিংস্র, কত প্রাণীকে ইতর এবং/ কত প্রাণীকে আরও কত বাজে বিশেষণে বিদ্ধ করে/ কিন্তু রোদসত্য এই যে, মানুষের সমান নিষ্ঠুর নয় অন্য কোনো প্রাণী/ সুমির স্কুল থেকে উড়ে যাওয়া শিশুপাঠ্যের/ সেদিনের সেই বকসাক্ষী/ মানুষের মতো কৃতঘœ ছিল না গলায়-হাড়-বিঁধে যাওয়া বাঘটি।’

মানুষই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং আগ্রাসী; মানুষ ব্যতিরেকে প্রাণিজগতের অন্য কোনো প্রাণী বা জন্তু তার নিজের সগোত্র বা স্বজাতির জন্য এতটা ভীতিকর বা রুক্ষ নয়। কবিতাংশে যেমন শিল্পের স্বচ্ছন্দ আছে, তেমনি আছে বক্তব্যের দৃঢ়তা। আধুনিক সাহিত্যে কাল, শিল্প ও স্মরণ সংক্রান্ত লক্ষণ থেকে আমরা পাইÑ কবির অনুভূত কাল, অতীতের প্রভাব, স্মৃতি ও আত্মব্যাখ্যা এবং নিরন্তর পরিবর্তন। এসব অনুষঙ্গ এবং প্রকরণ প্রভৃতি যখন কবির মধ্যে স্বত্বঃস্ফূর্তভাবে সংক্রামিত হয় তখনই তিনি উচ্চারণ করতে পারেন, মহার্ঘ বাক্যবন্ধÑ যার গভীরে থাকে বোধ, বক্তব্য ও চৈতন্য এবং বহির্পার্শ্ব সজ্জিত থাকে শিল্পের নিবিড় কুশলতায়; কবিতার শীর্ষনাম ‘অপ্রস্ফুটিত দুপুর’Ñ ‘হাতের তালুতে সূর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সময়/ অর্ধ-আবৃত পৈথানে/ ছোঁয়ামাত্র রাজকুমারীর চোখ মেলে জেগে উঠবেন পরী/ জেগে উঠেই হয়ে যাবেন স্রোত-ঢেউ-বাঁক/ কিন্তু কোথাও কোনো নৌকার ছায়া নেই/ ভীরু সকাল হয়ে কাঁপছে অপ্রস্ফুটিত দুপুর।’

শিল্পের সীমা আজ কেবল চারু, লিখন ও প্রদর্শনক্রিয়ার মধ্যেই সীমিত নয়; পণ্যায়ন প্রক্রিয়ার এই যুগে শিল্পের বাণিজ্যিক মূল্যের পাশাপাশি এর ব্যাপ্তি বহুদূর সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে পণ্যায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে শিল্পের এই সম্প্রীতির সবটাই যে নেতিবাচক তা কিন্তু নয়। কারণ এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং ঐতিহ্যের যোগসূত্র থাকে। ইংরেজি অবংঃযবঃরপং-এর পরিভাষা নন্দনতত্ত্ব যেখানেÑ সৌন্দর্য, শিল্প, স্বাদ, উপভোগ, মনোজগতের চিত্র ও সৌন্দর্য সৃষ্টি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। এটি আসলে দর্শনশাস্ত্রের একটি শাখা, তবে শিল্পকর্ম ও সাহিত্যমূল্য বিচারে এর যথেষ্ট প্রয়োগ রয়েছে। ‘নন্দন’ শব্দটির অর্থ করলে পাওয়া যায়Ñ যা থেকে আনন্দ পাওয়া যায় বা যার দ্বারা আনন্দ দেওয়া যায় তাই নন্দন। যেহেতু আনন্দের উৎস সৌন্দর্য তাই নন্দন শব্দের বিশেষ অর্থ হবে ‘সৌন্দর্য প্রদায়ক’। নন্দন শব্দের সঙ্গে আনন্দের যোগ থাকলেও সাহিত্যে আনন্দ বলতে কেবল উচ্ছ্বাস, আবাহন, উল্লাস ও প্রাপ্তি নয়Ñ এখানে আনন্দের অর্থ বেদনা, আকুতি, আর্তি এবং বিষাদের অর্থকেও ব্যাপকভাবে তুলে ধরে। আমরা প্রমথ চৌধুরীর কাছে শুনেছিÑ ‘কাব্য জগতে যার নাম আনন্দ তার নামই বেদনা। তবে এই আনন্দ বা বেদনা যখন গভীরভাবে পাঠক মনকে স্পর্শ করবে তবেই সেই সাহিত্যকর্মের সার্থকতা। ইংরেজ রোমান্টিক কবি শেলীর কাছেও আমরা খুব সংশ্লিষ্ট একটি মন্তব্য পাইÑ ‘ঙঁৎ ংবিবঃবংঃ ংড়হমং ধৎব ঃযড়ংব ঃযধঃ ঃবষষ ড়ভ ংধফফবংঃ ঃযড়ঁমযঃ’. কিছু মহৎ কবিতার মধ্যে বিষয় অন্তরীণ থেকে এমন প্রকাশ ফুটে উঠে যা স্পষ্টতÑ না আনন্দের, না বেদনার; তবু কোথাও যেন সেখানে জীবনের আশ্বাস খুঁজে পাওয়া যায়। কবি আমিনুল ইসলামের শিল্পসম্মত তেমন একটি স্তবক তুলে ধরছি, কবিতার শিরোনামÑ ‘কাঁটা ভরা আলো ক্ষতবিক্ষত হাওয়া’

‘হোমারে পাশে বসে বন্ধ দুটি চোখ দেখে

আলোর কাঁটা মেলে সূর্য এক মাতাল সজারু

নগ্ন পায়ে নেচে যায় আর

ভাঁজ খোলা হৃদয়ের দুই পাশে

ছড়িয়ে পড়ে ছিন্নভিন্ন শান্তিকামী সবুজের চারা।’

‘কাব্য রহস্য সৃষ্টি করতে পারে, মানব মনে অনুপ্রেরণা আনতে পারে, সাধারণের উপভোগের অতিরিক্ত একটা আনন্দবোধ জাগাতে পারে, কিন্তু কবিতা প্রধানত এবং মূলতÑ ভাষার সম্ভাবনা নির্ণয় করে থাকে। এভাবে ভাষার সম্ভাবনা নির্ণয়ের মধ্যেই কবিতার ঐতিহ্য নিহিত থাকে।’ কবিতার শিল্প ও সম্পন্নতা সম্পর্কে এই মন্তব্য সৈয়দ আলী আহসানের। এই নিক্তি মোতাবেক এবং ধ্বনিগত সৌকর্য বিবেচনায় আমিনুল ইসলামের কবিতা নানাস্থলে ও নানান ভাব-রূপ মর্মে মহার্ঘ হয়ে উঠেছে। ভাব ও বক্তব্যের সঙ্গে শব্দ ব্যবহারের যে ঐক্য প্রয়োজন তা রক্ষায় কবি গভীর নিষ্ঠা বজায় রেখেছেন। স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে তিনি যোগ করেছেন শিল্পের নিত্য-অনুষঙ্গ, বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার সারৎসার; যা তার কবিতাকে স্বতন্ত্র আলো দিয়েছে। আঁধার বিনাশক হলেও আলোর তাৎপর্যে তা যেমন অস্তিত্ব রক্ষায় অপারগ তেমনি কেবল শিল্প ও সুন্দরের সক্ষমতাই উন্নত শিল্পকারের প্রতি স্বাভাবিক দৃষ্টি ফেরাতে যথেষ্ট। সেই উচ্চ-শিল্পকীর্তিই আমিনুল ইসলামের কবিতাকে আনন্দ সমাগমে উপযুক্ত স্থান দেবে। যুগের চলার সঙ্গে অভিনবত্ব বজায় রেখে যেসব কবিতা হাজার বছর অতিক্রম করে আমাদের হাতে পৌঁছেছে, আমিনুল ইসলামের কবিতা সেই ধারাবাহিকতারই সমকালীন স্বতন্ত্র সংস্করণ আর এই শিল্পগুণই তার কবিতাকে কালোত্তর কালে পৌঁছে দেবে বলে বোধ করছি।

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে