মায়ের জন্য পঙ্্ক্তিমালা

  জান্নাতুল ফেরদাউস মিতু

০৬ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজ মধ্যরাতে দুঃস্বপ্নের পর ঘুম ভেঙেছিল তীব্র উত্তাপে। পুড়তে থাকা তেতো জ্বরেও ঘোলা চোখ আমার উজ্জ্বল হয়ে উঠল এই সকালে। আজ মিলেছে একটু অবসর, একটু সময় তোমাকে দেওয়ার। তাই পাথর প্রবাসের বাসি সকালেই তোমার সঙ্গে কথা বিনিময় যন্ত্রের এপাশে-ওপাশে চলছে আত্মার কথোপকথন। ঘোর জ্বরের মাঝেও আমার উত্তপ্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে প্রশান্তি। ওপাশে তোমার রুটিনমাফিক আহত দীর্ঘশ্বাস আর এপাশে তোমার সেই নিঃশ্বাসে আমার প্রগাঢ় চুম্বন। এই ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত জীবনে আমার এই একটি মাত্র সুখ। মা, কত দিন তুমি ছুঁয়ে দাওনি আমার মুখ, কত দিন তোমার শীতল শরীর জড়িয়ে পাখির ছানার মতো আশ্রয় খুঁজিনি আমি। আশ্রয় ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে আমি আজ নির্বাসিত মা। ভীষণ ব্যস্ত আমি যখন ছুটে চলি এই শহরের গলিতে, রাস্তায়, মেট্রো, বাসের ভিড়ে, লোকারণ্যে, চাতকের মতো তোমার মুখ খুঁজে ফিরি অচেনা মুখের ভিড়ে। যখন ভীষণ তুষারে ঢেকে যায় এই শহর, ছুটির ওই একটু বিকেলে সেই শুভ্রতাকে তোমার আঁচল ভেবে ভ্রম হয় আমার। মা, শুধু তুমি নেই বলে অভিজাত এই শহর আমার কাছে বিষণœ-শূন্য নগর, মা এখানে আমি তপ্ত রোদে পাই না ছায়া শুধু তুমি নেই বলে। শুধু তুমি নেই বলে বড় একা অবিরাম নির্ঘুম চোখে জেগে থাকি সুদীর্ঘ রাত। আমার রু চুলে ঘুম ঘুম বিলি কেটে দেওয়া মা, আমার শুকনো ভাতে ঝোল ঢেলে দেওয়া মা, আমার মলিন কাপড়ে রঙিন ফুল তুলে দেওয়া মা, আমার শীতের রাতে শরীরে ওম জড়িয়ে দেওয়া মা, আমাকে ছাড়া তুমি কেমন করে বেঁচে আছ আমি খুব জানি মা। তবু যান্ত্রিক মানুষের এই শহরে কিচ্ছু বলতে নেই মা। মা, আমি তোমার গল্পের সেই স্বার্থপর ঘুঘু পাখিÑ যে উড়তে শিখেই আহত মাকে রেখে পালিয়েছিল। তোমাকে অনিশ্চয়তায় ফেলে হাজার মাইল দূরে আমি খুব ভালো আছি, শুধু এটুকুই জেনে রেখো মা। শেষ রাতের প্রার্থনা শেষে জায়নামাজের ভাঁজে তসবি গুঁঁজে, বিশাল পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তুমি যখন আমার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুতি গাইছ, যখন চায়ে শুকনো রুটি ভিজিয়ে খাচ্ছÑ এখানে আমার তখন ভীষণ ব্যস্ত জীবন। মা, তখন আমার অন্য কিছুই ভাবতে নেই, ভাবতে গেলেই আমার গোছানো সংসার উদোম পড়ে রয়, রোজনামচা এলোমেলো হয়, সব কাজে দেরি হয়ে যায়। দৌড় থামিয়ে এইকালে দাঁড়ানোর নিয়ম নেই মা। তুমি তো জানো না, আজকাল মেকি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে এক অদৃশ্য উটের পিঠে চড়ে বসেছি আমরা সবাই। সেই উট আমাকে কোথাও নামাবে না, না তোমার কাছেও না। আমার প্রতীায় থাকা মাÑ তুমি চলে যাবে শেষ ঘুমে একদিন, জানি তোমার শেষ নিঃশ্বাসেও থাকবে আমার জন্য মঙ্গল প্রার্থনা, আর আমি রয়ে যাব আমৃত্যু দ-িতের মতো এক জীবন্ত ফসিল হয়ে।

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে