জসীমউদ্দীন ও তার প্রবন্ধ

  মাহমুদুল বাসার

০৬ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন ১৯০৪ সালের ১ জানুয়ারি ফদিরপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসুর প্রায় সমসাময়িককালে জসীমউদ্দীন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কলকাতা শহরেই তার কাব্য প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল। প্রায় রবীন্দ্র-নজরুলের মতোই অল্প বয়সে তার কবিত্ব শক্তি দ্যুতি ছড়িয়েছিল। জসীমউদ্দীনের ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্য এখানে যে, তিনি রবীন্দ্র দ্রোহী তিরিশের উজান ঠেলে লোকজ, ছন্দবদ্ধ কবিতা লিখে খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কাব্যপ্রতিভা দিয়ে তিনি বিশ্বপরিম-ল থেকেও বাঙালির জন্য সম্মান কুড়িয়ে এনেছেন। এই প্রতিভাবান কবির জন্মদিনে আমি তার প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করব। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বলেছেন, ‘কবিদের গদ্য খুব আকর্ষণীয়।’ কথাটি মনে আছে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের গদ্য সেভাবে আমাকে আকর্ষণ করেছে।

কবিতায় জসীমউদ্দীন রবীন্দ্র-নজরুলের মতোই অসাধ্য সাধন করেছেন। নিজেই একটি ধারা সৃষ্টি করেছেন। যখন তিনি কবিতায় নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছেন, তখন রবীন্দ্রধারার বিপক্ষে তিরিশের ধারা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। জসীমউদ্দীন গ্রামীণ-লোকসম্পদ ভিত্তি করে সরল-ছন্দবদ্ধ কবিতা লিখে জয়ী হয়েছেন। ড. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, জসীমউদ্দীনও আধুনিক কবি; তিনি গ্রামের কবি কিন্তু গ্রাম্য কবি নন। প্রবন্ধেও এই গুণ আছে, সরলতা, লোকমনস্কতা এবং আধুনিকতা।

‘তার ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়’ গ্রন্থটি বাংলা গদ্য সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ। যদিও ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদে সাধুরীতি রক্ষা করেছেন জসীমউদ্দীন, তবুও অকপট সারল্য আর উৎকর্ষের সমন্বয়ে শিল্পগুণসম্পন্ন গদ্যই উপহার দিয়েছেন। কবিতায় জসীমউদ্দীন যেমন লোক ভিত্তি আর আধুনিকতা রক্ষা করেছেন, তেমনি ঠাকুর বাড়ির আঙিনা গ্রন্থের গদ্যেও সেই রীতি রক্ষা পেয়েছে। ঠাকুর পরিবারের তিন পুরুষের স্মৃতিচারণা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন বিশ্বকবি, আরেকজন ভারতখ্যাত চিত্রশিল্পী-গদ্য লেখকও, অন্যজন বিপ্লবী রাজনীতিক। গদ্য সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরও লিখেছেন। ‘যাত্রী’ তার বিখ্যাত গ্রন্থ। রাশিয়া ভ্রমণের কথা।

রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ ও সৌমেন্দ্রনাথকে কাছ থেকে দেখার অকপট বর্ণনা দিয়েছেন, কান্তিহীনভাবে, গভীর আগ্রহে গ্রন্থটি পড়েছি। ঠাকুর পরিবারে জসীমউদ্দীন সমাদৃত হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ওই পরিবারের আন্তরিকতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। ঠাকুর পরিবারের তিন পুরুষের সহযোগিতা তিনি পেয়েছিলেন। সৌমেন্দ্রনাথ তো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

জসীমউদ্দীন এমন একটা সময়ের স্মৃতিচারণা করেছেন, যখন পুরো উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রখর হয়ে উঠেছে। ‘ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়’ গ্রন্থে এর প্রভাব পড়েছে, প্রাসঙ্গিকক্রমে তার চিত্রও এসেছে। এই গ্রন্থে পেয়েছি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও উত্তেজনা রবীন্দ্রনাথকে কতটা বিচলিত করেছিল। জসীমউদ্দীনকে কাছে পেলেই কবি সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গ তুলতেন। তখন কবি গুরুতর অসুস্থ। একদিন কবিপুত্র রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্দীনকে বললেন, ‘এখন বাবার শরীর অসুস্থ। আপনাকে দেখলেই তিনি হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। তাতে মাঝে মাঝে বড়ই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। অসুস্থ শরীরে এই উত্তেজনা খুবই ক্ষতিকর। আপনি কিছুদিন বাবার সঙ্গে দেখা করবেন না।’ (ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়-পলাশ প্রকাশনী-১৯৯২-পৃ: ৩১)

তখন অর্থাৎ তিরিশের দশকে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গানটি নিয়ে প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের মঞ্চে গানটি গাওয়া হতো। একদিন রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্্দীনকে বললেন, ‘বন্দে মাতরম গানটি যেভাবে আছে, তোমরা মুসলমানরা এ জন্য আপত্তি করতে পার। কারণ এ গানে তোমাদের ধর্মমত ক্ষুণœ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে’ (পৃ: ৩০)।

এর পর জসীমউদ্্দীন বলেছেন, ‘ইহার অল্পদিন পর কলিকাতায় যখন সর্বভারতীয় জাতীয় মহাসভার কার্যকরী সমিতির অধিবেশন বসে, তখন বন্দে মাতরম গান লইয়া তুমুল আন্দোলন হয়। সেই সময়ে একদিন বন্ধুবর সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলিলাম, ‘রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বীকার করেছেন, বন্দে মাতরম গানে মুসলমানদের আপত্তির কারণ আছে। আজ সারা দেশ এই গান নিয়ে একটা বিরাট সাম্প্রদায়িক কলহের সম্মুখীন হচ্ছে, এখন তো কবি একটা কথাও বলছেন না।’ সৌমেন্দ্রনাথ বলিলেন, ‘জওহরলাল নেহরু গানটি রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কবির পরামর্শের ফলে এগানে তোমাদের আপত্তিজনক অংশটি কংগ্রেসের কোনো অনুষ্ঠানে আর গীত হবে না।’ (পৃ: ৩১)।

জসীমউদ্্দীন দুই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের ওপর তিনটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়’ দীর্ঘ প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্র তীর্থে,’ ‘জসীম উদদীনের প্রবন্ধ সমূহ, গ্রন্থে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ ও ‘রবীন্দ্রনাথের নাটক ও সত্যেন্দ্রনাথের কবিতা।’ জসীমউদ্্দীন রবীন্দ্রনাথকে কাছ থেকে কবির আপাদমস্তক ও হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত দেখার সুযোগ পেয়েছেন। তাই অনাড়ম্বর ও অকপট ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ও তার প্রতিভার বৈশিষ্ট্য, তার মতামত, দর্শন, রাজনৈতিক চিন্তা আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। এমন নিরলঙ্কার রবীন্দ্র-বিশ্লেষণ খুবু কমই পাওয়া যায়। বলেছেন জসীমউদ্্দীন যে, রবীন্দ্র প্রতিভা বিকশিত হয়েছে বৈষ্ণব কবিতা, বাউল তত্ত্ব, স্বদেশি মন্ত্রের মিশ্রণ এবং ইউরোপীয় যুক্তিবাদের সমন্বয়। তিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলেছেন, ‘রবীন্দ্র মননে একদেশদর্শী হিন্দুত্বের স্থান ছিল না।’ কবি রবীন্দ্রকে যথার্থ চেনার জন্য জসীমউদ্্দীনের স্মৃতিচারণ ও বিশ্লেষণ খুব সহায়ক। রবীন্দ্রনাথের সীমাবদ্ধতাও তিনি আলোকপাত করেছেন। জসীমউদ্্দীন প্রাণ খুলে আলোচনা করেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ওপর। তাকে নিয়ে দুটি প্রবদ্ধ লিখেছেন। ‘প্রবদ্ধসমূহ’ সংকলনে স্থান পেয়েছে ‘নজরুল ইসলাম’ এবং ‘যাদের দোমাছি’ গ্রন্থে ‘নজরুল’ প্রবন্ধটি স্থান পেয়েছে। জসীমউদ্্দীনের এই দুটি প্রবন্ধ না পড়লে নজরুলকে প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করা কষ্টকর। অত্যন্ত সরসভঙ্গিতে জসীমউদ্্দীন ‘নজরুল’ প্রবন্ধে স্মৃতিচারণা করেছেনÑ নজরুল যে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন তার অভিজ্ঞতা। ভোট চাওয়ার জন্য গিয়েছিলেন কবি ফরিদপুর তমিজউদ্দীন খানের বাড়ি, কিন্তু কবি সেখানে সমাদর পাননি বলে জসীমউদ্্দীন খেদ প্রকাশ করেছেন ‘নজরুল’ প্রবন্ধে। ‘নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধে তিনি নজরুলের কবি প্রতিভা আর সংগীত প্রতিভার মূল্যায়ন করেছেন। প্রবন্ধটি অত্যন্ত গভীরতাব্যঞ্জক। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার সার্থকতা এ প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে, আর আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহারে নজরুল চূড়ান্ত সফল হয়েছিলেন, সে কথা বলেছেন।

‘যাদের দেখেছি’ গ্রন্থে আছে ‘দীনেশচন্দ্র’ প্রবন্ধটি। জসীমউদ্্দীনের অসামান্য প্রবন্ধ এটি। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের ওপর এমন একটি প্রবন্ধ না লিখলে আমরা বুঝতে পারতাম না, জসীমউদ্্দীনের কাব্যপ্রতিভা ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে রবীন্দ্র-অবনীন্দ্রের মতো ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের অবদান কতটা। ড. সেনের প্রতি সবটুকু শ্রদ্ধা নিংড়িয়ে এ প্রবন্ধটি তিনি লিখেছেন। তার ‘কবর’ কবিতা পড়ে ড. সেনের যে প্রেরণাদীপ্ত উক্তি তা বাংলা সাহিত্যামোদীরা জানেন। জসীমউদ্্দীনের প্রতিভাকে এত যতœ করে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ ফুটিয়ে তোলেননি। জসীমউদ্্দীন আমাদের জাতীয় চেতনা থেকে দূরে ছিলেন না। তার প্রবন্ধে পাওয়া যায় মহান ভাষা আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি অসামান্য কবিতা লিখেছেন। তার ‘বাঙলা ভাষায় আরবি হরফ ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিবৃতি’ প্রবন্ধটি পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রীর ফ্যাসিবাদী দৃষ্টির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী উচ্চারণ। পাক শাসকগোষ্ঠী বাঙালির ঘাড়ে উর্দু চাপাতে ব্যর্থ হয়ে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। এই উদ্যোগ সফল হলে বাঙালি জাতির কত বড় সর্বনাশ হতো, জসীমউদ্্দীন তার বিস্তারিত, পা-িত্যপূর্ণ ও যুক্তিগর্ভ বিশ্লেষণ দিয়েছেন।

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে