sara

মোস্তফা কামালের নিঃসঙ্গ পথযাত্রা

  নওশাদ জামিল

০৯ জুন ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্রেফ গল্প বলার জন্য যারা গল্প-উপন্যাস লেখেন, কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল ওই দলের নন। গল্প তিনিও বলেন বটে, বলেন মধ্যবিত্তদের নানা গাথাকথা, তবে তাতে গল্পটাই মুখ্য নয়। তার কাছে মুখ্য বিষয়টা অন্যখানে, অন্য জায়গায়Ñসেটা তার ফিলসফিক্যাল চিন্তায়। গল্প বলতে বলতে মধ্যবিত্তের চৌহদ্দি পেরিয়ে, টানাপড়েন ডিঙিয়ে, হাস্যরসের মধ্য দিয়ে কামাল তার পাঠককে যে বার্তা দেনÑতার অর্থ, আনন্দে বাঁচো, দুঃখেও বাঁচো। পাঠকের মানসপটে এ চিন্তা ও উপলব্ধি ছড়িয়ে দিতে, জীবন সম্পর্কে বিশদ ধারণা উপস্থাপন করতে মোস্তফা কামাল আশ্রয় নেন গল্পের; তার পর ওই গল্প বলতে বলতে তিনি ফিলিংকে থটে রূপান্তর করেন। শেষ পর্যন্ত পাঠক তার গল্প পাঠ করতে করতে কনসেপচুয়ালি এবং ইমোশনালি অনুভব করেন নানা কিছু, সেই অনুভব থেকেই পাঠকদের ভেতর উঁকি দেয় জীবন-জগৎ সম্পর্কে বাঁচার মন্ত্র, আনন্দের মন্ত্র। তার রচনা পাঠ করে, সাহিত্যকর্ম অনুধাবন করে এ কথা বারংবার মনে হয়েছে যে এটাই তার ফিলসফি, এটাই তার থট।

মজার বিষয় এই যে জীবনের গূঢ় ও গভীর অর্থ মোস্তফা কামাল খোলাসা করেন আনন্দের ভঙ্গিমায়। সাহিত্য তার কাছে আনন্দেরই খোরাক; আনন্দের জন্যই তিনি গল্প করেন, কিন্তু তার ভেতর দিয়েই তিনি তার রচনায় যে জীবনের সন্ধান দেনÑমধ্যবিত্তের সেই জীবন, সেই যাপন নানা সংকটে নিমজ্জিত, লেখক সেই সংকটকে নিয়ে হিউমার করেন, সিমপ্যাথিও করেন, তার পর গল্প বলতে বলতে পাঠককে হাত ধরে নিয়ে যান তার ভাবনার জগতে। তার মূল দর্শনই এই যে জীবনে দুঃখ আছে, হতাশা আছে, তবু অনন্ত জাগে হƒদয়ে। মোস্তফা কামাল এই অনন্ত জীবনেরই জয়গান করেন তার রচনায়। তার নায়ক-নায়িকা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে যে জীবন বড় রোমাঞ্চকর, সুন্দর ও পবিত্র।

মোস্তফা কামালের বিখ্যাত উপন্যাস ‘জননী’ পাঠ শেষে কেবলই মনে হয় বিশাল ক্যানভাসে যে গল্প তিনি বলেছেন, সেখানে গল্পটাই মুখ্য নয়, মুখ্য বিষয়টা হলো জীবনের উদযাপন। জননী সানজিদা বেগম প্রাণপণ লড়াই করেন, সংসার উদাসীন স্বামী ছাড়াই একান্নবর্তী সংসার নিয়ে নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করেন, জননীর লড়াকু মানসিকা বলে দেয়Ñজীবনের জয় হবেই। আধুনিক জীবন যেখানে বিচ্ছিন্ন, বহুমাত্রিক টানাপড়েন ত্রস্ত, পুঁজির দৌরাত্ম্যে জীবন যেখানে অন্ধ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখানে সুন্দর ও পবিত্র জীবনের জয়গান মোস্তফা কামালের ক্লাসিক চেতনার সারৎসার।

সাহিত্যকর্মে জীবন-জগৎ নিয়ে যিনি এমন জটিল অর্থ প্রকাশ করেন, যাপিতজীবনে অন্যতর দ্যোতনার কথা বলেনÑব্যক্তিজীবনে তিনি তেমন জটিল নন, কথাসাহিত্যক মোস্তফা কামাল তার গদ্য ভঙ্গিমার মতোই সহজ ও প্রাণবন্ত একজন মানুষ। মনে পড়ে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের ঘটনাটি। মোস্তফা কামালের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল দৈনিক প্রথম আলো কার্যালয়ে, সেটাও প্রায় এক যুগ আগের স্মৃতি। তখন তিনি প্রথম আলোর চিফ রিপোর্টার, আর আমি ওই পত্রিকারই সামান্য এক রিপোর্টার; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ফাঁকে প্রথম আলোয় কাজ করি। ব্যক্তিক পরিচয়ের বেশ আগেই যখন তাকে চিনতাম না, জানতামও নাÑতখন তার একটি বই পড়েছিলাম। বইটির নাম ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশ’; একাডেমিক কাজের জন্য অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে সেই বইটি কিনেছিলাম, আদ্যপান্ত পড়েওছিলাম। প্রথম পরিচয়ের দিন যখন সেই কথা বলেছিলাম, তখন ভীষণ খুশি হয়েছিলেন, অবিকল শিশুর মতো হেসেছিলেন তিনি।

অসম্ভব হাস্যপ্রিয় এই মানুষটি যেমন প্রাণখুলে হাসতে ভালোবাসেন, তেমনই ভালোবাসেন অন্যকে হাসাতে। জীবনকে দুঃখ-কষ্টে ভারাক্রান্ত না করে হাসির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার পক্ষপাতি তিনি। কেননা জীবন তো একটাই। সেই জীবনে দুঃখ আসে, আসে রূঢ়-নির্মম বাস্তবতাও। কঠিন বাস্তবতাকে হাসি মুখে গ্রহণ করতে তিনি রঙ্গব্যঙ্গ কলাম লিখেন, তুলে ধরেন হাসির ভেতর দিয়ে চোখের জলের উৎসধ্বনি। হাসির উপন্যাস, ব্যঙ্গরচনাসহ অন্যান্য রচনায় তিনি যে প্রবল হাস্যরস সৃষ্টি করেন, বস্তুত তা নির্মল হাসিরই উপাদান, আবার সেটা সমাজের নানা অবিচার-অনাচার নিয়ে প্রতিবাদের স্বরলিপিও। যাপিতজীবন নিয়ে যেমন, রাজনীতি নিয়েও তেমন ব্যঙ্গ করেন তিনি। ‘জিনাত সুন্দরী ও মন্ত্রীকাহিনী’ উপন্যাসে তিনি যেভাবে রঙ্গরসের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনকালকে তুলে ধরেছেন, তার তুলনা মেলা ভার। রসবোধ কমবেশি সবার মধ্যেই বিদ্যমান, কিন্তু সেই রসকে শৈল্পিকভাবে রচনায় ব্যবহার সহজ নয়; বলা যায় তা বেশ কঠিনও। মোস্তফা কামাল সেই কঠিন কাজটাই করছেন হাসি মুখে, আনন্দের সঙ্গেই। দীর্ঘদিন ধরে মোস্তফা কামালকে কাছ থেকে চিনি, তার সাহিত্য সম্পর্কে জানি বলে এই কথা সহজেই বলতে পারিÑ গম্ভীর হয়ে নয়, জটিল হয়েও নয়, সহজ ও সরল হয়ে তিনি যেমন গল্প বলেন, ঠিক তেমনই তিনি সরলভাবে তুলে ধরেন তার উপলব্ধির কথা। এই সরলতা, এই সহজিয়া ভাব তার সাহিত্যদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উপন্যাস, গল্প, সায়েন্স ফিকশন, রম্যরচনাসহ সাহিত্যের নানা মাধ্যমে তিনি কাজ করছেন, লিখছেন কলাম, শিশুতোষ রচনাসহ নানাকিছু, তাতে একটা অনুপম গদ্য ভঙ্গিমার পরিচয় ধরা দেয় পাঠকের মনে। সহজ করে লিখেন, সরল করে বাক্য গঠন করেন তিনি, কিন্তু সব মিলিয়ে তার বাক্য তরল নয়। গদ্যরীতিতে সরল হওয়া আর তরল হওয়া কিন্তু এক নয়। মোস্তফা কামালের অন্যতম গুণÑতিনি তরল বাক্য লিখেন না। আমার ধারণা, হয়তো এই কারণেই তরতর করে বেড়েই চলছে তার গুণমুদ্ধ পাঠকের সংখ্যা।

মোস্তফা কামালের একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘পারমিতাকে শুধু বাঁচাতে চেয়েছি’, নর-নারী সম্পর্কের বিচিত্র রূপ ও তার সমাজ কাঠামোর বিচিত্র মাত্রা এই উপন্যাসের প্রধান প্রতিপাদ্য। মধ্যবিত্ত সমাজের সামগ্রিক চিত্রটি পারমিতার জীবনকে কেন্দ্র করে উšে§াচিত হয়েছে। একজন নারী পারমিতার স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের যে বাস্তবতা তা যে কোনো স্তরের পাঠককে নাড়া দেবে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও গুরুত্বপূণ কাজ করেছেন তিনি, ঐতিহাসিক ঘটনা, রাজনীতি লিখেছেন সিরিয়াস উপন্যাস। পাশাপাশি হাসির উপন্যাস, মজার কোনো বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন। সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা কাহিনি, রম্যরচনা, কিশোর রচনাতেও তার ক্যারিশমা রয়েছে। বাংলা কথাসাহিত্যের নানা শাখা-প্রশাখায় তার এই বিচরণ নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ বিষয়।

শিল্প-সাহিত্য নিঃসন্দেহে এক নিঃসঙ্গ সৃজনশীল কাজ। যারা এই পথে হাঁটেন, তারা জানেন যে প্রতিনিয়ত তারা নিজ করোটিতে নানা ভাবনার ঘোর বয়ে বেড়ান একা। অন্যদিকে সাংবাদিকতা একটা দলীয় কাজ। দুটি মাধ্যমেই মোস্তফা কামালের অবাধ বিচরণ। পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বেছে নিলেও সৃজনশীল লেখালেখিই তার প্রকৃত জায়গা। ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে কথা বলে জেনেছি যে, প্রতিদিনই নিয়ম করে লিখেন, পাঠ করেন তিনি। লেখালেখিটা তার কাছে প্রাত্যহিক প্রার্থনার মতো পবিত্র একটা কাজ। যার মধ্যে লেখালেখি নিয়ে এমন উচ্চতর বোধ কাজ করে, এই কথা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, সৃজনশীল লেখালেখিতে তার সাফল্য অবধারিত।

আগামী ৩০ মে, মঙ্গলবার বরেণ্য কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালের শুভ জš§দিন। প্রিয় লেখককে জš§দিনের প্রাক্কালে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যে নিঃসঙ্গ পথে যাত্রা করেছেন, তার সেই যাত্রাপথ সাফল্যময় ও আনন্দঘন হোক।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে