সবুজ প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ছে

  হারুন-অর-রশিদ

১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবেশবান্ধব শিল্প ও কল-কারখানা বা গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়তে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সবুজ অর্থায়ন বা গ্রিন ফাইন্যান্সের আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ১৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। তবে সবুজ অর্থায়ন কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবুজ অর্থায়নের যে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিচ্ছে, সেটি অর্জিত হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো বলছে, লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও উপযুক্ত উদ্যোক্তা না পাওয়ায় এ খাতে ঋণ বিতরণ করা যাচ্ছে না। তবে আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে ক্রেতাদের চাপে গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে গ্রিন অর্থায়নও বাড়বে।

সবুজ অর্থায়ন বলতে পরিবেশবান্ধব উপায়ে কারখানা স্থাপন বা স্থাপিত কারখানায় বিতরণ করা ঋণকে বোঝানো হয়। বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, দিনে সূর্যের আলোয় কাজ করা যায় এমনভাবে ভবন নির্মাণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, কাগজের তুলনামূলক কম ব্যবহারসহ আধুনিক প্রযুক্তিতে স্থাপিত কারখানাকে পরিবেশবান্ধব বলা হয়। জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায়ই এর অন্যতম লক্ষ্য। বিভিন্ন পক্ষের চাপের কারণে বর্তমানে তৈরি পোশাকসহ দেশের বেশ কিছু নতুন কারখানা গ্রিন প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ফান্ডেড ঋণের মধ্যে অন্তত ৫ শতাংশ গ্রিন ফাইন্যান্স করা বাধ্যতামূলক। প্রত্যেক ব্যাংককে টেকসই অর্থায়ন ইউনিট ও টেকসই অর্থায়ন কমিটি গঠন করার নির্দেশনা রয়েছে। দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংক এবং ৩৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান সবুজ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। সবুজ অর্থায়ন কর্মকা- তদারক করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগ রয়েছে। সবুজ অর্থায়ন কর্মকা- দুই ভাগে বিভক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একটি হচ্ছে সরাসরি সবুজ অর্থায়ন। আরেকটি হচ্ছে পরোক্ষ সবুজ অর্থায়ন। এ ছাড়া জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থায়ন, এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রচারণার জন্য ব্যয়ও সবুজ অর্থায়নের মধ্যে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ খাতে গত বছরে ২৯ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় ৬৫ কোটি টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। এসব প্রচার ও প্রশিক্ষণের জন্য ৮৬ কোটি টাকা লক্ষ্য থাকলেও বিতরণ হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা।

২০১৩ সাল থেকে সবুজ অর্থায়ন ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবছরই ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেওয়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও বিতরণ করতে পারে না ব্যাংকগুলো। ২০১৬ সালে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় ৪৬ হাজার ৪১ কোটি টাকা। বছর শেষে মাত্র ১৪ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। ২০১৫ সালে ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সবুজ প্রকল্পে মাত্র ১২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। ২০১৪ সালে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। ওই বছর বিতরণ হয় মাত্র ১৪ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। সবুজ অর্থায়নে প্রথমবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। বছর শেষে ব্যাংকগুলো মাত্র ১০ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা টাকা বিতরণ করে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পরিবেশবান্ধব উপায়ে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে এখন আকর্ষণীয় নানা ঋণ প্রকল্প চালু করেছে বিভিন্ন ব্যাংক। দীর্ঘমেয়াদি এসব ঋণ সুদের হারও তুলনামূলক কম। কিন্তু উপযুক্ত উদ্যোক্তা না পাওয়ায় তহবিল থাকলেও ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, অনেক আগে থেকেই ব্যাংকগুলোর রেটিং দেওয়ার ক্ষেত্রে সবুজ অর্থায়ন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে সবুজ অর্থায়ন খাতে ১৩ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। এর মধ্যে সরাসরি সবুজ অর্থায়ন ৮১৯ কোটি টাকা, যা মোট সবুজ অর্থায়নের মাত্র ৫ দশমিক ৮৭ । বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ১০ হাজার ৯৭২ কোটি টাকার মধ্যে সরাসরি সবুজ অর্থায়ন ৬৫৭ কোটি টাকা। বিদেশি ব্যাংকগুলো দিয়েছে ২ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা গ্রিন ফাইন্যান্স করেছে। এর মধ্যে পরোক্ষ খাতে ২ হাজার ৫৪৯ কোটি এবং সরাসরি মাত্র ৩ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১৭৬ কোটি টাকার মধ্যে সরাসরি সবুজ প্রকল্পে ৯৪ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো আড়াই কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। এ ছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছে ২৪৩ কোটি টাকা; এর মধ্যে সরাসরি সবুজ অর্থায়ন মাত্র ৬১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৮৫ কোটি, জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে ৫১ কোটি, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থানায় ৮১ লাখ, তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১৪৬ কোটি, বিকল্প জ¦ালানিতে ৭ লাখ, আগুনে পোড়া ইটে ২১৬ কোটি, আগুন ছাড়া ইট তৈরিতে ৯০ লাখ, পণ্য পুনঃপ্রচলনে ৫৪ কোটি, গ্রিন শিল্পে ৯৮ কোটি ও কারখানার নিরাপত্তায় ৪৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ১০ হাজার ১০৬টি শাখার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলে চলছে ৫০৪টি শাখা। ২১৫টি এটিএম বুথ বা এসএমই ইউনিট অফিস পরিচালিত হচ্ছে সৌরবিদ্যুতে।

সবুজ অর্থায়ন জোরদার করতে কয়েকটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব চুল্লি নির্মাণ, গ্রিন প্রকল্প ও উদ্যোগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য পৃথক চারটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল রয়েছে। এর মধ্যে গ্রিন প্রকল্পের (বায়োগ্যাস, সোলার ইত্যাদি) জন্য ২০০ কোটি টাকা, ইটভাটার চুল্লি নির্মাণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় ৫ কোটি ডলার এবং দীর্ঘমেয়াদে বিতরণের জন্য গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড নামে ২০ কোটি ডলারের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে