• অারও

ভালো নেই শ্রমিকরা

  গোলাম রাব্বানী

২৯ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কেমন আছে দেশের অর্থনীতি? এই প্রশ্নের উত্তরে হয়তো সবাই বলবে অর্থনীতি চাঙ্গা, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় কেমন আছে অর্থনীতির চালিকা শ্রমিকরা। তখন উত্তর নেতিবাচক আসবে। অর্থনীতি চাঙ্গা হলেও কোনোকালেই ভালো অবস্থানে ছিল না শ্রমিকরা।

আঠারো শতকের শেষ দিকে নিপীড়িত শ্রমিকরা এক হয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে আত্মত্যাগ স্বীকার করেছিল তার বিনিময়ে সৃষ্টি হয়েছিল নতুন এক ইতিহাস। যে ইতিহাসের পাতায় বিজয় লেখা হয়েছে শ্রমজীবীদের। যে লড়াই তারা করেছিল কর্মঘণ্টা কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা করার দাবিতে। আজ বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমে এসেছে। কোথাও ৮ ঘণ্টা বা কোথাও তার চেয়ে কিছু বেশি। তবে আইএলও’র কনভেনশনে স্বাক্ষরিত প্রায় সকল রাষ্ট্রই তাদের দেশের শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা করার কথা বলেছে। বাংলাদেশের শ্রম আইনে এ কর্মক্ষম শ্রমিকদের জন্য দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্ম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু আইএলও কনভেনশনের বাকি শর্তগুলো নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা, মাতৃকালীন ছুটি, পরিবহন সুবিধাসহ নানা ধরনের সুবিধা শুধু কাগজে কলমেই রয়েছে। বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা মূলত তিন শ্রেণির শ্রমিকের ঘামে সচল থাকে। কৃষিতে দিনমজুর শ্রমিক, রেমিট্যান্স আয়ে প্রবাসী শ্রমিক আর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক। জীবনযাত্রার মৌলিক চাহিদা মিটিয়ে কেমন আছেন এই শ্রমিকরা। মাত্র চারজন সদস্যের একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদাও মেটাতে পারছে না একজন শ্রমিক।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব বলেন, শ্রমিকরা ভালো থাকবে যদি মালিকপক্ষ চায়। কোনো কারখানা দেওয়ার আগে সেখানে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়, শ্রমিকদের পরিবারের বাসস্থান, শিক্ষা ইত্যাদি নিশ্চিত করে স্থাপন করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এগুলোর কোনো বালাই নেই।

তিনি আরও বলেন, যত্রতত্র কারখানা গড়ে ওঠার ফলে এ ধরনের অসুবিধায় পড়তে হচ্ছ। আবাসিক এলাকায় কারখানা হচ্ছে। যার ফলে অন্য নাগরিক সুবিধা পাচ্ছে না শ্রমিকরা।

দেশের দিনমজুররা মূলত কোনো ধরনের শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত হয় না। এ ছাড়া অক্লান্ত শ্রম আর ঘামের বিনিময়ে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পান না কৃষকরা। দিনপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পান দিনমজুররা। আর অধিকাংশ সময়ই তাদের বেকার পড়ে থাকতে হয়। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশ আসে গার্মেন্টস থেকে। কিন্তু এই গার্মেন্টেসের শ্রমিকদের অবস্থাও এখন পর্যন্ত যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নতি হয়নি। সর্বশেষ ২০১৩ সালে মজুরি কমিশন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে ৫ হাজার ৩০০ টাকা। যা পাশ্বর্বর্তী যে কোনো দেশের তুলনায় অর্ধেক। সে হিসেবে প্রতিদিন আয় হয় ১৭৬ টাকার মতো। তবে বেতনের চেয়ে সবচেয়ে বড় শঙ্কা এখন পর্যন্ত অনেক গার্মেন্টসেই শ্রমিকদের কোনো স্বীকৃতি নেই। ঢাকা ও গাজীপুরে কর্মরত ৭২.৭০ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের বৈধ নিয়োগপত্র নেই। আর নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে এ হার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ যে কোনো সময় চাকরিচ্যুত হওয়ার ভয় রয়েছে পোশাক শ্রমিকদের। যাদের পাঠানা রেমিট্যান্সে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে সেই প্রবাসী শ্রমিকরাও আজ ভালো নেই। বিদেশে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম. এম. আকাশ বলেন, শ্রমিকরা কখনই কোনো দেশের বোঝা হতে পারে না। তারা বরং সম্পদ। এরাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, দেশে দেশে আজ মে দিবসের প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। এখন আর কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা করার দাবিতে আন্দোলন নয় বরং শ্রমিকদের সার্বিক স্বার্থ নিয়েই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক মে দিবসে আসে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে বড় দুটি রাজনৈতিক দলে নামকাওয়াস্তে শ্রমিক সংগঠন আছে। আর যে সকল প্রকৃত শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের দাবিদাওয়া বা অধিকার নিয়ে আন্দোলন করে, তাদের পেছনে বিশেষ বাহিনী লেলিয়ে দেওয়া হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে