শ্রমের মূল্য

নারী পুরুষের বৈষম্য কমেনি

  ইশরাতুল জাহান

২৯ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রমের মূল্যের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের বৈষম্য কমেনি। বরং কোথাও কোথাও বেড়েছে। শ্রমের খাত ভেদে নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যকার ব্যবধান ৫ থেকে ১০ শতাংশ। কোথাও কোথাও আরও বেশি। শ্রমের মূল্যের এই বৈষম্য রোধ করতে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে সার্কুলারও জারি করা আছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তা মানা হচ্ছে না। বাংলাদেশের সংবিধানও সব নাগরিকের সমান অধিকার দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিধানেও নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের শ্রমের সমান মূল্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ আইএলওর সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। সুতরাং নারী-পুরষের সমান শ্রমের মূল্য নিশ্চিত করতে দেশটি বাধ্য। কিন্তু বাস্তবে তা করা হচ্ছে। এমনকি সরকারি প্রকল্পগুলোতেও শ্রমের মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত।

১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে নারী শ্রমিকদের প্রতি সমান আচরণ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ‘আইএলও’ ঘোষণা গৃহীত হয়। কিন্তু অনেক দেশেই এটি কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশে বিশেষ করে পোশাক শিল্প, ইটভাটা, কৃষিকাজ, গৃহশ্রম, দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজ, নির্মাণকাজ,  চাতালের কাজসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাজেই নারীরা পুরুষের সমান মজুরি পাচ্ছেন না।

শান্তিনগরের ইপোক গার্মেন্টসে কাজ করেন রোকসানা বেগম। তিনি জানান, তাদের কারখানায় কাটিং মাস্টার হিসেবে একজন নারী শ্রমিক মাসিক বেতন পান ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর পুরুষ শ্রমিকরা পান ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। মজুরির এই ব্যবধান সম্পর্কে ম্যানেজার তাদের বলেছেন, নারীরা পুরুষের সমান কাজ করতে পারে না।  এ ছাড়া নানা কারণে তারা বেশি ছুটি ভোগ করে। এসব কারণে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা যেমন কম, তেমনি মজুরিও কম।

মাটি কাটার ক্ষেত্রে একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক মজুরি পান ৫০০ টাকা।  নারীদের দেওয়া হয় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা।

ধানের চাতালে কাজ করে একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক মজুরি পান ৩০০ টাকা। একই কাজ করে নারী শ্রমিক পান ২৫০ টাকা।

শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন বাংলাদেশ শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আলী আহমেদ। তিনি বলেন, সব খাতে শ্রমিকদের ন্যায্যমূল্য আদায় করতে আমরা কাজ করছি। যারা আমাদের কাজে অভিযোগ করে তাদের বিষয়ে আমরা সরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করছি। এতে সমাধানও হচ্ছে।

বেসরকারি সংস্থা অক্সফামের হিসাবে দেখা যায় শহরের তুলনায় গ্রামীণ নারীরা শ্রমের মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি অবহেলিত। এর মধ্যে গ্রামে গৃহশ্রমিক হিসাবে যারা কাজ করেন তাদের শ্রমের মূল্য খুবই কম। অথচ একই কাজ পুরুষরা করলে বেশি মজুরি পান। গ্রামে গৃহশ্রমিক হিসেবে এক পুরুষ পান মাসে তিন বেলা খাওয়াসহ তিন হাজার টাকা। আর নারী শ্রমিক পান দেড় হাজার টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ২০ লাখ গৃহশ্রমিক রয়েছে। এদের অর্ধেকের বেশি কোনো বেতন পান না। পেটে ভাতে কাজ করেন। অথচ পুরুষ শ্রমিকরা এ ক্ষেত্রে পেটে ভাতের পাশাপাশি বাড়তি মজুরিও পাচ্ছেন। অক্সফামের হিসাবে কৃষি খাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টিতেই নারীরা অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু এসব কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। নিজের কাজের ক্ষেত্রে এর কোনো মূল্য নেই। এ ক্ষেত্রে পুরুষের শ্রমেরও মূল্য নেই।

বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে  বলা হয়, ৬১ শতাংশ নারী শ্রমিক দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। ৩২ শতাংশ নারী শ্রমিক মজুরি পান গড়ে দৈনিক ১০০ টাকার কম। আর পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এ চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ৫৬ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক দৈনিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের মজুরি আরও বেশি।

সরকারের কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিসহ নানা কর্মসূচিতেও নারী শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পে রাস্তার মাটি কাটতে একজন নারী শ্রমিক দৈনিক মজুরি পান অর্ধবেলায় ৩০০ টাকা। পুরুষ শ্রমিক পান ৪০০ টাকা।

সিটি করপোরেশনের রাস্তা ঝাড়– দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন নারী শ্রমিক দৈনিক মজুরি পান ৪০০ টাকা। আর পুরুষ শ্রমিক পান ৫০০ টাকা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে