শিল্পে দক্ষ শ্রমিকের অভাব প্রকট

  হারুন-অর-রশিদ

২৯ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অর্থনীতি কৃষি থেকে ক্রমান্বয়ে শিল্পে নির্ভরতার দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষির ওপর নির্ভরতা কমে শিল্পের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু শিল্প খাতের জন্য দক্ষ শ্রমিকের অভাব প্রকট হচ্ছে। পোশাক শিল্পসহ বড় বড় শিল্প খাতের দক্ষ কর্মীর চাহিদা পূরণ করছে বিদেশিরা। এতে কষ্টে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার উল্লেখযোগ্য অংশ আবার বিদেশে চলে যাচ্ছে।

জানা গেছে, ‘লেবার মার্কেট অ্যান্ড স্কিল গ্যাপ ইন বাংলাদেশ : ম্যাক্রো ও মাইক্রো লেভেল স্টাডি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে ১০টি খাতে। খাতগুলো হচ্ছেÑ এগ্রো ফুড প্রসেসিং, স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতাল ও ট্যুরিজম, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জাহাজ নির্মাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান। ২০২০ সাল নাগাদ এ ১০ খাতে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হবে ৭ কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে তৈরি পোশাক খাতে। খাতটিতে এ সময়ের মধ্যে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিতে হবে ৬০ লাখ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে এগ্রো ফুড খাত। ২০২০ সালের মধ্যে খাতটিতে নিয়োগ দিতে হবে ৩০ লাখ দক্ষ শ্রমিক। বাজেটে জিডিপির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে এ ঘাটতি মেটাতে হবে। অন্যথায় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে।

ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান তৈরি পোশাক খাতের, যার হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। ৭ দশমিক ৭ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নির্মাণ খাত। কর্মসংস্থান তৈরিতেও এ দুই খাতের অবদান ভালো। তবে খাত দুটিসহ কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, পর্যটন, হালকা প্রকৌশল, চামড়াজাত পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, জাহাজ নির্মাণ ও আইসিটিতেও দক্ষ শ্রমশক্তির বেশ অভাব রয়েছে।

এদিকে শিল্পায়নের জন্য প্রধান বাধা দক্ষ শ্রমিক বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। শিল্পায়নের প্রধান সমস্যাগুলো জানতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি সমীক্ষা চালায় বিশ্বব্যাংক। সমীক্ষায় ১ হাজার ৪৫২ জন ব্যবসায়ী মতামত দিয়েছিলেন। সেখানে ১২ শতাংশ উদ্যোক্তা মনে করে, দক্ষ শ্রমিকের অভাব শিল্পায়নের পথ বাধাগ্রস্ত করছে। তবে ওইি জরিপে প্রধান বাধা উল্লেখ করা হয় বিদ্যুতের অভাব, দ্বিতীয় বাধা দক্ষ শ্রমিকের অভাব। দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য কারিগরি শিক্ষা প্রচলন ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করতে বলা হয়।

এদিকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ আসছে তৈরি পোশাক শিল্পে। বিশেষজ্ঞ বা বিশেষ কারিগরি দক্ষ শ্রমিকের অভাব প্রকট এই শিল্পে। বিশেষজ্ঞ কর্মীর চাহিদা পূরণ করছে বিদেশিরা। এই খাতের বিদেশি শ্রমিকরা প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। পোশাক রপ্তানি করে যে আয় হয় তার ৫ ভাগের একভাগই নিয়ে যাচ্ছেন তারা। বিদেশে কাজ করে বাংলাদেশিরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান তার ৩ ভাগের এক ভাগ নিয়ে যাচ্ছেন তারা। পোশাক খাতের দক্ষ শ্রমিকের অভাব নিয়ে বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ তৈরি পোশাক শিল্পে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি প্রকট থেকে প্রকটতর হবে। তখন এ খাতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা দাঁড়াবে ৫০ লাখ ২৭ হাজার ৪৬৩ জন। আর দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি দাঁড়াবে অন্তত ১৫ লাখ। বর্তমানে এ খাতে দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার ৪৭৯ জন। আর আধাদক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে ৪৮ হাজার ১৩০ জন। এ ছাড়া অদক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে ৮ হাজার ৫৭৭ জন।

পোশাক মালিক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র গবেষণা সেলের সূত্রমতে, ২০ শতাংশ দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি নিয়েই চলছে দেশের পোশাক খাত। এ সুযোগে দেশে চার হাজার তৈরি পোশাক কারখানায় অন্তত ১৮ হাজার বিদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। কারিগরি ব্যবস্থাপক ও কারিগরি পরিচালক পদে কাজ করছেন। শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ভারত থেকে আসা শ্রমিকরা তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে কাজ করছেন। এ ছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকা থেকেও কিছু শ্রমিক বাংলাদেশে ইন্টার্ন করছে।

এদিকে বিশ্বে জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশিদের আয় অনেক কম। সুপারভাইজারি পর্যায়ে বাংলাদেশিরা কাজের সুযোগ পান না। একেবারে নিম্ন পর্যায়ে কাজ করছেন বাংলাদেশিরা। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বিদেশে থাকা কর্মীদের মধ্যে দক্ষ ৪২ শতাংশ। বাকি ৫৮ শতাংশই আধাদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ। বিদেশ যাওয়ার সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন। এর মধ্যে দক্ষ ৩ লাখ ১৮ হাজার জন। আর আধা দক্ষ ১ লাখ ২০ হাজার এবং স্বল্প দক্ষ ৩ লাখ ১৪ হাজার জন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে