বিশ্বকাপ ফুটবলে চাঙ্গা রাশিয়ার অর্থনীতি

  নাজমুল হুসাইন

১০ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে রেখে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে রাশিয়ার অর্থনীতি। সরকারি বেসরকারি ও বৈদেশিক খাতে অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে স্থবির হয়ে পড়া কর্মসংস্থানের হার। শুধু বিশ্বকাপের সময়েই আড়াই লাখ লোকের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে এই কর্মসংস্থান আসর শেষে সামান্য কমলেও পরে আবার বেড়ে যাবে। বিদেশি পর্যটকটদের আগমন, পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে ইতোমধ্যেই নবরূপে সেজেছে রাশিয়া। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকানটি বিশ্বকাপের ডিজিটাল ডিসপ্লেতে ঝলমল করে, পানীয় ও নানা পণ্যদ্রব্যের স্মারক-স্টিকার যুক্ত হতে শুরু করছে আসরটি।

আগামী ১৪ জুন থেকে শুরু হবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম প্রদর্শনী বিশ্বকাপ ফুটবল। এ কারণে ইতোমধ্যেই রাশিয়ায় সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। প্রায় পাঁচ লাখ ফুটবলপ্রেমী বিদেশি অতিথিকে বরণ করতে রাশিয়ার অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এখন শেষ।

একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রুশ অর্থনীতিতে বিশ্বকাপের প্রভাবে ৮৬ হাজার ৭০০ কোটি রাশিয়ারন রুবল বা ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত জোগান আসবে। এই সময়ে ২ লাখ ৫০ হাজার লোকের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। যার বেশির ভাগই ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। অবকাঠামোগত সুবিধাগুলো পুরোপুরি চালু হলে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রতিবছর (২০১৩-২০২০) জিডিপির ওপর গড় প্রভাব ২৪০ কোটি থেকে ৩৩৬ কোটি ডলার হবে। আর বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে যে ধরনের কর্মযজ্ঞ চলেছে এবং চলমান রয়েছে, তাতে কেন্দ্রীয় সরকার ও আঞ্চলিক সরকারগুলো কতটা অতিরিক্ত কর আদায় করতে পারছে, তার অঙ্কটাও নেহাত খাটো নয়। গত পাঁচ বছরে অতিরিক্ত কর সংগ্রহ বিবেচনায় নিয়ে চলতি বছরের শেষে এই অতিরিক্ত করের প্রকৃত আদায় দাঁড়াবে ২৪০ কোটি ডলার।

২০১০ সালেই বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হওয়ার টিকিট পেয়েছিল রাশিয়া। ওই সময় দেশটির জিডিপির প্রবৃদ্ধি অনেক শক্তিশালী ছিল। ওই সময় দেশটির টেকসই উন্নয়নের হার ছিল বছরে ৪ শতাংশ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার তোড়ে এখন সেই দেশ পড়েছে মন্দার কবলে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এ বছর দেশটির প্রবৃদ্ধির হার চলতি বছরে হবে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

এর আগে ২০০০ সালে তাদের মূল্যস্ফীতির হার ২০ শতাংশে উঠে গিয়েছিল। ডিজিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল নেতিবাচক। ২০১০ সালে সবকিছু ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও আবার নেতিবাচক হয়ে যায়। গত বছর তাদের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ।

রুশ সরকার বলছে, আসন্ন বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট দেশটির অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করবে। তবে এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ ফুটবল রুশ অর্থনীতিতে অল্পই প্রভাব রাখবে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোও সেই সুরেই তাল মিলিয়েছে। মুডি’স সম্প্রতি জানিয়েছে, দেশ ও অর্থনীতির আকার অনুযায়ী প্রভাব কমবেশি হয়। সেই হিসাবে বিশাল রুশ অর্থনীতিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের অর্থনৈতিক প্রভাব হবে সামান্যই। বিদেশি অতিথিদের ভ্রমণ ও অন্যান্য কারণে ব্যয় বাড়লেও, তাতে জাতীয় অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠবে না।

এক জরিপের বরাত দিয়ে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে মোট খরচ হচ্ছে ১ হাজার ১৮০ কোটি ডলার। তবে কিছু ব্যয়বহুল অবকাঠামোর হিসাব তা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আর বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়ায় ২ লাখ ২০ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, হোটেল, টেলিকম, খাবার বিক্রি ও পরিবহন থেকে রাজস্ব আদায় খুব বেশি বাড়বে না। মাত্র এক মাসের টুর্নামেন্টে খুব বেশি পরিবর্তনের আশা করাও ঠিক না। ধারণা করা হচ্ছে, সব মিলিয়ে প্রায় ছয় লাখের মতো বিদেশি ক্রীড়ামোদী ও সাত লাখ রুশ নাগরিক বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোয় থাকবেন। মুডি’স বলছে, এতে পর্যটন খাতের উন্নতি হবে ঠিকই, কিন্তু তা হবে ক্ষণস্থায়ী।

তবে এর অন্যদিকও আছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন চাকরি সৃষ্টি হওয়ায় দক্ষ জনবল তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বড় যে কাজটি হয়েছে তা হলো, বিশাল বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। এগুলোয় বিনিয়োগ হয়েছে। এর সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে। এর ফলে অর্থনীতিতে কিছু স্থায়ী সম্পদ যুক্ত হয়েছে। এগুলো অর্থনীতি বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ ব্যয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক অবদান রাখবে। রাশিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী আরকাজি দুভরকাভিচ তো বলেই দিয়েছেন, দেশটির যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার সবই বিশ্বকাপের অবদান!

ইউরেশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়ারোসøাভ লিসোভোলিক রয়টার্সকে বলেছেন, ‘প্রশ্ন হলো, যতটুকু সুযোগই সৃষ্টি হবে, রাশিয়া তা কাজে লাগাতে পারবে কিনা। বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে ভালো অবকাঠামো নির্মাণ ও বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়ানোর সুযোগ আছে দেশটির। তা কাজে লাগানোই বড় কথা।’

এদিকে রুশ সরকার মনে করছে, এই উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী তাদের যে প্রচার হচ্ছে এই কারণে অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। ২০১৩ সাল থেকে তারা বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এর প্রভাবে ইতোমধ্যেই তাদের প্রবৃদ্ধির হার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে