আয়কর মেলায় ব্যাপক সাড়া

  আবু আলী

১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করসেবা প্রদান ও কর সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছরের মতো এবারও দেশব্যাপী আয়কর মেলার আয়োজন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ‘উন্নয়ন ও উত্তরণ, আয়করের অর্জন’ সেøাগান সামনে রেখে এবারের মেলার প্রতিপাদ্য হচ্ছেÑ ‘আয়কর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ’। ১৩ নভেম্বর মঙ্গলবার থেকে দেশব্যাপী করমেলা শুরু হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে সপ্তাহব্যাপী মেলা চলবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত। রাজধানীর মেলা হচ্ছে মিন্টো রোডের অফিসার্স কাব প্রাঙ্গণে। এ ছাড়া সব জেলা শহরে চার দিন এবং ৩২টি উপজেলায় দুদিন মেলা হচ্ছে। পাশাপাশি ৭০টি উপজেলায় একদিন ভ্রাম্যমাণ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেলায় করদাতাদের ব্যাপক সাড়া মিলছে।

করদাতারা হয়রানিমুক্ত কর বিবরণী জমা এবং কর পরিশোধ করতে চান। মেলায় সেই পরিবেশ পান তারা। ফলে প্রতিবছরই মেলার ব্যাপ্তি একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে আয়কর আহরণও বাড়ছে।

আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর আদায় করে থাকে। কিন্তু দেশের মানুষের মধ্যে এনবিআরকে নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। ভীতির সঙ্গে অজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে রাজস্ব খাতে আমূল পরিবর্তন আনতেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০১০ সাল থেকে দেশে আয়কর মেলার আয়োজন করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সেই কার্যক্রম প্রতিবছরই বাড়াচ্ছে; যার ইতিবাচক সাড়াও মিলছে। একদিকে প্রতিবছরই আয়কর সেবা, আয়কর আদায়, সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যায়ে এ সেবা পৌঁছে গেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূইয়া বলেন, মেলা আয়োজনের পাশাপাশি করনেট সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনপ্রতিনিধিদের জন্য ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, উপজেলা পর্যায়ে কর অফিস সম্প্রসারণ এবং ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের জন্য জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান ৩৫ লাখ ই-টিআইএনধারীর সংখ্যাকে আগামী দুই বছরে ৫০ লাখে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে মাত্র ২০ লাখ আয়কর রিটার্ন দাখিল হচ্ছে। রিটার্ন দাখিলের এ সংখ্যা ৩৫ লাখে উন্নীত করা হবে।

মেলা ঘূরে দেখা গেছে, মেলায় এক ছাদের নিচে সব ধরনের সেবা মিলছে। একজন নতুন করদাতা মেলায় ই-টিআইএন খুলছেন। আবার মেলায় কর বিবরণী পূরণ করে তা জমা দিচ্ছেন। যিনি করযোগ্য আয়ের অধিকারী তিনি মেলায় মেলায় সোনালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের শাখা খোলা আছে, যাতে করদাতারা আয়কর জমা দিচ্ছেন। সঞ্চয় অধিদপ্তরের জন্য আলাদা বুথ রয়েছে। সেখান থেকে করদাতারা সঞ্চয়ের যে কোনো তথ্য জানতে পারছেন। আয়কর রিটার্ন, ই-টিআইএন আবেদন ফরম এবং চালান ফরম ও করদাতাদের সুবিধার্থে হেল্পডেস্ক, তথ্যকেন্দ্র ও আয়কর-সংক্রান্ত বুথ রয়েছে। এসব বুথের মাধ্যমে করদাতাদের আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণ, চালান ও পে-অর্ডার তৈরিসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, করদাতাদের সুবিধার্থে ৪৩টি আয়কর রিটার্ন বুথ, ৩১টি হেল্পডেস্ক ও ব্যাংক বুথ (সোনালী ব্যাংক ১৩টি, জনতা ব্যাংক পাঁচটি ও বেসিক ব্যাংক তিনটি) রয়েছে মেলায়। এ ছাড়া ই-পেমেন্টের জন্য তিনটি ও ই-ফাইলিংয়ের জন্য দুটি আলাদা বুথ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য মেডিক্যাল বুথও রাখা হয়েছে। সবশেষে করদাতাদের সুবিধার জন্য মেলায় ফটোকপির ব্যবস্থাও নিশ্চিত রয়েছে। এগুলোর পাশাপাশি মেলায় যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্রথমবারে মতো রাজধানীর টিএসসি, রামপুরা, বেইলি রোড, মতিঝিল, মিরপুর ও উত্তরা থেকে ১৫টি শাটল বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মেলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত আট বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর মেলায় ৪৪ লাখ ৯৮ হাজার ১২৫ জন নাগরিক (ব্যবসায়ী, সরকারি ও বেসরকারি) সেবা পেয়েছেন। তাদের ই-টিআইএন রেজিস্ট্রেশন, আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণে সহায়তা, রিটার্ন গ্রহণ, কর পরিশোধ এবং কর বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক সেবা দেওয়া হয়েছে। আর এ সেবার মাধ্যমে এনবিআরের ১০ হাজার ৫৩২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে।

২০১০ সালে প্রথম আয়কর মেলা শুরু হয়। তখন থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত আট বছরে মেলায় ১১ লাখ ৮৫ হাজার ১৫৪ জন মানুষ আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। মেলায় নতুন করে ২ লাখ ২৬ হাজার ৭১১ জন ই-টিআইএন খুলেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আয়কর মেলার মাধ্যমে কর-সংস্কৃতির বিকাশ ও কর-সচেতনতা বাড়ছে। করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন হচ্ছে। ফলে আয়কর মিলনমেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মেলার আকারও বাড়ছে।

২০১০ সালে ৬০ হাজার ৫১২ জন সেবা নিয়েছেন। আরকর বিবরণী জমা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৪৪টি। আয়কর আদায় হয়েছে ১১৩ কোটি টাকা। আর নতুন ই-টিআইএন নিয়েছেন ৫ হাজার ৬৩৮টি। ২০১১ সালে করসেবা নিয়েছেন ৭৫ হাজার ১২০ জন। আর বিবরণী জমা দিয়েছেন ৬২ হাজার ২৭২ জন। আয়কর আদায় হয়েছে ৪১৪ কোটি টাকা। আর ই-টিআইএন নিয়েছেন ১০ হাজার ৪১টি। ২০১২ সালে সেবা নিয়েছেন ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬৭ জন। কর বিবরণী জমা দিয়েছেন ৯৭ হাজার ৮৬৭। আর আদায় হয়েছে ৮৩১ কোটি টাকা। টিআইএন নিয়েছেন ১৬ হাজার ২৮৭। ২০১৩ সালে সেবা নিয়েছেন ৫ লাখ ১০ হাজার ১৪৫ জন। কর বিবরণী জমা দিয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭। আদায় হয়েছে ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। ই-টিআইএন নিয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৯৩টি। ২০১৪ সালে সেবা নিয়েছেন ৬ লাখ ৪৯ হাজার ১৮৫ জন। কর বিবরণী জমা দিয়েছেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩০৯টি। আদায় হয়েছে ১ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। ই-টিআইএন নিয়েছেন ২৬ হাজার ৭৪৫টি।

২০১৫ সালে ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫৪ জন সেবা নিয়েছেন। কর বিবরণী জমা দিয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০টি। আর আদায় হয়েছে ২ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। ই-টিআইএন নিয়েছেন ১৫ হাজার ২০০টি।

২০১৬ সালে সেবা নিয়েছেন ৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭৩ জন। বিবরণী জমা দিয়েছেন ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯৮টি। আদায় হয়েছে ২ হাজার ১১২ কোটি টাকা। আর ই-টিআইএন নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৮৫৩টি। ২০১৭ সালে আয়কর সেবা নিয়েছেন ১১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৯ জন। আর বিবরণী জমা দিয়েছেন ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৪৮৭টি। আদায় হয়েছে ২ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। আর ই-টিআইএন নিয়েছেন ৩৮ হাজার ৫৭৩টি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে