অধিকাংশ গর্ভবতী ও প্রসূতি মা অপুষ্টিতে ভুগছেন

  অনলাইন ডেস্ক

১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাড় কাঁপানো শীতেও অপ্রতুল শীতবস্ত্রে বাগানে কাজ করছেন নারী চা শ্রমিকরা। এদের মধ্যে গর্ভবতী ও প্রসূতি মাও আছেন। তাদের হাড্ডিসার শরীরে অপুষ্টির ছাপ। দৈনিক ৮৫ টাকা মজুরিতে তাদের জীবনযাত্রার মান যে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে দিয়েছে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। শীতবস্ত্রের অভাব, পুষ্টির ঘাটতি, চিকিৎসাসেবাবঞ্চিত নারী শ্রমিকদের জীবনযাত্রা শ্রীমঙ্গলের চা বাগান থেকে ঘুরে এসে জানাচ্ছেনÑ লাবণ্য লিপি

তখন সকাল সাড়ে ১০টা। সূর্য তখনো কুয়াশার চাদরে ঢাকা। কিন্তু তাই বলে তো আর সূর্যমণিদের ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকলে চলবে না। কাজ করতে হবে। তবেই না জুটবে অন্ন। শিশুর খাবার। শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে কাজ করতে করতে এমনটাই বলছিলেন সূর্যমণি বারুই। এই হাড় কাঁপানো তীব্র শীতেও তার পরনে পাতলা জীর্ণ কাপড়। দুই সন্তানের জননী তিনি। বড়টার বয়স তিন, ছোটর বয়স এক বছর। সূর্যমণির নিজের বয়স কত? জানতে চাইলে হাসির ঝিলিক দেয় তার ঠোঁটে। সে হাসিতে আলোর ঝিলিক ছড়ায় কপালের সিঁদুরের টিপ। হেসে বলেন, জানি না দিদি। বাপ-মা বয়সের কথা বলেনি কখনো। তাহলে কত বছর বয়সে আপনার বিয়ে হয়েছে, জানেন না? এবার যেন একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, মাসিক হইছিল। বড় হইছি। তাই বিয়ে হইছে! আরও জানান, বিয়ের পরই ছেলে হয়। পরের বছরই মেয়ে। আবারও হবে নাকি? জবাব দিলেন, হলে হবে! ভগবান দিলে কী না করব! শুধু তাই না, বাড়ন্ত শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং একজন প্রসূতি মায়ের খাবার কেমন হওয়া উচিতÑ এ বিষয়েও কোনো জ্ঞান নেই তার। জানালেন, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাগানে কাজ করেন তিনি। সকালে তেমন কিছুই খাওয়া হয় না। কখনো ঠা-া ভাত থাকলে খেয়ে আসেন। না থাকলে বাগানে এসে খাওয়ার সময় হলে ভাত অথবা রুটি, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, চা পাতা ভর্তা, মাঝে মাঝে তরকারি দিয়ে খেয়ে নেন। শিশুটা বুকের দুধ খায়। তাই মাঝে একবার সুযোগ পেলে হাজিরা বাবুকে বলে শিশুকে দুধ খাওয়াতে যায়। শিশুর দেখাশোনা তার মা করেন।

সারা দিন বাগানে কাজ করে লাকড়ি নিয়ে বাসায় ফেরেন বীণারানি। সন্তানসম্ভবা বীণা বিকালে এসেছিলেন লেবার লাইনের পাশের পাহাড়ের খাদের ঝরনার নালায় স্নান করতে। পেটের সন্তানের বয়স জানতে চাইলে সঠিক তথ্য দিতে না পেরে আনুমানিক সাত মাস হবে বলে জানালেন। ডাক্তার দেখান কিনা জানতে চাইলে বলেন, দরকার হলে বাগানের হাসপাতালের ডাক্তার দেখাই। জানালেন, তখনো তার খাওয়া হয়নি। আর যা খাবেন তা একজন গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিচাহিদা মেটাবে কিনা, সে বিষয়েও তার কোনো ধারণা নেই! তার আরও একটি সন্তান আছে। আগের সন্তান হওয়ার দিনও নাকি তিনি বাগানে কাজ করেছেন। সারা দিন কাজ করে ঘরে ফিরেছেন। সন্ধ্যা থেকে পেটে ব্যথা ছিল। রাত ৩টায় সন্তান হয়ে গেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, তিন মাস ছুটি পেয়েছিলাম। মাতৃত্বকালীন ছুটি সরকার ছয় মাস করেছে শুনে বললেন, ছয় মাস ছুটি পেলে তো খুব ভালো হয়। তবে আমরা এখনো তা পাই না।

একজন গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের কী পরিমাণ পুষ্টিচাহিদা বা ক্যালরি প্রয়োজন এ প্রসঙ্গে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ আখতারুন্নাহার আলো জানান, গর্ভের শিশু সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠতে গর্ভাবস্থায় মাকে দৈনিক ৩৫০ ক্যালরির জন্য অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করা জরুরি। কারণ ভ্রƒণ থেকে শিশু যখন ধীরে ধীরে মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠে, তখন মায়ের এই অতিরিক্ত খাবার সন্তানের শরীরে খাদ্যের চাহিদা মেটায়। গর্ভাবস্থায় দৈনিক খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত ১৪ গ্রাম প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত একটা ডিম, এক বাটি ডাল বা শিমের বিচি অথবা দুই মুঠ বাদাম থেকে পাওয়া যাবে এই পরিমাণ প্রোটিন। স্বাভাবিক অবস্থায় যতটুকু ক্যালসিয়াম প্রয়োজন, গর্ভাবস্থায় এর চেয়েও আরও ২০০ মি.লি বেশি ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। ক্যালসিয়াম পাওয়া যাবে দুধ, দই, পনির, বাটা মাছ, রুই মাছ ইত্যাদি থেকে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ঢেঁকিছাঁটা চাল, আটা, ফুলকপি, করলা, পালংশাক, পুঁইশাক, পুদিনাপাতা, কচু, গাজর, কলিজা, সবুজ ও হলুদ শাকসবজি এবং ফলমূল খেতে হবে। আর গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রসঙ্গে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক, (গাইনি) ডাক্তার রুনা আখতার দোলা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গর্ভবতী মাকে গর্ভকালীন সময়ে সমস্যা না হলেও অন্তত তিনবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রসূতি মাকেও সন্তান প্রসবের এক সপ্তাহ পর এবং ২৮ দিনে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তাহলেই মাতৃমৃত্যুর ও শিশুমৃত্যুর হার কমবে। মা ও শিশুর পুষ্টিজ্ঞানও বাড়বে।

চা বাগানে পাতা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ৯০ শতাংশ শ্রমিকই হচ্ছেন নারী। এ ছাড়া চা-গাছ ছাঁটাই, নতুন চারা রোপণ, বিজ সংগ্রহ, বাগানের পরিচর্যা ইত্যাদি কাজেও নারীরা অংশ নিয়ে থাকেন। একজন শ্রমিক প্রতিদিনের মজুরি হিসেবে পান ৮৫ টাকা, যাকে তারা হাজিরা বলেন। সকাল ৯টায় লাইন চৌকিদারের কাছে তাদের হাজিরা দিতে হয়। নিয়মিত শ্রমিক জনপ্রতি সপ্তাহে ৩ কেজি ২৫০ গ্রাম আটা রেশন হিসেবে পান, যা তাদের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। অনিয়মিত শ্রমিকরা রেশন পান না। সাপ্তাহিক ছুটিও পান না। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসাÑ এসব সমস্যা যেন চা শ্রমিকদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর হিসেবে, ২০১৭ সালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বেড়েছে। পণ্য ও সেবাভেদে চালের দাম ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ, দেশি পেঁয়াজের দাম ৪০ দশমিক ৯৯ শতাংশ, সবজির দাম ২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এগুলোর প্রভাবে ভোগ্য থেকে শুরু করে গৃহস্থালি সব পণ্যেরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এ অবস্থায় একজন দরিদ্র চা শ্রমিক মা কীভাবে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টিচাহিদা মেটাবেন, তা খুব সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গ্রামাঞ্চলের ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমা ও ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ লোক চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। আর চা শ্রমিকরা যে এ হার ছাড়িয়ে যায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে