নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী মেয়েশিশু

  অঞ্জনা ভৌমিক

১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিজের সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলার কথা বলে আট বছরের তাজিনকে ঢাকার উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে নিয়ে এসেছিলেন নিলুফা ইয়াসমিন এমি ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে। কিন্তু খেলার বদলে লালমনিরহাট পাটগ্রামের জগতবেড় গ্রামের মেয়ে তাজিনের কপালে জোটে নির্যাতন। ঘর ঝাড়– দেওয়া থেকে কাপড় ধোয়া ইত্যাদি করার পর গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের চোটে তার ডান হাতের কনুইয়ের ওপর অংশ ভেঙে যায়। সেখানে রড লাগানো হয়েছে। এই হাতেই আবার ছোট-বড় মিলে একাধিক ক্ষতের চিহ্ন ছিল। পিঠে, তলপেটেও ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। মানসিক প্রতিবন্ধী বাবার সংসারে অভাবের তাড়নায় পেট পুরে খাবার জুটত না। এ কারণেই সে শহরে এসেছিল। কিন্তু সেখানেও তাকে নির্যাতন সহ্য করার পাশাপাশি অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হতো। দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তাজিন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তাজিনের মা আয়েশা বেগম বলেন, ঢাকায় নেওয়ার পর আমাদের জানানো হয় তাজিন হারিয়ে গেছে, আবার বলে খুঁজে পাওয়া গেছে। তাজিনকে খুঁজতে তাদের ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ টাকা তার কাছে দাবি করে ভয় দেখায়। তাজিনের শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে নিলুফা ইয়াসমিন এমির বাবার বাড়ির লোকজন ওকে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়। সেখান থেকে আমরা তাজিনকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করাই পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আরেকটি পরিসংখ্যানে জানা যায়, ৩০ জন গৃহকর্মী মেয়েশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে পাঁচ গৃহকর্মী মেয়েশিশু। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে একজন। নির্যাতনের কারণে মারা গেছে ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে একজন, ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ১৬ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে একজন। শারীরিক নির্যাতনের পর মারা গেছে ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে দুজন, ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে একজন। আত্মহত্যা করেছে ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ২ জন। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে একজন। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ’ (বিলস)-এর একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে সারা দেশে অন্তত ১৮২ জন নির্যাতিত গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১৪৩ জন। ২০১৫ সালে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৭৮ জন গৃহকর্মী। তাদের মধ্যে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ৩৯ জন। নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী মেয়েশিশুরা তাদের প্রাপ্য বিচার থেকেও বঞ্চিত হয়। এ প্রসঙ্গে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, আমরা একটা কেসেরও কিন্তু এখন পর্যন্ত বিচার সে রকম দেখিনি, যে গৃহশ্রমিককে মারার কারণে গৃহকর্তার শাস্তি হয়েছে। যে সময়ের মধ্যে তদন্ত হওয়া এবং একটি মামলা সম্পন্ন হওয়ার কথা তা হয় না। এ ধরনের সেনসিটিভ কেসগুলো যদি ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্টে শেষ করে ফেলা যায় ৬ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে, তাহলে কিন্তু অনেক ভালো শাস্তি আমরা দিতে পারি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে