‘বৈশাখে টানা ৭২ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে অর্ডার নিয়েছি’

-নুসরাত আক্তার লোপা, কর্ণধার, হুর নুসরাত

প্রকাশ | ০৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

কেয়া আমান

স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছাটা ছোটবেলা থেকেই ছিল। আমরা চার বোন, ভাই নেই। প্রকাশ না করলেও বাবা-মায়ের মনে ছেলে না থাকার একটা চাপা কষ্ট সব সময়ই অনুভব করেছি। আমরা বোনেরা সব সময়ই চাইতাম বাবা-মায়ের ছেলে না থাকার সেই চাপা কষ্ট দূর করতে, ছেলের অভাব বুঝতে না দিতে। তাই স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য চেষ্টায় ছিলাম। স্বপ্ন দেখেছি, স্বপ্ন পূরণ করার জন্য পরিশ্রম করেছি। তাই হয়তো আজ স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথে কিছুটা এগিয়ে যেতে পেরেছি। নিজের সম্পর্কে কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন নুসরাত লোপা।

একজন অনলাইন উদ্যোক্তা। অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হুর নুসরাত’-এর কর্ণধার। অনলাইন সেক্টরে সফল এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘অধিকাংশ নারীকে একাই শুরু করতে হয়। শুরুর দিকে সাপোর্ট খুব কম থাকে। নারীর নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এখন পরিবারের সবাই আমার পাশে আছে। আসলে সবকিছু সামলে নারীদের এগিয়ে যেতে হয়। নারী হোক বা পুরুষ, স্বপ্ন দেখতে হবে। শুধু স্বপ্ন দেখে বসে থাকলেই হবে না, স্বপ্নের পেছনে ছুটতে হবে, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে আর ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হবে।’

ব্যবসা শুরুর দিকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নুসরাত বলেন, ‘আমি অনেক আগে থেকেই বোনদের ও মায়ের পোশাক বানিয়ে দিতাম। আমার স্বামী চাকরি করার পক্ষে ছিল না। একসময় আমার মনে হলো আমি তো ঘরে বসেই অনলাইনে পোশাক নিয়ে কাজ করতে পারি। এরপর একটা কোর্স করলাম। সেখান থেকে ফেসবুকে ব্যবসাসংক্রান্ত অনেক কিছু জানলাম। ২০১৫ সালে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা মূলধন নিয়ে একটা মাত্র সিঙ্গেল কুর্তি দিয়ে ‘হুর নুসরাতের’ যাত্রা শুরু করি। মাত্র তিন মাসেই ভালো সাড়া পেলাম। এরপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাওয়া। সে সময় ব্যবসার যাবতীয় কাজ একাই করতে হতো। এখন ১৫ জন কর্মী আমার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। নুসরাত বলেন, গত বৈশাখে টানা ৭২ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে অর্ডার নিয়েছি। এসবই সম্ভব হচ্ছে কারণ ব্যবসায় সততা বজায় রেখেছি আর ধৈর্য ধরে লেগে আছি।’

বৈশাখ উপলক্ষে এখন প্রচুর ব্যস্ত সময় কাটছে নুসরাত লোপার। অনলাইন, অফলাইন দুই মাধ্যমেই প্রচুর অর্ডার পাচ্ছেন। ‘ব্যস্ততা বাড়ায় এখন অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠছে। তাই এ ক্ষেত্রে নারীদের জন্য খুব ভালো ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সে জন্য অবশ্যই ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হবে’ বলে মনে করেন নুসরাত।

নুসরাত লোপা শুধু নিজেই নয়, অনুপ্রেরণা তার মায়েরও। তার মা ছিলেন স্বল্পশিক্ষিত। আত্মীয়রা সবাই উচ্চশিক্ষিত হওয়ায় তার মাকে প্রায়ই নানা ধরনের বিদ্রƒপ শুনতে হতো, যা নুসরাতকে খুব কষ্ট দিত। নুসরাত যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন, তখন একরকম জোর করেই তার মাকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ান। নুসরাতের যখন বিয়ে হয় তখন তার মা মাস্টার্স পড়েন। মায়ের মাস্টার্স পরীক্ষার সময়ও নুসরাত তার মাকে সঙ্গে করে পরীক্ষার হলে নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন। তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের নারীদেরই নারীদের পাশে আগে দাঁড়াতে হবে। আমরা যদি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলাতে না পারি, তবে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর আশা করা ঠিক নয়।’

ফেনীর মেয়ে নুসরাত এসএসসি পাস করেন ফেনী থেকে। এরপর লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ইডেন কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বপ্ন দেখে ‘হুর নুসরাত’ একদিন একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।’