কর্মজীবী সফল মায়ের জীবনগাথা

  মেহেনাজ হাসান

১২ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ মে ২০১৮, ০৮:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘কোনো একটা বিষয় মায়েদের দুইবার ভাবতে হয়। একবার তার সন্তানের জন্য, আরেকবার নিজের জন্য।’ ইতালির অভিনয়শিল্পী সোফিয়া লরেনের এই কথার সত্যতা কর্মজীবী মায়েদের জীবনে প্রতিনিয়তই পাওয়া যায়। নারী একই সঙ্গে যখন মা এবং কর্মজীবী, তখন তাকে দুটি ক্ষেত্রই সমানতালে সামলাতে হয়। তার জীবনে সন্তান, পরিবার, অফিসÑ সব একই সরলরেখার বিন্দু। কর্মব্যস্ততা ও মা হিসেবে সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন কর্মজীবী মায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এমনই তিন কর্মজীবী সফল মা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের চ্যালেঞ্জের কথা শুনিয়েছেন আমাদের সময়কে। লিখেছেনÑ মেহেনাজ হাসান

সন্তানের জন্য মা-ই একমাত্র

নির্ভরশীল জায়গা

ডা. রুনা আখতার দোলা

সহকারী অধ্যাপক, প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ

বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল

হাসপাতালে রোগীও দেখতে হয়। আবার সন্তানকেও দেখভাল করতে হয়। একটু কষ্ট হয়। কিন্তু একজন নারী লেখাপড়া করে চাকরি-বাকরি করবে না এ কথা আমি ভাবতেই পারি না। নিজের মেধাকে কাজে লাগাতে হবে। মেধা কাজে না লাগালে তা নষ্ট হয়ে যাবে। কর্মক্ষেত্রে নিজের পরিচয় তৈরি করতে হবে। একইভাবে নিজের সন্তানের প্রতিও যতœশীল হতে হবে। আবার পরিবারের কথাও ভাবতে হবে।

ক্যারিয়ার গড়তে হলে সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। আমার মা-বাবা আমার সঙ্গেই থাকেন। তারা আমার সন্তানদের দেখাশোনা করেন। আমার পরিবার আমাকে কর্মক্ষেত্রে কোনো বাধা দেয় না। এ ব্যাপারে আমি সব সময় তাদের সহযোগিতা পাই। তাই কাজের সময় আমি পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারি। তখন আর অন্য কিছু মাথায় থাকে না। আবার ব্যক্তিগত ও সাংসারিক ক্ষেত্রে আমার সন্তান আমার কাছে প্রথমে প্রাধান্য পায়। সন্তান সুস্থ থাকলে আর কোনো সমস্যা মনে হয় না। আমার ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের পরপর আমি আমার ক্যারিয়ারের দিকে নজর দিইনি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সন্তানের জন্য ভালো মানের চাকরি ছেড়েছি। তখন সেখানে চাকরি করলে আমার সন্তানকে আমি ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারতাম না। সন্তানের জন্য ছাড় দিয়েছি (স্যাক্রিফাইস করেছি)। আমি সপ্তাহে দুদিন চেম্বার করি না। সন্তানকে সময় দিই। কারণ মানুষের জীবনযাপনের জন্য বেশি অর্থের দরকার নেই। আমার কাছে আমার সন্তান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার সন্তানের আমাকে না পেলে চলবে না। কারণ আমি মনে করি সন্তানের জন্য মা-ই একমাত্র নির্ভরশীল জায়গা। কর্মক্ষেত্রে যেমন আমার দায়িত্ব আছে, তেমনি সন্তানকে মানুষ করাও আমার দায়িত্ব। কাজেই আমার রোগীদের যেমন আমাকে দরকার, একই সঙ্গে আমার সন্তানেরও আমাকে প্রয়োজন।

পরিবারের সহযোগিতায় পেশা

ও সংসার দুটোই দেখভাল

করতে পারি

হাসিনা বেগম

অফিসার ইনচার্জ

বালিয়াকান্দি থানা রাজবাড়ী জেলা

পরিবার থেকে দূরে থাকি। পরিবার থাকে ঢাকায়। আমি থাকি রাজবাড়ীতে। সহজে ছুটি পাই না। দেড় মাসেও ছুটি হয় না। পরিবারের কাছে যেতে পারি না। চাকরি গুরুত্বপূর্ণ। আবার পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ বলতে শুধু মুঠোফোনে খোঁজ নেওয়া। সেটাই ভরসা। মুঠোফোনে সন্তানের খোঁজখবর নিই। কাজের সময় সন্তানকে খুব মিস করি। পরিবার কাছে থাকলে সুবিধা হতো। সন্তানের যতœ নিতে পারতাম, সময় দিতে পারতাম। পরিবারে স্বামী, শাশুড়ি, মাÑ তারা সহযোগিতা করেন। তারা আমার পেশা ও কর্মজীবনকে সমর্থন করেন। পরিবারের উৎসাহের কারণেই এতদূর পর্যন্ত আসা। তাদের সহযোগিতার কারণেই দূরে থেকেও পেশা ও সংসার দুটোই দেখভাল করতে পারছি। আমি কর্মক্ষেত্রকে ভালোবাসি। কাজের সময় কাজটাকে উপভোগ করি। আর পরিবারকে মিস করি। কাজের বেলায় রাত-দিন বলে কিছু নেই। পরিশ্রম করতে হয়। কাজের সময় শ্রম, মেধাÑ দুটোই দিতে হয়। কর্মক্ষেত্রে অনেক জটিলতা আসে, ঝামেলা আসে। এসব সামলাতে হয়। নানা সমস্যা ও চাপ যেমন আসবে সেটি মোকাবিলা করতে পারব এবং মোকাবিলা করব।

বাসায় ফিরে সন্তানদের সময় দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

সেগুফতা শারমিন, প্রিন্সিপাল অফিসার, এক্সিম ব্যাংক, গুলশান ব্রাঞ্চ

আমার দুই সন্তান। বড় সন্তান স্কুলে পড়ছে। আর ছোটটার নয় মাস বয়স। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে ছোটটাকে খাইয়ে বের হই। বড় সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে নিজে অফিসে পৌঁছাই। গৃহকর্মী ছোট সন্তানকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে আসে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাসায় ফোন করে সন্তানদের খোঁজখবর নিই। সন্তানদের জন্য কী রান্না করতে হবে, তা ফোন করে গৃহকর্মীকে বলে দিই। গৃহকর্মী সেই সময়টা শিশুদের খাওয়ানো ও দেখাশোনা করে। অফিসের সময় অফিসের কাজ করি। অফিস শেষে বাড়ি ফিরেই সন্তানদের দেখাশোনা করি। সন্তান ও বাসার সবার খাবারের পরিকল্পনা করি। রান্নার কাজের দায়িত্ব গৃহকর্মীকে দিয়ে আমি পুরো সময়টা আমার শিশুদের দিই। বাসায় ফিরে তাদের সময় দেওয়াটাই আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ সারাদিন অফিসে থাকি। তাদের দেখাশোনা করতে পারি না। বাসায় শিশুরা থাকে গৃহকর্মীর কাছে। তাই বাসায় থাকাকালীন অন্য কিছুতে মনোযোগ না দিয়ে তাদের সঙ্গেই থাকার চেষ্টা করি। তাদের পড়াই, বিকালে সঙ্গে নিয়ে বের হই, খেলা করি। স্বামীর সঙ্গে পরিকল্পনা করি কীভাবে সপ্তাহান্তে দুই সন্তানকে আরও সময় দেওয়া যায়। আমার স্বামীও আমাকে সমর্থন করেন। আমরা ছুটির দিনে ঘুরতে নিয়ে যাই দুই সন্তানকে। দিনশেষে একসঙ্গে সবকিছুই সামলে নিই। কোনো কিছুই কঠিন লাগে না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে