প্রহরে প্রহরে জেগে থাকা সতর্ক প্রতিরক্ষার নাম মা

  শাপলা সপর্যিতা

১২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বুকের গভীরে একটা ‘মা’ জন্মেছিল যখন প্রথম নারী হয়ে উঠতে থাকি। কোনো বর নয়। ঘর নয়। কেবল একটি মা। আর তার পর থেকে মা হতে হতে এখন যুগেরও অধিককাল মায়ের সঙ্গে যাপিত এ জীবনের ধারা। এ জীবনে তিনজন মা আমার। আমিও দুজনের মা। সেই যে সদ্য যৌবনলগ্ন এক কন্যার গভীরে মায়ের ছায়া নিয়ে পড়েছিলাম আজ তার প্রকাশ বড় সুন্দর দারুণ সঙ্গে নির্মমও খানিক। রাতে-দিনে নিদ্রাহীন সেই যে পথচলা শুরু। ধীরে যদিও বা কমে আসে রাত জাগানিয়া সুখ। জেঁকে আসে তখন ক্রমেই সংসার আর অসংসারের সব যাতনা বিষাদ। ভোর হতে হতে ‘ওঠো শিশু মুখ ধোও পড় নিজ বেশ’ এই দিয়ে শুরু। তার পর চলে দিনে-রাতে তার সেবা। পড়ালেখার সমান তালে মায়ের দৌড়াদৌড়ি। নারীর পথচলা, মায়ের পথচলা এর কোনো সীমা নেই। ‘ড়িসধহ যধং হড় ষরসরঃধঃরড়হ ড়ভ ড়িৎশং’ নারীর কাজের কোনো শেষ নেই। সেই নারী যখন হয়ে ওঠে মা তখন যে দশভুজা দুর্গা। সংসারের যাবতীয় জটিল ভাবনা, সন্তান লালন-পালন-বাড়ন সব এক হাতে সামলানোই মায়ের পরম পুজো। এ পুজোর কোনো শেষ নেই। এর কোনো সীমা নেই। আমার সদ্য কৈশোর পার হওয়া মেয়ে মাঝে মাঝে দারুণ অসংহত হয়ে ওঠে। তখন দশ দিক দিশেহারা হয়ে পড়ে আমার। খুব তাকিয়ে থাকি কবে শেষ হবে এই ঝড়? এই তো কদিন বাদেই। বছর দুয়েক গেলেই সব ঠিক হবে। কিন্তু তবে কেন আজও ৭৫ বছর বয়সেও আমার মা চল্লিশ পার করে দেওয়া এই আমার ভালো-মন্দ ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েন?

মায়ের এডোলসেন্ট সন্তানটি স্কুলে যায়। তাকে ভোরবেলা স্কুলে পাঠাও। নিজের কর্মস্থল থেকে বারবার খবর নাও। বাড়িতে নিয়ে এসো। বিকালের নাস্তা তৈরি করো। রাতে পড়া দেখে দাও। রান্না করো। সন্তান কী খেতে পছন্দ করে, ছুটির দিনে তার ব্যবস্থা করো। বেড়াতে নিয়ে চলো। সারাদিন পড়ালেখা করলে তো চলবে না। মানসিক স্বাস্থ্যেরও তো বিকাশ চাই। ছুটিতে একটু দেশ কিংবা বিদেশ ঘুরিয়ে আনা চাই। সুকুমারবৃত্তি প্রকাশের পথ খোলা থাকা দরকার। ছুটির দিনেও নিয়ে চলো তাকে গানের ক্লাসে, নাচের ক্লাসে নয়তো ছবি আঁকার ক্লাসে। মেয়েদের পদে পদে বিপদ। ছেলেদেরও কী কম? চলো, তাকে শেখাও আত্মরক্ষার কৌশল। নিয়ে চলো টাইকু-ু কিংবা ক্যারাট ক্লাসে। সন্তানের ভবিষ্যতের কথাও তো ভাবতে হবে। বয়স বাড়বে। লেখাপড়ার খরচ বাড়বে। বাড়বে খাওয়ার খরচ। পরার কাপড়। স্কুলের বেতন। হাউস টিউটরের বেতন। এসবের তো ব্যবস্থা করে রাখতে হবে সময় থাকতেই। বাবার একার আয় দিয়ে তো চলবে না। তাই সমান তালে মায়ের আয়-রোজগারও করতে হবে। জমাতে হবে ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয়। তাই খাটুনি আর একটু বেশি করতেই হবে। অবশেষে সন্তানটির বিয়ে হলো। জীবনে প্রতিষ্ঠিতও হলো। নিজের পায়ে দাঁড়াল। মা তখন বয়সের ভারে ক্লান্ত হতে শুরু করেছেন। কিন্তু তাতে কী। যে সন্তানটিকে এত যতœ করে বড় করেছেন। তার ভবিষ্যতের চিন্তায় এত যে অধীর হয়েছেন। সেই মেয়ে সন্তানটি হয়তো এখন চাকরি করতে পারছে না। তার ছোট্ট সন্তানটিকে কোথাও কারো কাছে রেখে নিরাপদবোধ করছে না। মা ছুটে এসেছেন তার নাতিরও দায়িত্ব নিতে। ছেলেবউ অফিস যাবে। এই বয়সের ভারে ন্যুব্জ মায়ের তবুও ক্লান্তি নেই। নিজের মেয়ের সমান মায়েদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তারও স্কুলে অন্য মায়েদের সঙ্গে। এই তো মায়ের জীবন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে