উচ্চশিক্ষায় নারীরা ঝরে যাচ্ছেন

  মেহেনাজ হাসান

২৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৬ মে ২০১৮, ০২:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও উচ্চশিক্ষায় নারীদের বিচরণ সে তুলনায় তেমন বেশি নয়। নানা কারণে মাধ্যমিক শিক্ষার পর পরই অনেক নারী ঝরে পড়ছেন। নারীর উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। যার কারণে মাধ্যমিক পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও নারীরা উচ্চশিক্ষায় যেতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন। লিখেছেনÑ মেহেনাজ হাসান

মাধ্যমিকে এগিয়ে মেয়েরা

এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হারের দিক থেকে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। ছাত্রদের পাসের হার ৭৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর ছাত্রীদের পাসের হার ৭৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তার মানে ছাত্রীরা ২ দশমিক ১৪ শতাংশ এগিয়ে।

কিন্তু এমন চিত্র প্রতিবারের নয়। এর আগের বছরগুলোয় ছেলেদের পাসের হারই বেশি ছিল। এ ছাড়া ২০১৫ সালের জুনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংসদে বলেছিলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ৫৩ শতাংশ, ছাত্র ৪৭ শতাংশ।’ কিন্তু ওই ভাষণেই তিনি জানিয়েছিলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিকে এসে ছাত্রীর সংখ্যা হয়ে যাচ্ছে ৪৭ শতাংশ, ছাত্রের সংখ্যা ৫৩ শতাংশ।’

পিছিয়ে উচ্চশিক্ষায়

বাংলাদেশ শিক্ষা গবেষণা ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশ। যার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর অংশগ্রহণ ৩৭ শতাংশ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২৬ শতাংশ। উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে পেশায়ও নারীর উপস্থিতি কম।

উচ্চশিক্ষায় নারীদের অনগ্রসরতা কেন, কী কারণে উচ্চশিক্ষা নেওয়া থেকে দূরে রয়েছেন বেশিরভাগ নারী, এসব নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আবুল মনসুর আহাম্মদের সঙ্গে। তিনি সহমত পোষণ করেন, ‘বর্তমানে শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। স্কুল-কলেজে মেয়েদের অংশগ্রহণ খুবই সক্রিয়। মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল তার প্রমাণ। কিন্তু এই সক্রিয়তার অনুপস্থিতি মেলে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারীরা মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার দিকে অগ্রসর নন। অল্পসংখ্যক নারী স্নাতক বা উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন। কিন্তু পুরুষদের মতো এই সংখ্যা সমান নয়।’

কিন্তু কেন এমন চিত্র, জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে। অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, ‘বাংলাদেশে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। মাধ্যমিক পাস করার পর অধিকাংশ অভিভাবক মেয়েদের বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করেন। ফলে লেখাপড়ার দুয়ার তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।’

এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, অর্থনৈতিক অসক্ষমতা, শিক্ষায় পরিবারের অনিচ্ছাÑ এসব কারণে নারীরা উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আসতে পারছেন না। এমনটাই মনে করেন অধ্যাপক আবুল মনসুর।

গ্রামের চিত্র

শহরে নারীদের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার যেটুকু বাস্তবতা রয়েছে, গ্রামের বেলায় সেটারও বেশ অভাব। টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক মনসুরের কথায় যেমনটা শোনা গেল, ‘শহরে মোটামুটি হারে নারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। আগের তুলনায় বর্তমানে নারীদের উচ্চশিক্ষায় উপস্থিতি বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। কিন্তু গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের তেমন পরিবর্তন হয়নি। এখনো অনেক পরিবার মেয়েদের লেখাপড়ার কথা ভাবতেই পারে না।’

কারণ কী? উত্তরে অধ্যাপক আবুল মনসুর বলে, ‘মাধ্যমিকের আগেই তারা মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিয়ে লেখাপড়া করার পথ বন্ধ করে দিচ্ছেন। যার কারণে উচ্চশিক্ষায় আসার আগেই নারীরা ঝরে যাচ্ছেন। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও অর্থনৈতিক অসক্ষমতাই এ ক্ষেত্রে প্রধান কারণ।’

সাড়ে তিন বছর আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেছিলেন, ‘১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার সময় ৮৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী ছিল একজন। আজ আমাদের নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৫ শতাংশ।’ তিনি এও আশা প্রকাশ করেন যে, ‘একটা সময়ে এই হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।’ সেই আশা আসলে কতটুকু পূরণ হয়েছে? সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাইলে উচ্চতর পর্যায়ে নারী শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এখনই।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে