sara

নির্যাতিত হয়ে ফিরছেন প্রবাসী নারী শ্রমিকরা

  আঞ্জুমান আরা

০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:৫৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুই বছরের চুক্তিতে সৌদি আরব যান সুনামগঞ্জের তাসলিমা আক্তার। কিন্তু সেখানে আট মাস গৃহকর্মীর কাজ করলেও কোনো বেতন পাননি তিনি। বেতন চাইলে তার ওপর নেমে আসত অমানুষিক নির্যাতন। একদিন সুযোগ বুঝে তাসলিমা পুলিশকে ফোন দিয়ে নির্যাতনের কথা জানান। পুলিশ এসে তাসলিমাকে দূতাবাসে নিয়ে যায়। ওদিকে নিয়োগকর্তাও তার নামে মামলা করেন। ফলে দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাসলিমার। অবশেষে বহু চেষ্টা-তদবিরের পর গত ১৯ মে দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশে ফেরেন তাসলিমা।

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে গিয়েছিলেন হবিগঞ্জের সালমা বেগমও। কিন্তু গৃহকর্তার নির্যাতন সইতে না পেরে ১৫ দিন পর সেখান থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেন দূতাবাসে। সম্প্রতি ব্র্যাকের সহযোগিতায় দেশে ফিরে এসেছেন তিনি। কিন্তু দেশে ফিরে এলেও তার স্বামী, এমনকি তার বাবাও তাকে ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অনিশ্চয়তায় তাই এখন সালমার দিন কাটছে নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে।

শুধু সালমাই নন, ব্র্যাকের আশ্রয়কেন্দ্র বর্তমানে অনেক প্রবাসী নারী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ব্র্যাক গত তিন মাসে ১১৮ জন নারীকে দেশে ফেরত আনতে দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। তাদের মধ্যে সম্প্রতি ৮০ জন ফেরত এসেছেন। বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান। তিনি জানান, ‘সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকদের ফিরে আসার সংখ্যা সম্প্রতি বাড়তে শুরু করেছে। গত ১৯ মে দূতাবাসের সহযোগিতায় এ রকম ৬৬ জন নারী গৃহকর্মী তাদের চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফিরেছেন। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে ফিরে আসছেন। যারা ফিরে আসছেন তাদের প্রায় সবাই যৌন নির্যাতন এবং অন্যান্য নির্যাতনের অভিযোগ করছেন।’ তবে দেশে ফিরে এলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছেন না ভুক্তভোগী এসব নারী। শরিফুল হাসান বলেন, ‘প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি প্রবাসী নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত আসার পর পরিবার তাকে গ্রহণ করতে রাজি হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা বুঝিয়ে পরিবারকে রাজি করালেও এই নারীদের একঘরে করে রাখা হয়। ফলে দেশে ফিরেও তাদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে যায়।’ উন্নত জীবনের আশায় এবং পরিবার পরিজনকে ভালো রাখার জন্যই প্রতিবছর বৈধ-অবৈধভাবে পরিবার-পরিজন ছেড়ে সৌদি আরব, লেবানন, জর্ডান, মালয়েশিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর, মরিশাসের উদ্দেশে দেশ ছাড়ছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি নারী শ্রমিক। কিন্তু যে স্বপ্ন পূরণের আশায় বিদেশে যান নারী শ্রমিকরা তাদের অধিকাংশেরই সেই স্বপ্ন পূরণ তো দূরের কথা, বেঁচে থাকার সংগ্রামেই তাদের পার করতে হচ্ছে দিনের পর দিন। গৃহকর্মীর কথা বলে তাদের যেমন বিক্রি করা হচ্ছে যৌনদাসীরূপে, তেমনি সৌদি আরব, লেবাননের কথা বলে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে সিরিয়াতেÑ এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেকেই দেশে ফিরে আসার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, আর যারাও আসছেন তাদের অধিকাংশকেই ফিরতে হচ্ছে নিঃস্ব হাতে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে শুধু সৌদি আরব ও ওমানের সেফ হোমে আশ্রয় শেষে দেশে ফিরে এসেছেন ২ হাজার ৩০০ নারী শ্রমিক। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি সৌদি আরবে কাজে গিয়ে নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়া কল্পনা নামে এক বাংলাদেশি নারী শেল্টার হোমে আত্মহত্যা করেন। এর পর পরই শেল্টার হোমে অবস্থানরত নারীদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোয় তৎপর হয়ে ওঠে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়। যার ধারাবাহিকতায় ৮ জানুয়ারি ৩৫ জন, ৯ জানুয়ারি ৩০ জন, ১০ জানুয়ারি ৯৯ জন, ১১ জানুয়ারি ১২৮ জন এবং গত ১৯ মে ৬৬ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা প্রথম বিদেশ যাওয়া শুরু করেন ১৯৯১ সালে। ১৯৯১-২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন মোট ৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৩৬ জন নারী শ্রমিক। এসব নারী শ্রমিকের প্রায় সবাইকেই গৃহকর্মী, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পোশাককর্মীর কাজের কথা বলে বিদেশে পাঠানো হলেও মূলত তাদের সেখানে দেহব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে। যাদের গৃহকর্মীর কাজ দেওয়া হচ্ছে, তাদের ওপরও নেমে আসছে যৌন নির্যাতন, বেতন না দেওয়া, মারধরসহ ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এ ছাড়া ওয়ার্ক পারমিট আটকে রাখা এবং দেশে ফিরে আসতে চাইলে স্বজনদের কাছে রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালালদের মুক্তপণ দাবিসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন প্রবাসী নারী শ্রমিকরা।

এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, প্রবাসে নারীরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হলেও সেখানকার দূতাবাসগুলো অনেক ক্ষেত্রে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না। সেখানে সেই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা যদি সে রকম না থাকে আর এম্বাসি যদি ভূমিকা না নেয়, মনিটর করা না হয় তা হলে এ ধরনের নির্যাতন চলতেই থাকবে। তাই প্রবাসী কর্মীদের জরুরি প্রয়োজনে এজেন্সি, লেবার উইংস ও দূতাবাসগুলোকে আরও আন্তরিক হতে হবে এবং কর্মীদের নিরাপত্তা, বেতনসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো আরও কঠোর নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করতে হবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে