ওরা ফুটবলারই হতে চেয়েছিল

  কেয়া আমান

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছেলেদের ফুটবলে যখন ঘোর দুর্দিন, তখন আলো ছড়িয়ে চলেছে বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের কিশোরী ফুটবলারদের একের পর এক অবিশ্বাস্য সাফল্য তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে। ফুটবলের প্রতি তাদের অদম্য নেশা বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে সৃষ্টি করেছে এক নবজাগরণ। লিখেছেনÑ

কেয়া আমান

অভিজ্ঞতায় নারী ফুটবলে বাংলাদেশের চেয়ে যোজন ব্যবধানে এগিয়ে ভারত, ভুটানের মতো দেশগুলো। দক্ষতা আর সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকলেও অদম্য মনোবল আর ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ব্যবধানটি কমিয়ে এসেছে বাংলাদেশের ফুটবলাররা। সম্প্রতি সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্সআপ হয়ে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা। শিরোপা না জিতলেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে তারা সবার মন জয় করেছে। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় আসরে বাংলাদেশ পড়েছিল ‘বি’ গ্রুপে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান ও নেপাল। প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানকে ১৪-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। এর পর দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালকে হারায় ৩-০ ব্যবধানে। ফলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ভুটানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠে। ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ফাইনালে ভারতের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় তহুরা-মারিয়ারা। ভারতের কাছে হেরে এবার শিরোপার দেখা পায়নি বাংলার নারী খেলোয়াড়রা ঠিকই, তবে অসাধারণ খেলার কারণে তাদের জয়জয়কার এখন সর্বমহলে। তাক লাগানো প্রেসিং ফুটবল, নিখুঁত পাস, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বল ফেলার যে কৌশল তারা দেখিয়েছে, তা সবাইকে অবাক করেছে।

এর আগে ২০১৫ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা পায় বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বও মাতিয়েছে এখানকার মেয়েরা। ২০১৭ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরে শিরোপা জিতে তারা। এবারও তহুরা, মনিকা, আঁখী, সাজেদার খেলা স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন বলেন, ‘ভুটানে আমাদের মেয়েরা শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। কিন্তু তারা খেলার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী, প্রচুর অনুশীলন করে এবং দিন দিন উন্নতি করছে। আমাদের মেয়েরা তাদের সেরাটা দিয়ে খেলছে। ফেডারেশনও তাদের সাধ্যমতো সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এ ক্ষেত্রে ফেডারেশনের সহযোগিতাই যথেষ্ট নয়। সরকারি ও করপোরেট সেক্টরের পৃষ্ঠপোষকতাও প্রয়োজন।’

দেশে অনেকবারই আনন্দের উপলক্ষ এনে দিলেও ছোট্ট এই ফুটবলারদের জীবনটা কিন্তু অনেক কষ্টের। ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী এলাকার কলসিন্দুর গ্রামের অজপাড়াগাঁয়ের এই কিশোরী ফুটবলাররা বেড়ে উঠেছে অনাদরে অর্থকষ্টে। অনূর্ধ্ব-১৫ দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্ডাকে পেটের ক্ষুধা মেটাতে মাঝে মধ্যে মায়ের সঙ্গে বিভিন্ন বাড়িতে গৃহপরিচালিকার কাজ করতে হয়। কিন্তু ফুটবল তার নেশা। যদিও খেলার জন্য বুট কেনার সামর্থ্য পর্যন্ত তার ছিল না। মেয়ের স্বপ্নের কথা বুঝতে পেরে মা এনতা মান্ডাই কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় গ্রামের রাস্তায় টানা তিন দিন শ্রমিকের কাজ করে মেয়েকে খেলার জন্য বুট জুতা কিনে দেন। তাদের আরেক সতীর্থ ছিল তুখোড় খেলোয়াড় সাবিনা ইয়াসমিন। যে কিনা গত বছর বিনা চিকিৎসায় মাত্র তিন দিনের জ্বরে মৃত্যুবরণ করে। শুধু মারিয়া বা সাবিনা নয়, অনূর্ধ্ব-১৫ দলের প্রত্যেক খোলোয়াড়ের জীবনই কঠিন দারিদ্র্যে আবিষ্ট। অন্যদিকে পুরুষদের সমান পৃষ্ঠপোষকতা বা আর্থিক সুবিধা তো দূরের কথা, নারী ফুটবলাররা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে পায় না। তার ওপর রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক বাধা। তবে কোনো বাধাই থামাতে পারেনি তাদের। শত বাধা পেরিয়েও অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবলাররা এগিয়ে চলেছে। ভুটানে বাংলাদেশের মেয়েরা প্রমাণ করেছে দেশের ফুটবলের জন্য তারা জীবন দিতে পারে। তাদের পক্ষে দুবেলা খাবারের জোগান বাহুল্য হলেও ফুটবলকে নিয়ে তারা পাহাড় সমান স্বপ্ন দেখে। আর্থিক সচ্ছলতার হাতছানি না থাকলেও শুধু ফুটবলার হয়ে ওঠার অদম্য ইচ্ছায় তারা আজ দেশের ফুটবল অঙ্গনকে আলোকিত করেছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে