sara

ঘরে কাজ বেশি অফিসে বেতন কম

  কেয়া আমান

১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বামী-স্ত্রী দুজনই সবে অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছেন। ঘরে ফিরে স্বামী হাত-মুখ ধুয়ে পত্রিকা ও টিভির রিমোট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে বসে পড়েছেন। স্ত্রী তাড়াতাড়ি চা-নাশতার জোগান দিতে বাইরের কাপড় না ছেড়েই ছুটেছেন রান্নাঘরে। চা-নাশতার পর রাতের খাবার তৈরি এবং পরদিনের নাশতা ও দুপুরের খাবার তৈরির প্রস্তুতি নিয়েই একেবারে ফ্রেশ হয়ে নেবেন। সন্তান থাকলে তাদের পড়তে বসানো, স্কুলের প্রস্তুতি তো আছেই। তার ওপর পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ থাকলে তাদের দেখাশোনা।

যুগের পর যুগ এমন ‘সাদামাটা’ দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত চোখে কোনো অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে না। মনে হয়, এটাই স্বাভাবিক। কর্মজীবী নারীদের আসলে দুটি চাকরি করতে হয়। একটি অফিসে, অন্যটি বাড়িতে। একজন পুরুষের অনেক ক্ষেত্রেই সেই সমস্যা নেই। তিনি অফিসের কাজেই বেশি মনোযোগ দিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন। অথচ সংসারে শান্তি বজায় রাখতে অনেক নারী ইচ্ছা করেই পিছিয়ে থাকেন, বাড়িতে সময় বেশি দেন। যোগ্যতা থাকার পরও চাকরি করেন না।

গবেষণায় দেখা যায়, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা এবং একজন পুরুষ গড়ে আড়াই ঘণ্টা এমন কাজ করেন, যা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। একজন নারী প্রতিদিন যেখানে গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজ করেন, সেখানে পুরুষরা কাজ করেন ২ দশমিক ৭টি। উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন জরিপ অনুযায়ী, গৃহিণীরা দৈনন্দিন যেসব কাজ করেন, সেসব কাজের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জিডিপির ৭৭ শতাংশের সমপরিমাণ। অর্থাৎ গৃহিণীদের কাজ পরিবারগুলো যদি বেতনভুক্ত কর্মীদের দিয়ে করাত, তা হলে তার আর্থিক মূল্য দাঁড়াত জিডিপির ৭৭ শতাংশের সমান। অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। গ্রহণযোগ্য মূল্য পদ্ধতিতে যার প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য ২০১৪ সালের অর্থবছরের জিডিপির ৮৭ শতাংশের সমান। অর্থাৎ ঘরের কাজ নিজে করলে তার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ১১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। অথচ গৃহিণীরা দিনের পর দিন বিনা বেতনে কাজগুলো করে যাচ্ছে। শুধু বেতনের হিসাবে নয়, সংখ্যা ও সময়ের দিক থেকেও ঘরের কাজ অফিসের কাজের তুলনায় ঢের বেশি।

আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের হাঁড়িপাতিল দিয়ে খেলতে দেওয়া হয়, ছেলেদের গাড়ি, বল। মেয়েটিকে শেখানো হয় ‘তোমার কাজ ঘরে’, ছেলেটিকে শেখানো হয় ‘তোমার কাজ বাইরে’। পরিবারের এই চর্চা বহু বছর ধরে চলে আসছে। যার প্রভাব পড়ছে পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে। সরকারি চাকরিতে নারী-পুরুষের বেতনকাঠামো এক হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতনবৈষম্য স্পষ্ট। গবেষকদের মতে, নারী-পুরুষের সমতা চাইলে বেতনভুক্ত কাজের জন্য শুধু মেয়েদের তৈরি করলেই হবে না, একই সঙ্গে ছেলেদের ঘরের কাজের মতো বেতন ছাড়া কাজে যুক্ত করতে শেখাতে হবে। অর্থনীতিবিদ এমএম আকাশ মনে করেন, নারীরা ঘরে মুদ্রার বিনিময়ে কাজ করেন না বলে নারীদের পরিশ্রম কখনই মূল্যায়িত হয় না। বর্তমানে নারীদের ঘর থেকে বের হয়ে বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগে যা গৃহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে। যেমন এখন ঘরের দেওয়া অর্ডারিতে খাবার সাপ্লাই হচ্ছে। সুতরাং এখন নারীর গৃহশ্রমের মূল্যায়ন সহজ। নারী-পুরুষ সমতা চাইলে নারীদের সেই মূল্যায়নটা দিতে হবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে